ভোরের দুধওয়ালা।

ভোর তখন সবে ফুটছে।

পূর্ব আকাশে হালকা লাল আভা।

ঘুমন্ত বেলতলা গ্রামের সরু রাস্তা দিয়ে প্রতিদিন একটা সাইকেল চলে যায়।

সাইকেলের দুপাশে ঝোলানো দুটো অ্যালুমিনিয়ামের দুধের ক্যান।

সাইকেল চালায় সুধীর।

গ্রামের সবাই তাকে চেনে—সুধীর দুধওয়ালা বলে।

বয়স চল্লিশের কাছাকাছি।

প্রতিদিন ভোর সাড়ে চারটের মধ্যে তার ঘুম ভেঙে যায়।

প্রথমে গোয়ালঘরে যায়।

গরুগুলোকে খাবার দেয়।

তারপর দুধ দোয়ায়।

দুধ মেপে ক্যান ভরে সাইকেলে ওঠে।

তারপর শুরু হয় গ্রামের বাড়ি বাড়ি ঘোরা।

কেউ এক লিটার নেয়।

কেউ আধ লিটার।

কেউ শুধু এক গ্লাস।

কেউ মাসের শেষে টাকা দেয়।

কেউ আবার কয়েকদিন বাকি রাখে।

সুধীর কাউকে ফিরিয়ে দেয় না।

তার নিজের সংসারও খুব স্বচ্ছল নয়।

স্ত্রী মীরা বাড়িতে সেলাই করেন।

ছেলে অভি ক্লাস নাইন-এ পড়ে।

অভির স্বপ্ন—একদিন সে বিজ্ঞানী হবে।

কিন্তু সে বাবার পেশা নিয়ে একটু লজ্জা পেত।

বন্ধুরা যখন জিজ্ঞেস করত,

—“তোর বাবা কী করেন?”

অভি কখনও বলত,

—“দুধের ব্যবসা।”

কখনও বলত,

—“ব্যবসা করেন।”

সরাসরি বলত না—

“আমার বাবা দুধ বাড়ি বাড়ি পৌঁছে দেন।”

একদিন স্কুলে বিজ্ঞান প্রদর্শনী ছিল।

অভির বন্ধু সৌরভ তার বাবার পেশা নিয়ে গর্ব করে বলল,

—“আমার বাবা ইঞ্জিনিয়ার।”

আরেকজন বলল,

—“আমার বাবা ব্যাংকে চাকরি করেন।”

অভির পালা এলে সে চুপ করে রইল।

শিক্ষক জিজ্ঞেস করলেন,

—“তোমার বাবা কী করেন?”

অভি মাথা নিচু করে বলল,

—“ব্যবসা করেন।”

শিক্ষক আর কিছু জিজ্ঞেস করলেন না।

কিন্তু সেদিন বাড়ি ফেরার পথে অভি দেখল তার বাবা সাইকেলে দুধের ক্যান নিয়ে ফিরছেন।

সুধীর হাসতে হাসতে বললেন,

—“আজ স্কুল কেমন হল?”

অভি ছোট করে বলল,

—“ভালো।”

—“প্রদর্শনী?”

—“হ্যাঁ।”

—“কী বানিয়েছিলি?”

—“জল পরিশোধনের মডেল।”

সুধীরের চোখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল।

—“সত্যি? তুই তো বড় বিজ্ঞানী হবি!”

অভি হাসল না।

বরং বলল,

—“বাবা, তুমি অন্য কাজ করতে পারতে না?”

সুধীর কিছুক্ষণ চুপ করে সাইকেল চালালেন।

তারপর বললেন,

—“পারতাম হয়তো।”

—“কেন করোনি?”

—“এই কাজটা কেউ না করলে তোর সকালের দুধটা কে দিত?”

অভি কোনো উত্তর দিল না।

কয়েকদিন পর গ্রামের মানুষ একটা সমস্যায় পড়ল।

সুধীর অসুস্থ হয়ে পড়েছেন।

জ্বর।

সাইকেল চালানো তো দূরের কথা, বিছানা থেকে উঠতেই কষ্ট হচ্ছে।

সকালে একে একে ফোন আসতে লাগল।

—“আজ দুধ আসবে না?”

—“বাচ্চার জন্য দুধ দরকার।”

—“বৃদ্ধ মানুষ আছে বাড়িতে।”

মীরা চিন্তায় পড়ে গেলেন।

অভি বলল,

—“আমি যাব।”

মা অবাক।

—“তুই?”

—“হ্যাঁ।”

—“কিন্তু তুই তো কখনও দুধ বিলি করিসনি।”

অভি বলল,

—“বাবা প্রতিদিন করেন। আমিও একদিন করতে পারব।”

ভোর সাড়ে চারটায় অভির ঘুম ভাঙল।

বাবার সাইকেলটা বার করল।

দুধের ক্যান ঝোলাল।

প্রথম বাড়িতে গিয়ে সে বলল,

—“কাকিমা, দুধ।”

কাকিমা দরজা খুলে অবাক।

—“তুই?”

—“বাবা অসুস্থ।”

কাকিমা বললেন,

—“আয়, দুধটা দে।”

অভি এগিয়ে গেল।

তারপর দ্বিতীয় বাড়ি।

তৃতীয় বাড়ি।

চতুর্থ বাড়ি।

রাস্তা যত এগোল, অভির মনে হতে লাগল—বাবার কাজটা এত সহজ নয়।

কখনও কুকুরের ভয়।

কখনও অন্ধকার রাস্তা।

কখনও বৃষ্টির জল।

কখনও সাইকেলের চেন খুলে যাওয়া।

কখনও দুধ মাপার ভুল হলে ক্রেতার অসন্তোষ।

সব সামলে প্রতিদিন বাবা এই কাজ করেন।

সেদিন প্রায় তিন ঘণ্টা পর বাড়ি ফিরল অভি।

তার জামা ঘামে ভিজে গেছে।

হাত ব্যথা।

পা ব্যথা।

কিন্তু বাবার ঘরে ঢুকে বলল,

—“বাবা।”

সুধীর চোখ খুললেন।

—“সব দিয়ে এসেছিস?”

—“হ্যাঁ।”

—“কেউ কিছু বলল?”

অভি মাথা নাড়ল।

তারপর বাবার হাত ধরে বলল,

—“বাবা, তোমার কাজ কঠিন।”

সুধীর হেসে বললেন,

—“সব কাজই কঠিন, যদি মন দিয়ে করতে হয়।”

অভি কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।

তারপর বলল,

—“কাল থেকে আমি তোমার সঙ্গে যাব।”

সুধীর অবাক হয়ে ছেলের দিকে তাকালেন।

—“পড়াশোনা?”

—“ভোরে দুধ দেব। তারপর স্কুলে যাব।”

সুধীর বললেন,

—“তোর পড়াশোনা নষ্ট হবে।”

অভি বলল,

—“হবে না। বরং তোমার কাজটা বুঝব।”

সেদিনের পর অভি মাঝে মাঝে বাবার সঙ্গে যেতে শুরু করল।

কিন্তু সে শুধু দুধ বিলি করত না।

সে একটা খাতা নিয়ে বসত।

কোন বাড়িতে কত দুধ লাগে, কতটা ফেরত আসে, কোথায় বেশি চাহিদা—সব লিখে রাখত।

একদিন সে বাবাকে বলল,

—“বাবা, আমরা যদি গ্রামের আরও পাঁচজন গরুপালককে সঙ্গে নিই?”

সুধীর বললেন,

—“কেন?”

—“তাহলে বেশি দুধ সংগ্রহ করতে পারব।”

—“তারপর?”

—“একটা ছোট দুধ সমবায় করা যায়।”

সুধীর ছেলের দিকে তাকিয়ে রইলেন।

অভি একটা পরিকল্পনা তৈরি করল।

গ্রামের দশজন গরুপালককে নিয়ে দুধ সংগ্রহ শুরু হল।

দুধের মান পরীক্ষা করা হল।

ওজন মেশিন কেনা হল।

হিসাব খাতা তৈরি হল।

অভি মোবাইলে প্রতিদিনের হিসাব রাখতে শুরু করল।

ধীরে ধীরে গ্রামের দুধ শহরের একটা দোকানে নিয়মিত যেতে শুরু করল।

সুধীর আর একা সাইকেলে ঘুরতেন না।

গ্রামের আরও কয়েকজন যুবক কাজ পেল।

মীরা বললেন,

—“তোর বাবার দুধের ব্যবসা তো বড় হয়ে গেল!”

অভি হেসে বলল,

—“বাবার কাজ ছোট ছিল না মা। আমরা শুধু তার পরিধিটা বড় করেছি।”

কয়েক মাস পর স্কুলে আবার একটা অনুষ্ঠান হল।

এবার শিক্ষক সেই একই প্রশ্ন করলেন,

—“অভি, তোমার বাবা কী করেন?”

অভি গর্ব করে বলল,

—“আমার বাবা একজন দুধ উৎপাদক ও সরবরাহকারী। তিনি আমাদের গ্রামের অনেক পরিবারকে নিয়ে একটি ছোট দুধ সমবায় চালান।”

ক্লাসে হাততালি পড়ল।

অভি জানালার বাইরে তাকাল।

দূরে তার বাবা সাইকেল নিয়ে যাচ্ছেন।

সাইকেলের পাশে ঝুলছে সেই পুরোনো দুধের ক্যান।

কিন্তু আজ সুধীর একা নন।

পাশে আরও তিনটে সাইকেল।

আরও তিনজন যুবক।

ভোরের আলোয় চারটে সাইকেল এগিয়ে যাচ্ছে।

অভি মনে মনে বলল,

“কোনো কাজ ছোট নয়। ছোট হয় শুধু আমাদের দেখার চোখ।”

সেই দিন থেকে সে আর বাবার পেশা বলতে লজ্জা পায়নি।

বরং যখন কেউ জিজ্ঞেস করত,

—“তোমার বাবা কী করেন?”

অভি হাসত।

তারপর বলত,

—“আমার বাবা ভোরের আলো ফোটার আগেই মানুষের বাড়িতে পৌঁছে যান।”

সমাপ্ত।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *