যে ঘড়িটি কখনও থামেনি।

নদিয়ার এক পুরোনো শহরতলি—শান্তিপুরের কাছের রাধানগর। বাজারের শেষ মাথায় একটি ছোট্ট ঘড়ির দোকান ছিল। দোকানটির নাম—

“সময়ের সঙ্গী”।

দোকানের মালিক ছিলেন হরনাথবাবু। বয়স সত্তরের কাছাকাছি। চোখে মোটা চশমা, হাতে সবসময় ছোট স্ক্রু-ড্রাইভার আর টেবিলের ওপর নানা ধরনের ঘড়ির যন্ত্রাংশ।

দোকানে ঢুকলেই টিকটিক শব্দ শোনা যেত।

দেয়ালে ঝোলানো ঘড়ি।

টেবিলে রাখা ঘড়ি।

কাঁচের বাক্সে সাজানো পকেট ঘড়ি।

কোনোটার কাঁটা দ্রুত চলছে, কোনোটার ধীরে।

কিন্তু দোকানের একেবারে পেছনের দেওয়ালে ঝোলানো একটি বড় কাঠের ঘড়ি ছিল আলাদা।

তার কাঁটা চলত নিখুঁতভাবে।

হরনাথবাবু প্রতিদিন সকালে ঘড়িটির দিকে তাকিয়ে বলতেন,

— “তুই এখনও ঠিক সময়ে চলিস।”


নাতি রোহনের আগমন

হরনাথবাবুর নাতি রোহন শহরে পড়াশোনা করত। ছুটিতে দাদুর কাছে এলে দোকানে বসতে তার একেবারেই ভালো লাগত না।

সে মোবাইল নিয়ে ব্যস্ত থাকত।

একদিন দাদু বললেন,

— “এই ঘড়িটা একটু ধর তো।”

রোহন বিরক্ত হয়ে বলল,

— “দাদু, আমি ঘড়ি মেরামত শিখব না। এখন সবাই মোবাইলে সময় দেখে।”

হরনাথবাবু হেসে বললেন,

— “সময় দেখার যন্ত্র বদলেছে, সময় তো বদলায়নি।”

রোহন উত্তর দিল না।


পুরোনো ঘড়ির গল্প

একদিন দোকানে ক্রেতা না থাকায় হরনাথবাবু সেই বড় ঘড়িটির সামনে বসে রইলেন।

রোহন পাশে বসে মোবাইল দেখছিল।

হঠাৎ দাদু বললেন,

— “জানিস, এই ঘড়িটা তোর ঠাকুমা আমাকে দিয়েছিল।”

রোহন মাথা তুলল।

— “কখন?”

— “আমাদের বিয়ের দিন।”

হরনাথবাবু মৃদু হেসে বললেন,

— “তখন আমাদের কিছুই ছিল না। এই ঘড়িটা ছিল আমাদের প্রথম বড় জিনিস।”

রোহন ঘড়িটির দিকে তাকাল।

— “ঠাকুমা কোথায় পেলেন?”

— “তাঁর বাবার বাড়ির পুরোনো ঘড়ি ছিল। বিয়ের সময় আমাকে দিয়ে বলেছিলেন—’যতদিন ঘড়িটা চলবে, ততদিন আমাদের সংসারও চলবে।'”

রোহন চুপ করে শুনছিল।


একদিন ঘড়ি থেমে গেল

পরদিন সকালে হরনাথবাবু দোকান খুলে দেখলেন—

ঘড়িটি থেমে গেছে।

তিনি অনেক চেষ্টা করেও চালু করতে পারলেন না।

রোহন বলল,

— “দাদু, পুরোনো হয়েছে। নতুন একটা কিনে নাও।”

হরনাথবাবু মাথা নাড়লেন।

— “সব পুরোনো জিনিস ফেলে দিতে নেই। কিছু জিনিসের ভেতরে সময় জমে থাকে।”

তিনি ঘড়িটিকে খুলে ফেললেন।

একটির পর একটি যন্ত্রাংশ পরীক্ষা করতে লাগলেন।

কিন্তু সমস্যাটি সহজ ছিল না।

মূল যন্ত্রের একটি ছোট অংশ ভেঙে গেছে।

সেই যন্ত্রাংশ বাজারে পাওয়া যায় না।


শেষ চেষ্টা

হরনাথবাবু বললেন,

— “এটা হয়তো আর ঠিক হবে না।”

রোহন প্রথমবার দাদুর মুখে এমন হতাশা দেখল।

সে ঘড়িটির দিকে তাকিয়ে বলল,

— “আমি চেষ্টা করব।”

দাদু অবাক।

— “তুই?”

— “হ্যাঁ। আমাকে শেখাও।”

সেদিন থেকে রোহনের মোবাইলের ব্যবহার কমে গেল।

দাদুর পাশে বসে সে ছোট ছোট যন্ত্রাংশ চিনতে শুরু করল।

স্ক্রু খোলা।

গিয়ার পরিষ্কার করা।

স্প্রিং ঠিক করা।

তেল দেওয়া।

সবকিছু শিখতে লাগল।


অপ্রত্যাশিত আবিষ্কার

একদিন রোহন পুরোনো যন্ত্রাংশের বাক্স ঘাঁটতে ঘাঁটতে একটি ছোট ধাতব অংশ পেল।

সে দাদুকে দেখাল।

হরনাথবাবু চোখের চশমা ঠিক করে বললেন,

— “এটা তো ঠিক সেই অংশের মতো!”

কিন্তু মাপ পুরোপুরি মিলছিল না।

রোহন বলল,

— “আমরা কি এটাকে একটু পরিবর্তন করতে পারি?”

দাদু বললেন,

— “পারিস, তবে খুব সাবধানে।”

দুজন মিলে কাজ শুরু করলেন।

এক ঘণ্টা।

দুই ঘণ্টা।

তিন ঘণ্টা।

অবশেষে অংশটি বসানো হলো।

হরনাথবাবু ঘড়ির কাঁটা ঠিক করলেন।

তারপর পেছনের দিকের চাবি ঘোরালেন।

সবাই চুপ।

এক সেকেন্ড।

দুই সেকেন্ড।

তারপর—

টিক।

আরেকটি—

টিক।

ঘড়ি আবার চলতে শুরু করল।

রোহন আনন্দে চিৎকার করে উঠল,

— “দাদু! চলছে!”

হরনাথবাবুর চোখে জল এসে গেল।

তিনি বললেন,

— “বলেছিলাম না, সব পুরোনো জিনিস ফেলে দিতে নেই।”


সময়ের নতুন পাঠ

এরপর রোহনের জীবন বদলে গেল।

সে বুঝতে পারল, যন্ত্রের ভেতরের ছোট ছোট অংশের মতো মানুষের জীবনেও প্রতিটি মানুষের একটা ভূমিকা আছে।

কেউ বড়।

কেউ ছোট।

কেউ সামনে।

কেউ আড়ালে।

কিন্তু একজনকে সরিয়ে দিলে পুরো ব্যবস্থা থেমে যেতে পারে।

রোহন স্কুলে ফিরে গিয়ে বিজ্ঞান প্রদর্শনীতে একটি পুরোনো ঘড়ির মডেল তৈরি করল।

তার প্রকল্পের নাম দিল—

“সময়কে বোঝা”।

প্রকল্পটি পুরস্কার পেল।

কিন্তু রোহন পুরস্কার নিয়ে প্রথমেই দাদুর কাছে গেল।

— “এটা তোমার জন্য।”

হরনাথবাবু বললেন,

— “আমার জন্য কেন?”

— “কারণ তুমি আমাকে ঘড়ি নয়, সময়ের মূল্য শিখিয়েছ।”


একটি নতুন দোকান

কয়েক বছর পরে হরনাথবাবুর চোখ দুর্বল হয়ে গেল।

দোকানে আগের মতো বসতে পারতেন না।

রোহন তখন পড়াশোনা শেষ করে ফিরে এল।

সে দাদুর দোকানটি নতুন করে সাজাল।

নাম বদলাল না।

“সময়ের সঙ্গী” নামটিই রয়ে গেল।

তবে দোকানের এক পাশে আধুনিক ঘড়ি, স্মার্টওয়াচ ও ইলেকট্রনিক ঘড়ির মেরামতির ব্যবস্থা হলো।

অন্য পাশে রইল পুরোনো যান্ত্রিক ঘড়ি।

দেয়ালের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় রাখা হলো সেই কাঠের ঘড়িটি।


দাদুর শেষ দিন

এক শীতের সকালে হরনাথবাবু দোকানের চেয়ারে বসে ছিলেন।

রোহন ঘড়ির কাঁটা পরীক্ষা করছিল।

দাদু বললেন,

— “রোহন।”

— “হ্যাঁ?”

— “ঘড়িটা ঠিকমতো চলছে তো?”

— “একদম।”

— “তাহলে ভালো।”

কিছুক্ষণ পর তিনি চোখ বন্ধ করলেন।

রোহন ভেবেছিল দাদু হয়তো ঘুমিয়ে পড়েছেন।

কিন্তু তিনি আর জাগলেন না।

দোকানের সব ঘড়ি চলছিল।

কেবল একজন মানুষ থেমে গেলেন।


সেদিন সন্ধ্যায় রোহন দোকানের আলো বন্ধ করার আগে সেই কাঠের ঘড়িটির দিকে তাকাল।

কাঁটা ঠিক সময় দেখাচ্ছে।

টিক।

টিক।

টিক।

রোহনের মনে হলো, দাদু যেন এখনও পাশে বসে আছেন।

বলছেন—

“সময়কে ধরে রাখা যায় না। কিন্তু সময়ের মধ্যে মানুষ যে ভালোবাসা রেখে যায়, সেটা থেকে যায়।”


শেষ নয়

বহু বছর পরে “সময়ের সঙ্গী” দোকানটি এলাকার পরিচিত একটি ঘড়ি-সংগ্রহশালায় পরিণত হলো।

রোহন সেখানে পুরোনো ঘড়ির পাশাপাশি তাদের গল্পও লিখে রাখত।

কোন ঘড়ি কার বিয়ের স্মৃতি।

কোন ঘড়ি কোনো পরিবারের উত্তরাধিকার।

কোন ঘড়ি কোনো মানুষের শেষ উপহার।

আর দোকানের সবচেয়ে বড় ঘড়িটির নিচে লেখা ছিল—

“এই ঘড়িটি একদিন থেমে গিয়েছিল। একজন মানুষ বিশ্বাস করেননি যে তার গল্প শেষ হয়ে গেছে। তাই তিনি আবার তাকে চালু করেছিলেন।”

তার নিচে আরও একটি লাইন—

“সময় থামে না। কিন্তু ভালোবাসা সময়কে স্মৃতি বানিয়ে রেখে যায়।”

রোহন প্রতিদিন দোকান খোলার সময় ঘড়িটির দিকে তাকায়।

তারপর চাবি ঘুরিয়ে দোকানের পুরোনো ঘড়িগুলো চালু করে।

চারপাশে একসঙ্গে শত শত টিকটিক শব্দ ছড়িয়ে পড়ে।

আর সেই শব্দের মধ্যে যেন সে শুনতে পায়—

দাদুর কণ্ঠ।

— “সময়কে সম্মান করিস। কারণ সময় চলে গেলে তাকে আর মেরামত করা যায় না।”

রোহন মৃদু হাসে।

তারপর দোকানের দরজা খুলে দেয়।

নতুন দিনের সময় শুরু হয়।

সমাপ্ত। ⏰❤️

৩৩. যে ঘড়িটি কখনও থামেনি

যে ঘড়িটি কখনও থামেনি

নদিয়ার এক পুরোনো শহরতলি—শান্তিপুরের কাছের রাধানগর। বাজারের শেষ মাথায় একটি ছোট্ট ঘড়ির দোকান ছিল। দোকানটির নাম—

“সময়ের সঙ্গী”।

দোকানের মালিক ছিলেন হরনাথবাবু। বয়স সত্তরের কাছাকাছি। চোখে মোটা চশমা, হাতে সবসময় ছোট স্ক্রু-ড্রাইভার আর টেবিলের ওপর নানা ধরনের ঘড়ির যন্ত্রাংশ।

দোকানে ঢুকলেই টিকটিক শব্দ শোনা যেত।

দেয়ালে ঝোলানো ঘড়ি।

টেবিলে রাখা ঘড়ি।

কাঁচের বাক্সে সাজানো পকেট ঘড়ি।

কোনোটার কাঁটা দ্রুত চলছে, কোনোটার ধীরে।

কিন্তু দোকানের একেবারে পেছনের দেওয়ালে ঝোলানো একটি বড় কাঠের ঘড়ি ছিল আলাদা।

তার কাঁটা চলত নিখুঁতভাবে।

হরনাথবাবু প্রতিদিন সকালে ঘড়িটির দিকে তাকিয়ে বলতেন,

— “তুই এখনও ঠিক সময়ে চলিস।”


নাতি রোহনের আগমন

হরনাথবাবুর নাতি রোহন শহরে পড়াশোনা করত। ছুটিতে দাদুর কাছে এলে দোকানে বসতে তার একেবারেই ভালো লাগত না।

সে মোবাইল নিয়ে ব্যস্ত থাকত।

একদিন দাদু বললেন,

— “এই ঘড়িটা একটু ধর তো।”

রোহন বিরক্ত হয়ে বলল,

— “দাদু, আমি ঘড়ি মেরামত শিখব না। এখন সবাই মোবাইলে সময় দেখে।”

হরনাথবাবু হেসে বললেন,

— “সময় দেখার যন্ত্র বদলেছে, সময় তো বদলায়নি।”

রোহন উত্তর দিল না।


পুরোনো ঘড়ির গল্প

একদিন দোকানে ক্রেতা না থাকায় হরনাথবাবু সেই বড় ঘড়িটির সামনে বসে রইলেন।

রোহন পাশে বসে মোবাইল দেখছিল।

হঠাৎ দাদু বললেন,

— “জানিস, এই ঘড়িটা তোর ঠাকুমা আমাকে দিয়েছিল।”

রোহন মাথা তুলল।

— “কখন?”

— “আমাদের বিয়ের দিন।”

হরনাথবাবু মৃদু হেসে বললেন,

— “তখন আমাদের কিছুই ছিল না। এই ঘড়িটা ছিল আমাদের প্রথম বড় জিনিস।”

রোহন ঘড়িটির দিকে তাকাল।

— “ঠাকুমা কোথায় পেলেন?”

— “তাঁর বাবার বাড়ির পুরোনো ঘড়ি ছিল। বিয়ের সময় আমাকে দিয়ে বলেছিলেন—’যতদিন ঘড়িটা চলবে, ততদিন আমাদের সংসারও চলবে।'”

রোহন চুপ করে শুনছিল।


একদিন ঘড়ি থেমে গেল

পরদিন সকালে হরনাথবাবু দোকান খুলে দেখলেন—

ঘড়িটি থেমে গেছে।

তিনি অনেক চেষ্টা করেও চালু করতে পারলেন না।

রোহন বলল,

— “দাদু, পুরোনো হয়েছে। নতুন একটা কিনে নাও।”

হরনাথবাবু মাথা নাড়লেন।

— “সব পুরোনো জিনিস ফেলে দিতে নেই। কিছু জিনিসের ভেতরে সময় জমে থাকে।”

তিনি ঘড়িটিকে খুলে ফেললেন।

একটির পর একটি যন্ত্রাংশ পরীক্ষা করতে লাগলেন।

কিন্তু সমস্যাটি সহজ ছিল না।

মূল যন্ত্রের একটি ছোট অংশ ভেঙে গেছে।

সেই যন্ত্রাংশ বাজারে পাওয়া যায় না।


শেষ চেষ্টা

হরনাথবাবু বললেন,

— “এটা হয়তো আর ঠিক হবে না।”

রোহন প্রথমবার দাদুর মুখে এমন হতাশা দেখল।

সে ঘড়িটির দিকে তাকিয়ে বলল,

— “আমি চেষ্টা করব।”

দাদু অবাক।

— “তুই?”

— “হ্যাঁ। আমাকে শেখাও।”

সেদিন থেকে রোহনের মোবাইলের ব্যবহার কমে গেল।

দাদুর পাশে বসে সে ছোট ছোট যন্ত্রাংশ চিনতে শুরু করল।

স্ক্রু খোলা।

গিয়ার পরিষ্কার করা।

স্প্রিং ঠিক করা।

তেল দেওয়া।

সবকিছু শিখতে লাগল।


অপ্রত্যাশিত আবিষ্কার

একদিন রোহন পুরোনো যন্ত্রাংশের বাক্স ঘাঁটতে ঘাঁটতে একটি ছোট ধাতব অংশ পেল।

সে দাদুকে দেখাল।

হরনাথবাবু চোখের চশমা ঠিক করে বললেন,

— “এটা তো ঠিক সেই অংশের মতো!”

কিন্তু মাপ পুরোপুরি মিলছিল না।

রোহন বলল,

— “আমরা কি এটাকে একটু পরিবর্তন করতে পারি?”

দাদু বললেন,

— “পারিস, তবে খুব সাবধানে।”

দুজন মিলে কাজ শুরু করলেন।

এক ঘণ্টা।

দুই ঘণ্টা।

তিন ঘণ্টা।

অবশেষে অংশটি বসানো হলো।

হরনাথবাবু ঘড়ির কাঁটা ঠিক করলেন।

তারপর পেছনের দিকের চাবি ঘোরালেন।

সবাই চুপ।

এক সেকেন্ড।

দুই সেকেন্ড।

তারপর—

টিক।

আরেকটি—

টিক।

ঘড়ি আবার চলতে শুরু করল।

রোহন আনন্দে চিৎকার করে উঠল,

— “দাদু! চলছে!”

হরনাথবাবুর চোখে জল এসে গেল।

তিনি বললেন,

— “বলেছিলাম না, সব পুরোনো জিনিস ফেলে দিতে নেই।”


সময়ের নতুন পাঠ

এরপর রোহনের জীবন বদলে গেল।

সে বুঝতে পারল, যন্ত্রের ভেতরের ছোট ছোট অংশের মতো মানুষের জীবনেও প্রতিটি মানুষের একটা ভূমিকা আছে।

কেউ বড়।

কেউ ছোট।

কেউ সামনে।

কেউ আড়ালে।

কিন্তু একজনকে সরিয়ে দিলে পুরো ব্যবস্থা থেমে যেতে পারে।

রোহন স্কুলে ফিরে গিয়ে বিজ্ঞান প্রদর্শনীতে একটি পুরোনো ঘড়ির মডেল তৈরি করল।

তার প্রকল্পের নাম দিল—

“সময়কে বোঝা”।

প্রকল্পটি পুরস্কার পেল।

কিন্তু রোহন পুরস্কার নিয়ে প্রথমেই দাদুর কাছে গেল।

— “এটা তোমার জন্য।”

হরনাথবাবু বললেন,

— “আমার জন্য কেন?”

— “কারণ তুমি আমাকে ঘড়ি নয়, সময়ের মূল্য শিখিয়েছ।”


একটি নতুন দোকান

কয়েক বছর পরে হরনাথবাবুর চোখ দুর্বল হয়ে গেল।

দোকানে আগের মতো বসতে পারতেন না।

রোহন তখন পড়াশোনা শেষ করে ফিরে এল।

সে দাদুর দোকানটি নতুন করে সাজাল।

নাম বদলাল না।

“সময়ের সঙ্গী” নামটিই রয়ে গেল।

তবে দোকানের এক পাশে আধুনিক ঘড়ি, স্মার্টওয়াচ ও ইলেকট্রনিক ঘড়ির মেরামতির ব্যবস্থা হলো।

অন্য পাশে রইল পুরোনো যান্ত্রিক ঘড়ি।

দেয়ালের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় রাখা হলো সেই কাঠের ঘড়িটি।


দাদুর শেষ দিন

এক শীতের সকালে হরনাথবাবু দোকানের চেয়ারে বসে ছিলেন।

রোহন ঘড়ির কাঁটা পরীক্ষা করছিল।

দাদু বললেন,

— “রোহন।”

— “হ্যাঁ?”

— “ঘড়িটা ঠিকমতো চলছে তো?”

— “একদম।”

— “তাহলে ভালো।”

কিছুক্ষণ পর তিনি চোখ বন্ধ করলেন।

রোহন ভেবেছিল দাদু হয়তো ঘুমিয়ে পড়েছেন।

কিন্তু তিনি আর জাগলেন না।

দোকানের সব ঘড়ি চলছিল।

কেবল একজন মানুষ থেমে গেলেন।


সেদিন সন্ধ্যায় রোহন দোকানের আলো বন্ধ করার আগে সেই কাঠের ঘড়িটির দিকে তাকাল।

কাঁটা ঠিক সময় দেখাচ্ছে।

টিক।

টিক।

টিক।

রোহনের মনে হলো, দাদু যেন এখনও পাশে বসে আছেন।

বলছেন—

“সময়কে ধরে রাখা যায় না। কিন্তু সময়ের মধ্যে মানুষ যে ভালোবাসা রেখে যায়, সেটা থেকে যায়।”


শেষ নয়

বহু বছর পরে “সময়ের সঙ্গী” দোকানটি এলাকার পরিচিত একটি ঘড়ি-সংগ্রহশালায় পরিণত হলো।

রোহন সেখানে পুরোনো ঘড়ির পাশাপাশি তাদের গল্পও লিখে রাখত।

কোন ঘড়ি কার বিয়ের স্মৃতি।

কোন ঘড়ি কোনো পরিবারের উত্তরাধিকার।

কোন ঘড়ি কোনো মানুষের শেষ উপহার।

আর দোকানের সবচেয়ে বড় ঘড়িটির নিচে লেখা ছিল—

“এই ঘড়িটি একদিন থেমে গিয়েছিল। একজন মানুষ বিশ্বাস করেননি যে তার গল্প শেষ হয়ে গেছে। তাই তিনি আবার তাকে চালু করেছিলেন।”

তার নিচে আরও একটি লাইন—

“সময় থামে না। কিন্তু ভালোবাসা সময়কে স্মৃতি বানিয়ে রেখে যায়।”

রোহন প্রতিদিন দোকান খোলার সময় ঘড়িটির দিকে তাকায়।

তারপর চাবি ঘুরিয়ে দোকানের পুরোনো ঘড়িগুলো চালু করে।

চারপাশে একসঙ্গে শত শত টিকটিক শব্দ ছড়িয়ে পড়ে।

আর সেই শব্দের মধ্যে যেন সে শুনতে পায়—

দাদুর কণ্ঠ।

— “সময়কে সম্মান করিস। কারণ সময় চলে গেলে তাকে আর মেরামত করা যায় না।”

রোহন মৃদু হাসে।

তারপর দোকানের দরজা খুলে দেয়।

নতুন দিনের সময় শুরু হয়।

সমাপ্ত। ⏰❤️

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *