কাঠের ঘানি কি হারিয়ে যাবে? ঐতিহ্যবাহী তেল উৎপাদন, কারিগরি জ্ঞান ও গ্রামীণ অর্থনীতির বদলে যাওয়া চিত্র নিয়ে বিশেষ সাক্ষাৎকার।

ঐতিহ্যবাহী তেল উৎপাদন, কারিগরি জ্ঞান ও গ্রামীণ অর্থনীতির বদলে যাওয়া চিত্র নিয়ে মুখোমুখি

বিশেষ সাক্ষাৎকার | কল্পিত

একসময় গ্রামের বাজার বা বসতবাড়ির আশেপাশে দেখা যেত কাঠের তৈরি বড় ঘানি। কোথাও সেটিকে বলা হতো তেলঘানি, কোথাও আবার স্থানীয় ভাষায় ছিল অন্য নাম। ঘানির চারপাশে ধীরে ধীরে ঘুরত কাঠের দণ্ড। তার সঙ্গে যুক্ত থাকত বলদ বা অন্য কোনো শক্তির উৎস। ঘানির ভেতরে রাখা তিল, সর্ষে, নারকেল বা অন্যান্য তেলবীজ চেপে সেখান থেকে বেরিয়ে আসত তেল।

আজকের পরিশোধিত, প্যাকেটজাত ও বৃহৎ শিল্পে উৎপাদিত তেলের বাজারে সেই দৃশ্য প্রায় হারিয়ে গেছে। আধুনিক যন্ত্রের মাধ্যমে অল্প সময়ে বিপুল পরিমাণ তেল উৎপাদন করা সম্ভব। ফলে ঐতিহ্যবাহী ঘানির ব্যবহার কমেছে, কমেছে ঘানি তৈরির কারিগরও।

কিন্তু ঘানির ইতিহাস শুধু তেল তৈরির ইতিহাস নয়। এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে কৃষি, ক্ষুদ্র ব্যবসা, পশুশ্রম, কাঠের কারিগরি, স্থানীয় বাজার এবং মানুষের খাদ্যাভ্যাসের দীর্ঘ ইতিহাস।

এই হারিয়ে যেতে বসা প্রযুক্তি নিয়ে কথা বললাম কল্পিত খাদ্য-ইতিহাস ও গ্রামীণ অর্থনীতি গবেষক ড. সৌমিত্র ঘোষের সঙ্গে।

প্রতিবেদক: প্রথমেই জানতে চাই, ঘানি আসলে কী?

ড. সৌমিত্র ঘোষ:
সহজভাবে বললে, ঘানি হলো তেলবীজ থেকে তেল বের করার একটি ঐতিহ্যবাহী যান্ত্রিক ব্যবস্থা। বিভিন্ন অঞ্চলে ঘানির নকশা ও ব্যবহারের ধরন আলাদা হতে পারে।

সাধারণত তিল, সর্ষে, চিনাবাদাম, নারকেল বা অন্য তেলবীজ ব্যবহার করা হতো। বীজ পরিষ্কার করার পর ঘানির নির্দিষ্ট অংশে দেওয়া হতো। তারপর চাপ ও ঘর্ষণের মাধ্যমে বীজ থেকে তেল বেরিয়ে আসত।

পুরনো ঘানির একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য ছিল এর সরলতা। খুব জটিল যন্ত্রাংশ ছাড়াই স্থানীয় উপকরণ ব্যবহার করে এটি তৈরি করা যেত।

প্রতিবেদক: ঘানি কি শুধুই একটি যন্ত্র, নাকি এর সঙ্গে একটি পেশাও জড়িত ছিল?

ড. সৌমিত্র ঘোষ:
এর সঙ্গে সম্পূর্ণ একটি পেশাগত কাঠামো জড়িত ছিল। ঘানি চালানো, ঘানি তৈরি করা, তেলবীজ সংগ্রহ করা, তেল বিক্রি করা—সব মিলিয়ে একটি ছোট অর্থনৈতিক ব্যবস্থা তৈরি হতো।

অনেক পরিবার প্রজন্মের পর প্রজন্ম তেল তৈরির কাজ করত। কারও ছিল ঘানি, কেউ তেলবীজ সরবরাহ করতেন, কেউ তেল বিক্রি করতেন।

এই ধরনের ক্ষুদ্র উৎপাদন ব্যবস্থা গ্রামের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখত।

প্রতিবেদক: ঘানি তৈরিতে কী ধরনের দক্ষতা প্রয়োজন হতো?

ড. সৌমিত্র ঘোষ:
অনেকটাই সূক্ষ্ম কারিগরি জ্ঞান দরকার হতো। কাঠের কোন অংশ কতটা মোটা হবে, কোন অংশে কত চাপ পড়বে, ঘানির বিভিন্ন অংশ কীভাবে বসবে—এসব বিষয় অভিজ্ঞতার মাধ্যমে শেখা হতো।

একটি ঘানি দেখতে সাধারণ মনে হলেও সেটিকে ঠিকভাবে তৈরি না করলে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যায় না।

সবচেয়ে বড় কথা, এই জ্ঞান বই পড়ে অর্জন করার চেয়ে হাতে-কলমে শেখা বেশি গুরুত্বপূর্ণ ছিল। একজন প্রবীণ কারিগর তাঁর ছেলে বা শিষ্যকে কাজ করতে করতে শেখাতেন।

প্রতিবেদক: আজ সেই কারিগরদের সংখ্যা কমে যাওয়ার কারণ কী?

ড. সৌমিত্র ঘোষ:
প্রধান কারণ বাজারের পরিবর্তন।

বড় কারখানায় আধুনিক যন্ত্রের সাহায্যে বিপুল পরিমাণ তেল উৎপাদন করা যায়। উৎপাদনের গতি বেশি, পরিবহণ ও প্যাকেজিংয়ের ব্যবস্থা উন্নত হয়েছে। ফলে ঐতিহ্যবাহী ঘানির তেলের সঙ্গে শিল্পোৎপাদিত তেলের প্রতিযোগিতা তৈরি হয়েছে।

অন্যদিকে ঘানি চালানোর জন্য শ্রম, সময় ও দক্ষতা দরকার। ফলে নতুন প্রজন্মের অনেকেই অন্য পেশায় চলে গেছে।

এখানে সামাজিক পরিবর্তনও গুরুত্বপূর্ণ। তরুণরা এমন পেশা বেছে নিতে চান যেখানে নিয়মিত আয়, আধুনিক কর্মপরিবেশ এবং ভবিষ্যতে সম্প্রসারণের সুযোগ রয়েছে।

প্রতিবেদক: মানুষ এখন ঘানির তেলের কথা আবার কেন বলছে?

ড. সৌমিত্র ঘোষ:
এর পেছনে কয়েকটি কারণ রয়েছে। মানুষ এখন খাবারের উৎস ও উৎপাদন প্রক্রিয়া সম্পর্কে আগের তুলনায় বেশি জানতে চাইছে। ‘কোথা থেকে এল’, ‘কীভাবে তৈরি হলো’, ‘কী কী প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে গেল’—এই প্রশ্নগুলো গুরুত্ব পাচ্ছে।

এই কারণে ঐতিহ্যবাহী পদ্ধতিতে তৈরি কিছু খাদ্যপণ্যের প্রতি আগ্রহ দেখা যাচ্ছে।

তবে এখানে সতর্কতা দরকার। শুধু ‘ঘানিতে তৈরি’ লেখা থাকলেই কোনো তেল স্বয়ংক্রিয়ভাবে বেশি ভালো বা নিরাপদ হয়ে যায় না। তেলবীজের মান, পরিচ্ছন্নতা, সংরক্ষণ, প্রক্রিয়াকরণ এবং প্যাকেজিং—সবই গুরুত্বপূর্ণ।

প্রতিবেদক: সর্ষের তেল তৈরির ক্ষেত্রে ঘানির ব্যবহার সম্পর্কে কিছু বলবেন?

ড. সৌমিত্র ঘোষ:
সর্ষে বাংলার খাদ্যসংস্কৃতির সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। সর্ষের বীজ থেকে তেল বের করার ঐতিহ্য বহু পুরনো।

বীজ পরিষ্কার করে ঘানিতে দেওয়া হতো। ধীরে ধীরে চাপ ও ঘর্ষণের মাধ্যমে তেল বেরিয়ে আসত। পরে সেটি ছেঁকে সংরক্ষণ করা হতো।

আগের দিনে পরিবারের প্রয়োজন অনুযায়ী অল্প পরিমাণ তেল তৈরি করা যেত। বাজার থেকে তেল কেনার ওপর সম্পূর্ণ নির্ভরতা ছিল না।

প্রতিবেদক: ঘানির তেল এবং আধুনিক শিল্পে তৈরি তেলের মধ্যে পার্থক্য কী?

ড. সৌমিত্র ঘোষ:
এখানে ‘ভালো’ বা ‘খারাপ’ বলে সরল তুলনা না করে উৎপাদন পদ্ধতির পার্থক্য বোঝা উচিত।

ঘানিতে সাধারণত ছোট পরিমাণে তেল তৈরি হয় এবং উৎপাদনের গতি ধীর। আধুনিক শিল্পে বড় পরিমাণ তেল উৎপাদন করা যায় এবং বিভিন্ন ধাপে পরিশোধন ও মান নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা থাকে।

তেল কোন পদ্ধতিতে তৈরি হয়েছে তার পাশাপাশি সেটি কীভাবে সংরক্ষিত হয়েছে, কতদিনের মধ্যে ব্যবহার করা হচ্ছে এবং উৎপাদনের সময় স্বাস্থ্যবিধি মানা হয়েছে কি না—এসবও গুরুত্বপূর্ণ।

প্রতিবেদক: তাহলে ঘানির তেলকে কেন্দ্র করে ব্যবসার সুযোগ আছে?

ড. সৌমিত্র ঘোষ:
নিশ্চয়ই আছে, তবে এটি একটি নির্দিষ্ট বাজারের ব্যবসা হিসেবে ভাবতে হবে।

কেউ যদি ছোট আকারে তেলবীজ সংগ্রহ করে, পরিষ্কারভাবে তেল তৈরি করে এবং সঠিকভাবে প্যাকেজিং ও লেবেলিং করে বাজারজাত করেন, তাহলে একটি স্থানীয় ব্র্যান্ড তৈরি হতে পারে।

বিশেষ করে সরাসরি কৃষকের কাছ থেকে তেলবীজ সংগ্রহ করলে কৃষক ও উৎপাদক—দুজনের মধ্যেই অর্থনৈতিক সম্পর্ক তৈরি হতে পারে।

তবে খাদ্যপণ্য হিসেবে বিক্রি করার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য আইন, মাননিয়ন্ত্রণ, লেবেলিং এবং স্বাস্থ্যবিধি অবশ্যই মানতে হবে।

প্রতিবেদক: ছোট ব্যবসায়ীরা সবচেয়ে বড় কোন সমস্যার মুখোমুখি হতে পারেন?

ড. সৌমিত্র ঘোষ:
প্রথম সমস্যা হলো কাঁচামালের ধারাবাহিক সরবরাহ। ভালো মানের তেলবীজ নিয়মিত পাওয়া দরকার।

দ্বিতীয় সমস্যা হলো উৎপাদন খরচ। ছোট উৎপাদক বড় শিল্পের সঙ্গে একই দামে প্রতিযোগিতা করতে পারবেন না।

তৃতীয় সমস্যা হলো বাজার তৈরি করা। শুধু ভালো পণ্য তৈরি করলেই হবে না, ক্রেতাকে পণ্যের বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে জানাতে হবে।

চতুর্থ সমস্যা হলো বিশ্বাসযোগ্যতা। খাদ্যপণ্যের ক্ষেত্রে ক্রেতার আস্থা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

প্রতিবেদক: গ্রামের কৃষকদের সঙ্গে ঘানির সম্পর্ক কীভাবে আরও শক্তিশালী করা যায়?

ড. সৌমিত্র ঘোষ:
স্থানীয় কৃষকদের কাছ থেকে সরাসরি তেলবীজ সংগ্রহ করা যেতে পারে। এতে মধ্যস্বত্বভোগীর ওপর নির্ভরতা কিছুটা কমতে পারে।

একটি সমবায় ব্যবস্থা তৈরি করা যেতে পারে, যেখানে কৃষকরা তেলবীজ উৎপাদন করবেন এবং স্থানীয় উদ্যোক্তা বা সমবায় সেই বীজ থেকে তেল তৈরি করবে।

এর ফলে একটি স্থানীয় মূল্যশৃঙ্খল তৈরি হবে।

তবে কৃষককে শুধু কাঁচামাল সরবরাহকারী হিসেবে দেখা উচিত নয়। তাঁকে ন্যায্য দাম দেওয়া এবং চুক্তির শর্ত পরিষ্কার রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

প্রতিবেদক: ঘানির সঙ্গে গবাদিপশুরও তো সম্পর্ক ছিল?

ড. সৌমিত্র ঘোষ:
হ্যাঁ, ঐতিহাসিকভাবে বহু ধরনের ঘানি পশুশক্তির সাহায্যে চালানো হয়েছে। বলদ বা অন্য পশু বৃত্তাকারে ঘুরে কাঠের দণ্ডকে চালাত।

এটি গ্রামীণ জীবনের একটি আন্তঃসম্পর্কের উদাহরণ। একই গ্রামের কৃষি, পশুপালন, তেল উৎপাদন এবং বাজার—সব একে অপরের সঙ্গে যুক্ত ছিল।

তবে আজ যদি ঐতিহ্যবাহী ঘানি প্রদর্শন বা ব্যবহার করা হয়, পশুর কল্যাণ ও আধুনিক প্রাণীকল্যাণের মানদণ্ড অবশ্যই বিবেচনা করতে হবে।

প্রতিবেদক: আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে কি ঘানির ঐতিহ্য রক্ষা করা যায়?

ড. সৌমিত্র ঘোষ:
অবশ্যই। ঐতিহ্য সংরক্ষণ মানেই প্রযুক্তিকে বাদ দেওয়া নয়।

পুরনো ঘানির নকশা ডিজিটালভাবে সংরক্ষণ করা যায়। কারিগরের কাজ ভিডিও করে রাখা যায়। পুরনো ঘানির বিভিন্ন অংশের মাপ ও নির্মাণপদ্ধতি নথিভুক্ত করা যায়।

এমনকি আধুনিক ছোট যন্ত্র তৈরি করা যেতে পারে, যা ঐতিহ্যবাহী ঘানির মূল ধারণা থেকে অনুপ্রাণিত হলেও স্বাস্থ্যবিধি, উৎপাদন দক্ষতা এবং শ্রমের নিরাপত্তার দিক থেকে উন্নত।

প্রতিবেদক: ঘানি কি পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তির উদাহরণ হতে পারে?

ড. সৌমিত্র ঘোষ:
কিছু দিক থেকে বলা যায়। এটি স্থানীয় উপকরণ ব্যবহার করে তৈরি হতে পারে এবং ঐতিহাসিকভাবে প্রত্যক্ষ বিদ্যুৎনির্ভর ছিল না।

কিন্তু পরিবেশবান্ধব শব্দটি ব্যবহার করার আগে পুরো ব্যবস্থাটি বিবেচনা করা উচিত। কাঠ কোথা থেকে আসছে, কতদিন ব্যবহার হচ্ছে, তেলবীজ কোথা থেকে আসছে, উৎপাদন ও পরিবহণে কত শক্তি লাগছে—সবই দেখতে হবে।

পরিবেশ নিয়ে আলোচনায় কোনো একটি বৈশিষ্ট্য দেখে পুরো ব্যবস্থাকে বিচার করা ঠিক নয়।

প্রতিবেদক: তেল তৈরির পর যে খৈল থাকে, সেটিরও তো ব্যবহার আছে?

ড. সৌমিত্র ঘোষ:
হ্যাঁ। তেলবীজ থেকে তেল বের করার পর যে অবশিষ্ট অংশ থাকে তাকে সাধারণভাবে খৈল বলা হয়। বিভিন্ন ধরনের খৈলের ব্যবহার ভিন্ন হতে পারে।

কিছু খৈল পশুখাদ্য হিসেবে ব্যবহৃত হয়, কিছু কৃষিতে সার হিসেবে ব্যবহারের ঐতিহ্য রয়েছে। তবে কোন খৈল কীভাবে ব্যবহার করা নিরাপদ, তা তেলবীজের ধরন ও উপাদানের ওপর নির্ভর করে। তাই স্থানীয় জ্ঞান থাকলেও আধুনিক নিরাপত্তা নির্দেশনা মানা দরকার।

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—উৎপাদনের উপজাতকেও কাজে লাগানো গেলে ক্ষুদ্র শিল্পের অর্থনৈতিক দক্ষতা বাড়তে পারে।

প্রতিবেদক: গ্রামের মহিলারা কি এই ধরনের উদ্যোগে যুক্ত হতে পারেন?

ড. সৌমিত্র ঘোষ:
অবশ্যই। শুধু ঘানি চালানো নয়—তেলবীজ পরিষ্কার করা, প্যাকেজিং, লেবেলিং, হিসাবরক্ষণ, বিপণন, অনলাইন অর্ডার পরিচালনা—বিভিন্ন পর্যায়ে নারীরা যুক্ত হতে পারেন।

স্বনির্ভর গোষ্ঠী বা ছোট সমবায়ের মাধ্যমে স্থানীয় তেলবীজকে কেন্দ্র করে ক্ষুদ্র খাদ্য উদ্যোগ তৈরি করা সম্ভব।

তবে উদ্যোগের মালিকানা ও আয়ের ওপর নারীদের বাস্তব নিয়ন্ত্রণ থাকা গুরুত্বপূর্ণ। শুধু শ্রম দেওয়াকে অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন বলা যায় না।

প্রতিবেদক: অনলাইনে ঘানির তেল বিক্রি করা সম্ভব?

ড. সৌমিত্র ঘোষ:
বর্তমানে ডিজিটাল বিপণনের মাধ্যমে ছোট উৎপাদকও দূরের ক্রেতার কাছে পৌঁছাতে পারেন। তবে খাদ্যপণ্য অনলাইনে বিক্রি করলে প্যাকেজিং, লেবেলিং, সংরক্ষণ এবং পরিবহণের বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

একটি সুন্দর গল্প বা ঐতিহ্যের ছবি দিয়ে পণ্য প্রচার করা সহজ। কিন্তু তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো ক্রেতাকে সঠিক তথ্য দেওয়া।

কোন বীজ, কোথায় উৎপাদিত, উৎপাদনের তারিখ, পরিমাণ, সংরক্ষণ পদ্ধতি—যে তথ্য আইন অনুযায়ী প্রয়োজন, তা স্পষ্ট থাকতে হবে।

প্রতিবেদক: পুরনো ঘানি কি গ্রামীণ জাদুঘরের অংশ হতে পারে?

ড. সৌমিত্র ঘোষ:
খুব সহজেই হতে পারে। একটি ঘানির পাশে শুধু ‘পুরনো তেল তৈরির যন্ত্র’ লিখে রাখলে তার ইতিহাস বোঝানো হবে না।

তার সঙ্গে একটি গল্প থাকতে হবে—কোন পরিবার এটি ব্যবহার করত, কোন কাঠ দিয়ে তৈরি, কী ধরনের বীজ থেকে তেল তৈরি হতো, দিনে কতক্ষণ কাজ চলত, কে ঘানি চালাতেন, উৎপাদিত তেল কোথায় বিক্রি হতো।

অর্থাৎ যন্ত্রটির সঙ্গে মানুষের জীবনকেও সংরক্ষণ করতে হবে।

প্রতিবেদক: আপনি কি মনে করেন, ঘানিকে কেন্দ্র করে গ্রামের পর্যটনও তৈরি হতে পারে?

ড. সৌমিত্র ঘোষ:
হ্যাঁ, তবে পর্যটন যেন কৃত্রিম প্রদর্শনীতে পরিণত না হয়।

কোনো গ্রামে যদি ঐতিহ্যবাহী কৃষি, খাদ্য, কারুশিল্প এবং স্থানীয় জীবনযাত্রাকে সম্মানজনকভাবে তুলে ধরা হয়, সেখানে পর্যটকদের আগ্রহ তৈরি হতে পারে।

একজন পর্যটক হয়তো দেখলেন কীভাবে তেলবীজ পরিষ্কার করা হচ্ছে, কীভাবে পুরনো ঘানি কাজ করত, কীভাবে স্থানীয় খাবার তৈরি হয়। একই সঙ্গে গ্রামের কৃষকের উৎপাদিত পণ্য কিনলেন।

তাহলে পর্যটনের অর্থ সরাসরি গ্রামের মানুষের কাছে পৌঁছাতে পারে।

প্রতিবেদক: স্কুলে এই বিষয় নিয়ে কী ধরনের শিক্ষামূলক কাজ হতে পারে?

ড. সৌমিত্র ঘোষ:
একটি চমৎকার প্রকল্প হতে পারে—‘আমাদের এলাকার হারিয়ে যাওয়া প্রযুক্তি’।

ছাত্রছাত্রীরা প্রবীণ মানুষের সাক্ষাৎকার নিতে পারে। পুরনো ঘানির ছবি সংগ্রহ করতে পারে। তার কার্যপদ্ধতির একটি মডেল তৈরি করতে পারে।

বিজ্ঞান ক্লাসে লিভার ও ঘর্ষণের ধারণা বোঝানো যায়। ইতিহাসের ক্লাসে গ্রামীণ অর্থনীতি নিয়ে আলোচনা করা যায়। ভূগোলের সঙ্গে কৃষি ও তেলবীজ উৎপাদনের সম্পর্ক দেখানো যায়।

একটি পুরনো ঘানি তখন শুধু একটি কাঠের বস্তু থাকবে না; সেটি হয়ে উঠবে একটি শিক্ষার উপকরণ।

প্রতিবেদক: আপনার মতে, ঘানির সবচেয়ে বড় শিক্ষা কী?

ড. সৌমিত্র ঘোষ:
আমার কাছে সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো—স্থানীয় সম্পদকে ব্যবহার করে মানুষ কীভাবে নিজের প্রয়োজন মেটানোর ব্যবস্থা তৈরি করেছিল।

আজ আমরা প্রযুক্তিকে অনেক সময় শুধু বড় কারখানা ও উন্নত যন্ত্রের সঙ্গে যুক্ত করি। কিন্তু প্রযুক্তির ইতিহাস আসলে মানুষের সমস্যা সমাধানের ইতিহাস।

ঘানি তার একটি উদাহরণ।

আরেকটি শিক্ষা হলো—কোনো পেশা হারিয়ে গেলে শুধু একটি ব্যবসা হারায় না। তার সঙ্গে হারিয়ে যেতে পারে কারিগরি জ্ঞান, স্থানীয় শব্দ, সামাজিক সম্পর্ক এবং বহু প্রজন্মের অভিজ্ঞতা।

প্রতিবেদক: ভবিষ্যতে আপনি ঘানিকে কোথায় দেখতে চান?

ড. সৌমিত্র ঘোষ:
আমি চাই, ঘানি তার প্রয়োজন অনুযায়ী নতুন জায়গা খুঁজে নিক।

যেখানে আধুনিক যন্ত্রের মাধ্যমে বৃহৎ পরিমাণ তেল উৎপাদন হচ্ছে, সেখানে সেটি চলতেই থাকবে। কিন্তু ঐতিহ্যবাহী ঘানি ছোট উৎপাদন, শিক্ষামূলক প্রদর্শনী, গ্রামীণ পর্যটন এবং বিশেষ খাদ্যপণ্যের সঙ্গে যুক্ত হতে পারে।

সবচেয়ে জরুরি হলো, ঘানি তৈরির ও ব্যবহারের জ্ঞান নথিভুক্ত করা।

একটি পুরনো ঘানি ভেঙে গেলে সেটি হয়তো আর আগের মতো ফিরবে না। কিন্তু তার নকশা, কারিগরের অভিজ্ঞতা এবং ব্যবহারকারীর স্মৃতি সংরক্ষিত থাকলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম চাইলে সেই প্রযুক্তিকে আবার বুঝতে পারবে।

প্রতিবেদক: পাঠকদের উদ্দেশে শেষ বার্তাটি কী দেবেন?

ড. সৌমিত্র ঘোষ:
আমরা আধুনিক বাজারের সুবিধা নেব, আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করব—এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু তার পাশাপাশি নিজের এলাকার পুরনো প্রযুক্তি ও পেশাগুলোর ইতিহাস জানাও জরুরি।

আপনার বাড়ির আশেপাশে যদি কোনো পুরনো ঘানি থাকে, সেটির ছবি তুলুন। বয়স্ক মানুষদের জিজ্ঞেস করুন সেটি কে ব্যবহার করতেন। কী ধরনের বীজ থেকে তেল তৈরি হতো, কোথায় বিক্রি করা হতো—জানুন।

কারণ ইতিহাস সবসময় বইয়ের পাতায় লেখা থাকে না। কখনও কখনও ইতিহাস একটি পুরনো কাঠের যন্ত্রের গায়েও লেখা থাকে।


প্রতিবেদকের শেষকথা

আজকের বাজারে বোতলবন্দি তেল কিনতে আমাদের কয়েক মিনিটের বেশি সময় লাগে না। কিন্তু সেই তেল উৎপাদনের পেছনে রয়েছে আধুনিক কৃষি, শিল্প, যন্ত্র, পরিবহণ, পরিশোধন, প্যাকেজিং ও বিপণনের বিশাল ব্যবস্থা।

তার বহু আগে গ্রামের মানুষ নিজেদের প্রয়োজন মেটাতে যে ছোট ছোট প্রযুক্তি তৈরি করেছিলেন, ঘানি তার একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ।

ঘানির শব্দ হয়তো আজ অনেক গ্রামে আর শোনা যায় না। কাঠের দণ্ডের ধীর গতির ঘূর্ণনও হয়তো স্থান নিয়েছে বৈদ্যুতিক মোটরের দ্রুত গতির ঘূর্ণনে। কিন্তু প্রযুক্তি বদলে যাওয়ার অর্থ এই নয় যে পুরনো জ্ঞান অর্থহীন হয়ে গেছে।

ঘানি আমাদের মনে করিয়ে দেয়—প্রযুক্তির ইতিহাস আসলে মানুষের জীবনযাত্রার ইতিহাস।

কোনো পুরনো পেশাকে ফিরিয়ে আনা সম্ভব না হলেও তার জ্ঞানকে সংরক্ষণ করা সম্ভব। কারিগরের অভিজ্ঞতা রেকর্ড করা সম্ভব। পুরনো যন্ত্রের নকশা সংরক্ষণ করা সম্ভব। নতুন প্রজন্মকে সেই প্রযুক্তির বৈজ্ঞানিক ভিত্তি বোঝানো সম্ভব।

হয়তো ভবিষ্যতের কোনো গবেষক, উদ্যোক্তা বা তরুণ কারিগর সেই পুরনো জ্ঞান থেকেই নতুন কোনো ধারণা তৈরি করবেন।

তাই ঘানি শুধু অতীতের একটি কাঠের যন্ত্র নয়। এটি গ্রামীণ মানুষের উদ্ভাবনী ক্ষমতা, শ্রম এবং আত্মনির্ভরতার ইতিহাসের একটি স্মারক।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *