স্বপ্নাদেশে শুরু দুর্গাপুজো, দৃষ্টিহীন মুকুন্দের হাতে আজও চলছে মায়ের আরাধনা।
মালদা, নিজস্ব সংবাদদাতা:— দৃষ্টিহীন এক ব্যক্তি, পুরোহিত ছাড়াই দুর্গা পূজা করে আসছেন।স্বপ্নাদেশে পেয়ে বছর পর বছর ধরে মা দুর্গার আরাধনা অন্ধ মুকুন্দ ঘরামী।ছোট বেলায় চোখে আলো হারিয়েছেন কোন এক অসুখে । নিজের চোখে কখনও তার বাড়ির মা দুর্গার প্রতিমার রূপ দেখেনি । নেই বড় কোনও আয়োজন, নেই পুরোহিতের মন্ত্রোচ্চারণ, নেই জাঁকজমক। তবুও বিশ্বাস আর ভক্তির আলোয় প্রায় ৪০-৫০ বছর ধরে নিজের হাতেই মা দুর্গার পুজো করে চলেছেন মালদহের বামনগোলা ব্লকের চাঁদপুর অঞ্চলের নন্দিনাদহ এলাকার বাসিন্দা মুকুন্দ ঘরামি। অন্ধ মুকুন্দ বাবুর জীবনের এই গল্প যেন বিশ্বাস আর ভক্তির এক অন্যরকম অধ্যায়।
তিনি দৃষ্টিহীন। আর্থিক সামর্থ্যও নেই। কিন্তু প্রায় পাঁচ দশক আগে এক রাতে তাঁর জীবনে ঘটে যায় এক ঘটনা, যা আজও তাঁর কাছে সত্যের মতোই স্পষ্ট। তাঁর দাবি, স্বপ্নে এসেছিলেন মা দুর্গা। তাঁকে পুজো করার নির্দেশ দিয়েছিলেন দেবী।
মুকুন্দবাবু স্বপ্নে তিনি মাকে বলেছিলেন—
“আমি তো চোখে দেখতে পাই না মা। আমার কোনও উপার্জনের পথ নেই। কীভাবে তোমার পুজো করব?”
তখন তাঁর দাবি অনুযায়ী, স্বপ্নে মা দুর্গা তাঁকে আশ্বস্ত করেছিলেন—পুজোর জন্য বড় কোনও আয়োজনের প্রয়োজন নেই। জল আর ফুল দিলেই হবে । সেই স্বপ্নের পর থেকেই শুরু হয় তাঁর দুর্গাপুজো।গ্রামের মানুষকে জানালে প্রথমদিকে গ্রামের মানুষজনও সেভাবে পাশে দাঁড়াননি। প্রতিমা তৈরির টাকাটুকুও ছিল না তাঁর হাতে। কিন্তু মায়ের প্রতি বিশ্বাসে থেমে যাননি মুকুন্দবাবু। আর ঠিক সেই সময়ই, তাঁর কথায়, এক মৃৎশিল্পী হঠাৎ তাঁর বাড়িতে এসে হাজির হন। জানান, তিনি মা দুর্গার প্রতিমা তৈরি করে দিতে চান মায়ের মায়ের আদেশ রয়েছে । এরপর ছোট্ট করে তৈরি হয় মায়ের প্রতিমা।এরপর স্ত্রীকে সঙ্গে নিয়ে গ্রামের বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে ঘুরে অর্থ সংগ্রহ করে সহযোগিতা নিয়ে বছরের পর বছর ধরে চালিয়ে গিয়েছেন মায়ের পুজো।
আজ তাঁর বাড়িতে রয়েছে কংক্রিটের তৈরি মা দুর্গার মূর্তি। মুকুন্দবাবুর দাবি, স্বপ্নের নির্দেশেই এক শিল্পী তাঁর বাড়িতে এসে এই মূর্তি তৈরি করে দিয়েছেন।
চোখে দেখতে না পেলেও মুকুন্দবাবুর বিশ্বাসে যেন মায়ের প্রতিমা স্পষ্ট। হাত দিয়ে প্রতিমাকে স্পর্শ করেই তিনি অনুভব করেন তাঁর আরাধ্য মাকে। পুরোহিতের অপেক্ষা করেন না। বড়ং কোনও মন্ত্রও জানেন না। নিজের মতো করে জল, ফুল আর ভক্তি দিয়ে মায়ের পুজো করেন তিনি।একজন আসে শুধু চণ্ডীপাঠ করতে।
আজ তাঁর সংসারে রয়েছেন স্ত্রী। এক ছেলে ভিনরাজ্যে কাজ করেন। মেয়ের বিয়ে হয়ে গিয়েছে। বাড়িতে থাকা স্বামী-স্ত্রী দু’জনেই মিলে মায়ের সেবা করেন।
চোখে আলো নেই, কিন্তু বিশ্বাসের আলোয় আলোকিত তাঁর জীবন।
দারিদ্র্য তাঁকে থামাতে পারেনি, দৃষ্টিহীনতা কেড়ে নিতে পারেনি তাঁর ভক্তি।
মুকুন্দ ঘরামির কাছে দুর্গাপুজো শুধু কয়েক দিনের উৎসব নয় তিনি পুজোর কয়দিন কোন খাবার না খেয়ে জল সরবত খেয়ে পুজো করেন। তাঁর জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা এক গভীর বিশ্বাস।

