ঘড়ির কাঁটা যেখানে থেমে যায়।

রাত তখন ২টা ১৭ মিনিট।

অভীক হঠাৎ ঘুম ভেঙে উঠে বসল। ঘরের মধ্যে অদ্ভুত একটা শব্দ হচ্ছিল।

টিক… টিক… টিক…

তার চোখ গেল দেওয়ালের পুরোনো ঘড়িটার দিকে।

ঘড়িটি পাঁচ বছর ধরে নষ্ট।

কিন্তু আজ সেটি চলছে।

অভীক বিছানা থেকে উঠে ঘড়িটির সামনে গেল।

কাঁটা এগিয়ে এসে ঠিক ২টা ১৭ মিনিটে থেমে গেল।

তারপর ঘরের আলো নিভে গেল।

অন্ধকারের মধ্যে সে স্পষ্ট শুনতে পেল—

“অভীক… দরজাটা খোলো।”

কণ্ঠটি তার বাবার।

অভীক জমে গেল।

তার বাবা মারা গেছেন আট বছর আগে।

আবার সেই কণ্ঠ—

“অভীক, আমি বাইরে আছি।”

অভীক দরজার কাছে গিয়ে দাঁড়াল। হাত বাড়িয়েও দরজা খুলল না।

কারণ বাবার মৃত্যুর আগের রাতে বাবা তাকে একটি কথা বলেছিলেন—

“আমি যদি কখনও ফিরে আসি, দরজা খুলবি না।”

তখন অভীক কথাটার অর্থ বুঝতে পারেনি।

আজ বুঝতে পারছে।

সে পিছিয়ে এল।

কিছুক্ষণ পর দরজায় তিনবার শব্দ হলো।

ঠক।

ঠক।

ঠক।

তারপর নিস্তব্ধতা।

অভীক সাহস করে জানালার কাছে গেল। বাইরে তাকিয়ে দেখল, বাড়ির সামনের রাস্তায় একজন মানুষ দাঁড়িয়ে আছে।

অন্ধকারেও মুখটি চিনতে তার ভুল হলো না।

তার বাবা।

অভীক ভয়ে জানালা থেকে সরে এল।

সকাল হলে সে প্রথমেই গ্রামের বৃদ্ধ শিক্ষক নীলমাধববাবুর কাছে গেল। বাবার মৃত্যুর কথা উঠতেই বৃদ্ধ দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।

“তোমার বাবা কি তোমাকে সেই ঘড়িটার কথা বলেছিল?”

অভীক অবাক হয়ে বলল,

“কোন ঘড়ি?”

“যেটা তোমার বাড়ির দেওয়ালে আছে।”

“আপনি জানেন?”

“জানি। কারণ ঘড়িটা তোমার বাবা কিনেছিলেন আমার কাছ থেকেই।”

অভীক সব ঘটনা বলল।

নীলমাধববাবু কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন,

“তোমার বাবা মৃত্যুর কয়েক দিন আগে আমার কাছে এসেছিলেন। বলেছিলেন, ঘড়িটা যখন আবার চলবে, তখন বুঝতে হবে পুরোনো রহস্য ফিরে এসেছে।”

“কী রহস্য?”

বৃদ্ধ উত্তর দিলেন না।

শুধু একটি পুরোনো চাবি তার হাতে দিলেন।

“তোমার বাড়ির পেছনে যে ঘরটা তালাবন্ধ, সেটা খুলে দেখো।”

অভীক বাড়ি ফিরে চাবিটি নিয়ে পেছনের ঘরের দরজায় গেল।

দরজা খুলতেই ধুলো আর পুরোনো কাগজের গন্ধ বেরিয়ে এল।

ঘরের মধ্যে একটি কাঠের আলমারি।

আলমারি খুলে সে পেল পুরোনো ডায়েরি।

ডায়েরিটি তার বাবার।

প্রথম কয়েকটি পাতা সাধারণ। তারপর এক জায়গায় লেখা—

“আমি আজ এমন একটি সত্য জানতে পেরেছি, যা জানার পর থেকে নিজের জীবনকেই বিশ্বাস করতে পারছি না।”

পরের পাতায়—

“ঘড়ির কাঁটা ২টা ১৭ মিনিটে থামলে বাড়ির বাইরে যে মানুষটিকে দেখা যায়, সে জীবিত মানুষ নয়।”

অভীকের বুক কেঁপে উঠল।

আরও পড়ল।

“কিন্তু সবচেয়ে ভয়ঙ্কর বিষয় হলো, সে আমার মৃত্যুর আগে থেকেই আমাকে ডাকছে।”

অভীক ডায়েরি বন্ধ করে দিল।

ঠিক তখনই পিছন থেকে একটা শব্দ।

“অভীক।”

সে ঘুরে দাঁড়াল।

কেউ নেই।

তারপর ঘরের কোণে রাখা একটি পুরোনো টেপ রেকর্ডার নিজে থেকেই চালু হয়ে গেল।

বাবার কণ্ঠ—

“অভীক, যদি তুমি এই রেকর্ডিং শুনে থাকো, তাহলে আমি আর বেঁচে নেই।”

অভীক নিঃশ্বাস বন্ধ করে শুনতে লাগল।

“তোমার মায়ের মৃত্যুর পর আমি এই বাড়িতে কিছু অস্বাভাবিক ঘটনা লক্ষ্য করেছিলাম। কিন্তু পরে বুঝলাম, বিষয়টি শুধু তোমার মাকে নিয়ে নয়।”

কণ্ঠটি থেমে গেল।

কয়েক সেকেন্ড পর আবার শোনা গেল—

“আমার নিজের মৃত্যুও স্বাভাবিক ছিল না।”

অভীক স্তব্ধ।

ঠিক তখনই দেওয়ালের ঘড়িটি আবার চলতে শুরু করল।

টিক… টিক… টিক…

কাঁটা এগিয়ে ২টা ১৭ মিনিটে থামল।

দরজার বাইরে বাবার কণ্ঠ—

“অভীক, এবার দরজা খোলো।”

অভীক চিৎকার করে বলল,

“আপনি কে?”

বাইর থেকে উত্তর এল—

“আমি তোর বাবা।”

“প্রমাণ দিন!”

কিছুক্ষণ নীরবতা।

তারপর দরজার নিচ দিয়ে একটি পুরোনো ছবি ধীরে ধীরে ভেতরে ঢুকে এল।

অভীক ছবিটি তুলে দেখল।

ছবিতে তার বাবা দাঁড়িয়ে আছেন।

তার পাশে আরেকজন মানুষ।

লোকটির মুখ দেখে অভীকের শরীর ঠান্ডা হয়ে গেল।

লোকটি দেখতে অবিকল তার বাবার মতো।

শুধু চোখ দুটি সম্পূর্ণ কালো।

দরজার ওপাশ থেকে ফিসফিস করে কণ্ঠ এল—

“এবার বুঝতে পারছিস?”

অভীক পিছিয়ে গেল।

হঠাৎ ঘড়িটি মেঝেতে পড়ে ভেঙে গেল।

ঘরের বাতাস স্বাভাবিক হয়ে গেল।

দরজার বাইরে আর কোনো শব্দ নেই।

পরদিন সকালে নীলমাধববাবু বাড়িতে এসে অভীককে বললেন,

“তোমার বাবা শেষ পর্যন্ত ঘড়িটা নষ্ট করে যেতে পারেননি।”

“কেন?”

“কারণ ঘড়িটা আসলে সময় দেখায় না।”

“তাহলে?”

বৃদ্ধ ধীরে ধীরে বললেন,

“ওটা দেখায়—কখন অতীত তোমার কাছে ফিরে আসবে।”

অভীক কিছু বলল না।

সে ঘড়িটির ভাঙা অংশগুলোর দিকে তাকিয়ে রইল।

তারপর হঠাৎ লক্ষ্য করল—

ঘড়ির পেছনে ছোট্ট একটি কাগজ আটকে আছে।

তাতে বাবার হাতের লেখা—

“অভীক, যদি কখনও ২টা ১৭ মিনিটে ঘড়ি থেমে যায়, মনে রাখিস—যে দরজায় সে কড়া নাড়ে, সেটা কখনও খুলবি না। কারণ বাইরে যে দাঁড়িয়ে থাকে, সে কখনও তোর বাবা নয়।”

অভীক জানালার দিকে তাকাল।

দূরে রাস্তার ধারে একজন মানুষ দাঁড়িয়ে।

তার মুখ দেখা যাচ্ছে না।

কিন্তু তার হাতে একটি পুরোনো ঘড়ি।

ঘড়ির কাঁটা—

২টা ১৭ মিনিটে থেমে আছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *