যে বইটি গ্রামের আলো বদলে দিয়েছিল।

শালবনের পাশে ছোট্ট একটি গ্রাম—নাম তার চাঁদপুর। গ্রামটি খুব বড় নয়। মাটির রাস্তা, দু’পাশে ধানখেত, কয়েকটি পুকুর, পুরোনো একটি বটগাছ আর মাঝখানে টিনের ছাউনি দেওয়া একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়—এই নিয়েই চাঁদপুর।

গ্রামের অধিকাংশ মানুষ কৃষিকাজ করেন। কেউ মাঠে কাজ করেন, কেউ দিনমজুরি করেন, কেউ আবার দূরের শহরে গিয়ে কাজ করেন। সন্ধ্যা নামলেই গ্রামের বেশিরভাগ বাড়িতে কেরোসিনের আলো জ্বলে উঠত। বিদ্যুৎ ছিল, কিন্তু লোডশেডিংও ছিল নিত্যসঙ্গী।

এই গ্রামেই থাকত বারো বছরের একটি ছেলে—অর্ণব

অর্ণবের বাবা ছিলেন ভ্যানচালক। মা অন্যের বাড়িতে কাজ করতেন। সংসারে অভাব ছিল, কিন্তু অর্ণবের একটা জিনিসের অভাব ছিল না—স্বপ্নের

ছোটবেলা থেকেই বই পড়তে অর্ণবের খুব ভালো লাগত।

কিন্তু গ্রামের স্কুলে বই বলতে পাঠ্যবইয়ের বাইরে বিশেষ কিছু ছিল না।

একদিন স্কুলে নতুন শিক্ষক এলেন। নাম অরুণবাবু

প্রথম দিনেই তিনি ক্লাসে এসে জিজ্ঞেস করলেন,

—“তোমাদের মধ্যে কে কে বই পড়তে ভালোবাসো?”

অনেকেই চুপ করে রইল।

অর্ণব হাত তুলল।

শিক্ষক মুচকি হেসে বললেন,

—“কী বই পড়ো?”

অর্ণব মাথা নিচু করে বলল,

—“যে বই পাই, স্যার।”

—“বাড়িতে বই আছে?”

—“পাঠ্যবই আছে। আর একটা পুরোনো গল্পের বই আছে। সেটাও অর্ধেক ছেঁড়া।”

অরুণবাবু কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন।

তারপর বললেন,

—“একদিন তোমার জন্য অনেক বই নিয়ে আসব।”

অর্ণবের চোখ চকচক করে উঠল।

একটি বাক্সের আগমন

প্রায় এক মাস পর এক সকালে অরুণবাবু স্কুলে এলেন একটি বড় কাঠের বাক্স নিয়ে।

বাক্সটি দেখে ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে কৌতূহল তৈরি হল।

অর্ণব ছুটে এসে জিজ্ঞেস করল,

—“স্যার, বাক্সে কী আছে?”

শিক্ষক হাসলেন।

—“তুমি খুলে দেখো।”

বাক্স খুলতেই অর্ণব অবাক।

ভেতরে সারি সারি বই।

গল্প, কবিতা, বিজ্ঞান, জীবনী, ইতিহাস, ভূগোল—কত কী!

অর্ণব যেন গুপ্তধনের সন্ধান পেয়েছে।

সে একটা বই হাতে নিয়ে বলল,

—“স্যার, এগুলো কি আমরা পড়তে পারব?”

—“অবশ্যই।”

—“বাড়িতে নিয়ে যেতে পারব?”

—“পারবে। তবে একটা শর্ত।”

—“কী শর্ত?”

—“বই নিয়ে যাওয়ার পর পড়বে, আর ফেরত দেবে।”

অর্ণব হেসে বলল,

—“আমি বই ফেরত দেব। কিন্তু বইটা যদি খুব ভালো লাগে?”

অরুণবাবু হেসে বললেন,

—“তাহলে আবার নিয়ে যাবে।”

সেদিন থেকে স্কুলে শুরু হল ছোট্ট একটি বইঘর

কোনও আলাদা ঘর ছিল না। স্কুলের একটি পুরোনো শ্রেণিকক্ষের কোণে কাঠের তাক বানিয়ে বইগুলো রাখা হল।

অর্ণব প্রতিদিন স্কুল ছুটির পর সেখানে বসে থাকত।

একদিন সে বিজ্ঞানবিষয়ক একটি বই পড়ছিল।

সেখানে লেখা ছিল—পৃথিবীর বহু মানুষ এমন জায়গায় থেকেও নতুন কিছু আবিষ্কার করেছেন, যেখানে তাঁদের কাছে সুযোগ-সুবিধা খুব কম ছিল।

অর্ণব বই বন্ধ করে অনেকক্ষণ ভাবল।

তার মনে হল,

“আমাদের গ্রামে কি কিছু করা যায় না?”

অন্ধকারের সমস্যা

চাঁদপুরের একটা বড় সমস্যা ছিল রাতের আলো।

বিদ্যুৎ প্রায়ই চলে যেত। পড়াশোনা করতে গিয়ে গ্রামের ছাত্রছাত্রীদের অনেক কষ্ট হত।

একদিন সন্ধ্যায় অর্ণব পড়তে বসেছিল। হঠাৎ বিদ্যুৎ চলে গেল।

মা বললেন,

—“আজ আর পড়িস না। চোখ নষ্ট হয়ে যাবে।”

অর্ণব বলল,

—“কিন্তু কাল পরীক্ষা।”

মা একটা কেরোসিনের বাতি জ্বালিয়ে দিলেন।

অর্ণব বই খুলল।

বাতির আলো খুব কম। কিছুক্ষণ পর চোখ ব্যথা করতে লাগল।

সেই রাতেই তার মাথায় একটা চিন্তা এল।

পরদিন সে অরুণবাবুকে বলল,

—“স্যার, সূর্যের আলো দিয়ে কি রাতে আলো জ্বালানো যায়?”

শিক্ষক অবাক হয়ে তাকালেন।

—“কেন এমন কথা বলছ?”

অর্ণব তার সমস্যার কথা বলল।

অরুণবাবু বললেন,

—“সূর্যের আলো সরাসরি রাতে ব্যবহার করা যায় না, কিন্তু দিনের আলো থেকে শক্তি সংগ্রহ করে রাতে আলো জ্বালানো যায়।”

অর্ণবের চোখ বড় হয়ে গেল।

—“কীভাবে?”

শিক্ষক সৌরশক্তির কথা বুঝিয়ে বললেন।

সেদিন অর্ণব লাইব্রেরির বিজ্ঞান বই থেকে আরও পড়ল।

সে বুঝল—সৌর প্যানেল সূর্যের আলো থেকে বিদ্যুৎ তৈরি করতে পারে। সেই বিদ্যুৎ ব্যাটারিতে জমিয়ে রাতে ব্যবহার করা যায়।

অর্ণবের মাথায় তখন নতুন স্বপ্ন।

ছোট্ট পরীক্ষা

অর্ণবের কাছে টাকা ছিল না।

কিন্তু সে হাল ছাড়ল না।

পুরোনো টর্চের ব্যাটারি, নষ্ট খেলনা, কয়েকটি তার—যা পেয়েছে সংগ্রহ করতে লাগল।

তার বন্ধু রাহুল বলল,

—“তুই কী করছিস?”

অর্ণব বলল,

—“আলো বানাব।”

রাহুল হেসে বলল,

—“তুই পাগল!”

অর্ণবও হেসে বলল,

—“হতে পারে।”

অরুণবাবু অবশ্য তাকে উৎসাহ দিলেন।

তিনি বললেন,

—“ভুল হলে সমস্যা নেই। চেষ্টা না করাটাই বড় ভুল।”

অনেকবার পরীক্ষা ব্যর্থ হল।

কখনও আলো জ্বলল না।

কখনও তার ছিঁড়ে গেল।

কখনও ব্যাটারি কাজ করল না।

একদিন অর্ণব রাগ করে সবকিছু ছুড়ে ফেলতে যাচ্ছিল।

অরুণবাবু এসে বললেন,

—“বিজ্ঞান কখনও প্রথম চেষ্টায় সব উত্তর দেয় না। আবার চেষ্টা করো।”

অর্ণব আবার শুরু করল।

আলো জ্বলে উঠল

প্রায় তিন সপ্তাহের চেষ্টার পর এক সন্ধ্যায় অর্ণবের তৈরি ছোট্ট আলোটি জ্বলে উঠল।

খুব উজ্জ্বল নয়।

কিন্তু অন্ধকার ঘরের মধ্যে সেই ছোট্ট আলো যেন সূর্যের মতো মনে হল।

অর্ণব আনন্দে চিৎকার করে উঠল,

—“স্যার! জ্বলেছে!”

অরুণবাবু ছুটে এলেন।

তিনি আলোটির দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে বললেন,

—“দেখলে? একটা বই থেকে শুরু করে তুমি এখানে পৌঁছে গেছ।”

অর্ণব বলল,

—“স্যার, শুধু আমার ঘরে আলো জ্বললে হবে না। গ্রামের সব ছেলেমেয়ের পড়ার জন্য আলো দরকার।”

শিক্ষক তার কাঁধে হাত রেখে বললেন,

—“তাহলে কাজটা আরও বড় করে ভাবো।”

গ্রামের পরিবর্তন

অরুণবাবু বিষয়টি গ্রামের কয়েকজন মানুষের কাছে বললেন।

প্রথমে কেউ বিশ্বাস করতে চাইল না।

কেউ বলল,

—“ছোট ছেলে, এসব কী করবে?”

কেউ বলল,

—“এসব দিয়ে গ্রামের সমস্যা মিটবে না।”

কিন্তু অরুণবাবু অর্ণবের তৈরি মডেলটি দেখালেন।

তারপর গ্রামের কয়েকজন যুবক এগিয়ে এলেন।

তারা নিজেদের মধ্যে টাকা তুলে স্কুলের বইঘরের ছাদে একটি ছোট সৌর প্যানেল বসালেন।

ব্যাটারি লাগানো হল।

রাতে বইঘরে আলো জ্বলল।

তারপর গ্রামের আরও কয়েকটি জায়গায় সৌর আলো বসানোর উদ্যোগ নেওয়া হল।

সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয়—যে শিশুরা আগে সন্ধ্যার পর পড়তে পারত না, তারা এখন বইঘরে এসে পড়তে শুরু করল।

অর্ণব প্রতিদিন বইঘরে বসত।

একদিন এক ছোট্ট মেয়ে এসে তাকে বলল,

—“দাদা, আমি বড় হয়ে ডাক্তার হব।”

অর্ণব হেসে বলল,

—“হবি। আগে বইটা পড়।”

মেয়েটি বই নিয়ে বসে পড়ল।

বইয়ের আসল শক্তি

কয়েক বছর পর চাঁদপুরের সেই ছোট্ট বইঘরটি আর ছোট রইল না।

গ্রামের মানুষ বই দান করতে শুরু করলেন।

শহরে থাকা গ্রামের ছেলেমেয়েরাও বই পাঠাতে লাগল।

একসময় সেখানে কয়েকশো বই জমল।

অর্ণব তখন মাধ্যমিকের ছাত্র।

একদিন অরুণবাবু তাকে জিজ্ঞেস করলেন,

—“তুমি জানো, তোমার সবচেয়ে বড় আবিষ্কার কী?”

অর্ণব বলল,

—“সৌর আলো?”

অরুণবাবু মাথা নাড়লেন।

—“না।”

—“তাহলে?”

শিক্ষক বইয়ের তাকের দিকে তাকিয়ে বললেন,

—“একটা বইয়ের ভেতর থেকে তুমি যে স্বপ্নটা বের করে এনেছ, সেটাই তোমার সবচেয়ে বড় আবিষ্কার।

অর্ণব চুপ করে রইল।

সে বুঝতে পারল, আলো শুধু বিদ্যুতের নয়।

কখনও কখনও একটি বইও মানুষের জীবনে আলো জ্বালাতে পারে।

একটি বই একজন শিশুর চিন্তা বদলে দিতে পারে।

একটি চিন্তা একটি পরিবারকে বদলে দিতে পারে।

আর একজন মানুষ চাইলে একটি পুরো গ্রামের ভবিষ্যৎ বদলানোর শুরু করতে পারে।

বহু বছর পরে অর্ণব বড় হয়ে একজন প্রকৌশলী হল।

কিন্তু নিজের গ্রামের সেই বইঘরটি সে কখনও ভুলল না।

প্রতি বছর সে চাঁদপুরে ফিরে আসত।

নতুন বই নিয়ে আসত।

আর বইঘরের দরজায় দাঁড়িয়ে ছোটদের বলত—

“তোমাদের হাতে যদি একটা ভালো বই থাকে, তাহলে মনে রেখো—তোমাদের সামনে এখনও অনেকগুলো দরজা খোলা আছে।”

চাঁদপুরের মানুষ আজও সেই কথাটি মনে রেখেছেন।

আর গ্রামের ছোট্ট বইঘরের নাম দিয়েছেন—

“আলোর ঘর”।

কারণ সেই ঘরে শুধু বই রাখা হয় না।

সেখানে রাখা হয় স্বপ্ন

সেখানে জ্বলে জ্ঞান

আর সেই জ্ঞান থেকেই জন্ম নেয় নতুন আলো।

সমাপ্ত।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *