পুরোনো রেডিওর গান।
গ্রামের নাম কুসুমডাঙা। ছোট্ট একটি গ্রাম। চারদিকে ধানখেত, মাঝখানে পাকা রাস্তা, আর রাস্তার এক পাশে কয়েকটি মাটির বাড়ি। সন্ধ্যা নামলেই গ্রামটা যেন ধীরে ধীরে নিজের দরজা বন্ধ করে দিত। দোকানের ঝাঁপ নামত, গরুগুলো গোয়ালে ফিরত, আর বাড়ির উঠোনে জ্বলে উঠত কেরোসিনের বাতি।
সেই গ্রামেই থাকত পনেরো বছরের রাহুল।
রাহুলের সবচেয়ে প্রিয় জিনিস ছিল তার দাদুর পুরোনো রেডিও।
রেডিওটি দেখতে ছিল একেবারে সেকেলে। কাঠের বাক্স, সামনে কাপড়ের জালি, আর পাশে বড় দুটো গোল বোতাম। রেডিওর গায়ে কোথাও কোথাও রং উঠে গিয়েছিল। বহু বছর আগে সেটি নাকি দাদু কলকাতা থেকে কিনে এনেছিলেন।
দাদু মারা যাওয়ার পর রেডিওটি পড়েছিল ঘরের এক কোণে।
কেউ আর সেটি চালাত না।
কিন্তু রাহুল মাঝে মাঝে ধুলো মুছে রেডিওটার সামনে বসে থাকত।
তার মনে হতো, এই বাক্সটার ভেতরে যেন অনেক পুরোনো দিনের গল্প আটকে আছে।
একদিন সন্ধ্যায় হঠাৎ রাহুলের মনে হলো, রেডিওটা চালিয়ে দেখা যাক।
সে পিছনের ঢাকনা খুলে দেখল তারগুলো জট পাকিয়ে আছে। ব্যাটারি নেই। পুরোনো তারের কিছু অংশ ছিঁড়েও গেছে।
রাহুলের বাবা হেসে বললেন,
—“ওটা আর চলবে না রে। কত বছর হয়ে গেছে!”
রাহুল বলল,
—“চেষ্টা করলে?”
—“চেষ্টা করতে পারিস। তবে নষ্ট জিনিস ঠিক করা সহজ নয়।”
সেই কথাটাই রাহুলের মাথায় ঢুকে গেল।
পরদিন স্কুল থেকে ফিরে সে রেডিওটা নিয়ে বসে পড়ল।
ইউটিউব দেখে, পুরোনো বই পড়ে, গ্রামের ইলেকট্রিশিয়ান হরিপদ কাকুর কাছে গিয়ে সে রেডিও সম্পর্কে জানতে লাগল।
হরিপদ কাকু বললেন,
—“তুই এত আগ্রহ নিয়ে শিখছিস যখন, একটা কথা মনে রাখিস—যন্ত্রকে শুধু হাত দিয়ে নয়, কান দিয়েও বুঝতে হয়।”
রাহুল অবাক হয়ে বলল,
—“কান দিয়ে?”
—“হ্যাঁ। কোন শব্দ কোথা থেকে আসছে, সেটাই অনেক সময় বলে দেয় কোথায় সমস্যা।”
রাহুল কথাটা মনে রাখল।
প্রায় এক সপ্তাহ পর এক সন্ধ্যায় সে রেডিওতে নতুন ব্যাটারি লাগিয়ে সুইচ ঘুরিয়ে দিল।
প্রথমে—
“ঘড়ঘড়… ঘড়ঘড়…”
তারপর হঠাৎ ভেসে এল অস্পষ্ট একটা কণ্ঠ।
রাহুল আনন্দে চিৎকার করে উঠল,
—“বাবা! বাবা! রেডিওটা চলছে!”
তার বাবা ছুটে এলেন।
মা রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে এলেন।
কয়েক সেকেন্ডের জন্য সবাই চুপ করে রইল।
তারপর পুরোনো রেডিও থেকে ভেসে এল একটি গান।
রাহুলের চোখে জল এসে গেল।
দাদু বেঁচে থাকলে আজ নিশ্চয়ই খুব খুশি হতেন।
সেদিনের পর থেকে রেডিওটা হয়ে উঠল রাহুলের নিত্যসঙ্গী।
প্রতিদিন সন্ধ্যায় সে রেডিও চালিয়ে বসত। কখনও গান, কখনও খবর, কখনও কৃষি বিষয়ক অনুষ্ঠান, কখনও দূরের মানুষের কথা।
একদিন কৃষি বিষয়ক একটি অনুষ্ঠানে একজন বিশেষজ্ঞ বলছিলেন, কম জলে কীভাবে সবজি চাষ করা যায়।
রাহুল মন দিয়ে শুনল।
তার বাবা কৃষিকাজ করতেন। সেই বছর জলের সমস্যা হওয়ায় তাঁদের জমিতে ভালো ফলন হয়নি।
রাহুল বাবাকে বলল,
—“বাবা, ওই অনুষ্ঠানে বলছিল কম জলে সবজি চাষের একটা পদ্ধতি আছে।”
বাবা প্রথমে গুরুত্ব দিলেন না।
—“রেডিওতে যা বলে সব কি আমাদের জমিতে কাজ করবে?”
রাহুল বলল,
—“চেষ্টা করে দেখতে তো পারি।”
অবশেষে বাবা রাজি হলেন।
ছোট্ট এক টুকরো জমিতে তাঁরা পরীক্ষামূলকভাবে নতুন পদ্ধতিতে সবজি চাষ শুরু করলেন।
কয়েক সপ্তাহ পর দেখা গেল, সত্যিই ভালো ফলন হয়েছে।
বাবা অবাক হয়ে বললেন,
—“তোর ওই পুরোনো রেডিও তাহলে শুধু গান শোনায় না!”
রাহুল হেসে বলল,
—“রেডিওটা কথা বলে, আমরা শুনি না।”
ধীরে ধীরে গ্রামের আরও কয়েকজন কৃষক রাহুলের কাছে আসতে লাগলেন।
কেউ জানতে চাইত কোন অনুষ্ঠান শুনলে কৃষির খবর পাওয়া যায়, কেউ জানতে চাইত আবহাওয়ার খবর কীভাবে শোনা যায়।
রাহুল তাদের জন্য প্রতি সন্ধ্যায় রেডিও চালিয়ে দিত।
একদিন গ্রামের বৃদ্ধ নিতাই কাকা এসে বললেন,
—“তোর দাদুর রেডিওটা আবার গ্রামের কাজে লাগছে দেখছি।”
রাহুল মাথা নিচু করে হাসল।
কিন্তু কয়েকদিন পর একটা বিপদ হল।
এক রাতে প্রচণ্ড ঝড় এল।
বাড়ির চালের একটা অংশ উড়ে গেল। উঠোনে থাকা জিনিসপত্র ভিজে গেল। রাহুল তাড়াতাড়ি রেডিওটা নিয়ে ঘরের ভেতর রাখল।
পরদিন সকালে দেখা গেল রেডিওটি আর চলছে না।
রাহুলের মন খারাপ হয়ে গেল।
সে অনেক চেষ্টা করেও সেটি চালু করতে পারল না।
হরিপদ কাকুও পরীক্ষা করে বললেন,
—“জল ঢুকেছে। কয়েকটা অংশ নষ্ট হয়েছে।”
রাহুল চুপ করে রেডিওটার দিকে তাকিয়ে রইল।
সেদিন সন্ধ্যায় সে প্রথমবার রেডিও ছাড়া উঠোনে বসেছিল।
চারপাশে নীরবতা।
হঠাৎ নিতাই কাকা এসে বললেন,
—“মন খারাপ করিস না।”
রাহুল বলল,
—“রেডিওটা না থাকলে দাদুর কথাও যেন মনে হয় হারিয়ে গেল।”
নিতাই কাকা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন,
—“তোর দাদু তো শুধু রেডিও রেখে যায়নি। তোকে শুনতে শিখিয়ে গেছে।”
রাহুল তাকিয়ে রইল।
—“কী শুনতে?”
নিতাই কাকা মৃদু হেসে বললেন,
—“মানুষের কথা। মাটির কথা। সময়ের কথা।”
কথাগুলো রাহুলের মনে গেঁথে গেল।
সে সিদ্ধান্ত নিল, রেডিওটা ঠিক করবেই।
পরের কয়েকদিন সে কলকাতায় থাকা এক পুরোনো রেডিও মেরামতির দোকানে ফোন করে বিভিন্ন যন্ত্রাংশের খোঁজ করল। নিজের জমানো টাকা দিয়ে কিছু যন্ত্রাংশ কিনল। হরিপদ কাকুর সাহায্যে ধীরে ধীরে রেডিওটি মেরামত করতে লাগল।
প্রায় এক মাস পর এক সন্ধ্যায় আবার সেই পুরোনো শব্দ শোনা গেল—
“ঘড়ঘড়…”
তারপর স্পষ্ট কণ্ঠ।
রাহুল আনন্দে চোখ বন্ধ করল।
রেডিও আবার বেঁচে উঠেছে।
সেদিন শুধু রাহুলের বাড়িতে নয়, গ্রামের আরও কয়েকটি বাড়িতে যেন আনন্দ ছড়িয়ে পড়েছিল।
এরপর রাহুল আরও একটি কাজ শুরু করল।
সে গ্রামের শিশুদের নিয়ে একটি ছোট্ট “শোনার আসর” বানাল।
প্রতি সপ্তাহে একদিন সবাই তার বাড়ির উঠোনে বসত। রেডিওতে শিক্ষামূলক অনুষ্ঠান শুনত। তারপর তারা আলোচনা করত।
কেউ প্রশ্ন করত।
কেউ নিজের অভিজ্ঞতা বলত।
কেউ নতুন কিছু শিখে পরের সপ্তাহে এসে সবাইকে জানাত।
কয়েক মাসের মধ্যেই গ্রামের মানুষ বুঝতে পারল, পুরোনো জিনিস মানেই অপ্রয়োজনীয় নয়।
একদিন স্কুলের শিক্ষক রাহুলকে বললেন,
—“তুমি একটা পুরোনো রেডিওকে নতুন কাজে ফিরিয়ে এনেছ। কিন্তু আসল কাজটা রেডিও করেনি।”
রাহুল জিজ্ঞেস করল,
—“তাহলে কে করেছে?”
শিক্ষক বললেন,
—“তোমার কৌতূহল।”
রাহুল মৃদু হেসে দাদুর রেডিওটার দিকে তাকাল।
কাঠের পুরোনো বাক্সটা তখনও আগের মতোই ছিল।
রং উঠে গেছে।
কাপড়ের জালি পুরোনো।
তবু তার ভেতর দিয়ে প্রতিদিন ভেসে আসছিল নতুন দিনের কথা।
রাহুল বুঝেছিল—
পুরোনো হয়ে যাওয়া মানেই মূল্যহীন হয়ে যাওয়া নয়। কখনও কখনও পুরোনো জিনিসের মধ্যেই লুকিয়ে থাকে নতুন পথের দরজা।
আর সেই দরজা খুলতে শুধু একজন মানুষের কৌতূহলই যথেষ্ট।

