নীল খামের চিঠি।
রুদ্র শহরের একটি পুরোনো ডাকঘরে কাজ করত। প্রতিদিন অসংখ্য চিঠি তার হাতে আসত। কেউ চাকরির খবর পেত, কেউ দূরের প্রিয়জনের লেখা পড়ে চোখ মুছত, আবার কোনো চিঠিতে থাকত বিচ্ছেদের কথা।
কিন্তু একটি চিঠি রুদ্রকে অদ্ভুতভাবে ভাবিয়ে তুলেছিল।
খামটি ছিল নীল রঙের।
প্রাপকের নাম লেখা—“রুদ্র সেন”।
ঠিকানা তার নিজের বাড়ির।
চিঠিটি হাতে নিয়ে রুদ্র অবাক হয়ে গেল। কারণ ডাকঘরের সিলমোহরে তারিখ লেখা ছিল—১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬।
আজ ১৬ সেপ্টেম্বর।
অর্থাৎ চিঠিটি আগামীকালের তারিখে পাঠানো হয়েছে।
রুদ্র সহকর্মীকে দেখাল। সবাই হেসে বলল, “কেউ মজা করেছে।”
রুদ্র চিঠিটি বাড়িতে নিয়ে গেল।
রাতে খাম খুলে সে দেখল মাত্র কয়েকটি লাইন লেখা—
“রুদ্র,
আগামীকাল সকাল ৯টা ১৫ মিনিটে তুমি স্টেশন রোডের পুরোনো বইয়ের দোকানে যাবে। সেখানে লাল মলাটের একটি বই তোমার জন্য অপেক্ষা করবে।
বইটি খুলবে না।
শুধু দোকানদারকে জিজ্ঞেস করবে—‘আপনি কি এখনও আমাকে চিনতে পারেন?’
তারপর যা বলবে, সেটাই তোমার জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উত্তর হবে।
—তুমি নিজেই”
রুদ্র অনেকক্ষণ চিঠিটির দিকে তাকিয়ে রইল।
“তুমি নিজেই”—এই কথার অর্থ কী?
পরদিন সকাল ৯টা বাজতেই কৌতূহল তাকে স্টেশন রোডে নিয়ে গেল।
৯টা ১৫ মিনিটে সে পুরোনো বইয়ের দোকানের সামনে দাঁড়াল।
দোকানটি প্রায় অর্ধেক বন্ধ। ভেতরে একজন বৃদ্ধ বসে বই পড়ছিলেন।
রুদ্র ঢুকে বলল,
“আপনি কি এখনও আমাকে চিনতে পারেন?”
বৃদ্ধ ধীরে ধীরে মুখ তুললেন।
তারপর যেন বহু বছরের পুরোনো কাউকে দেখেছেন—এমনভাবে তাকিয়ে রইলেন।
“তুমি তাহলে ফিরে এসেছ?”
রুদ্রের শরীর শিউরে উঠল।
“আপনি আমাকে আগে দেখেছেন?”
বৃদ্ধ কোনো উত্তর না দিয়ে তাকের ওপর থেকে একটি লাল মলাটের বই নামিয়ে আনলেন।
“এটা তোমার।”
রুদ্র বইটি নিতে গিয়ে থেমে গেল।
চিঠির কথা মনে পড়ল।
“আমি বইটা খুলব না।”
বৃদ্ধ মৃদু হাসলেন।
“আজ খুলবে না। কিন্তু একদিন তোমাকেই খুলতে হবে।”
রুদ্র বইটি হাতে নিয়ে বাড়ি ফিরল।
সারাদিন বইটি তার টেবিলের ওপর পড়ে রইল।
রাতে সে আর নিজেকে আটকাতে পারল না।
বইটি খুলতেই প্রথম পাতায় লেখা—
“রুদ্র সেন, বয়স ১২ বছর।”
তারপরের পাতায় ছিল তার শৈশবের নানা ঘটনা।
কোন স্কুলে পড়ত, কার সঙ্গে বন্ধুত্ব ছিল, প্রথম পুরস্কার পাওয়ার দিন—সবকিছু।
রুদ্র হতবাক।
আরও কয়েক পাতা উল্টাতেই তার চোখ আটকে গেল একটি ছবিতে।
ছবিতে সে নিজে।
তার পাশে দাঁড়িয়ে আছে আরেকটি ছেলে।
রুদ্র ছেলেটিকে চিনতে পারল না।
ছবির নিচে লেখা—
“রুদ্র ও অর্ণব—দুই ভাই।”
রুদ্রের মাথা ঘুরে গেল।
তার তো কোনো ভাই ছিল না।
সে মাকে ফোন করল।
“মা, অর্ণব কে?”
ওপাশে দীর্ঘ নীরবতা।
তারপর মায়ের কাঁপা গলা—
“এই নামটা তুমি কোথায় শুনলে?”
“বইয়ে।”
মা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন,
“তোমার একটা ভাই ছিল।”
রুদ্র যেন জমে গেল।
“ছিল মানে?”
“অর্ণব তোমার থেকে দুই বছরের বড় ছিল। যখন তুমি দশ বছরের, তখন একটা দুর্ঘটনায় সে মারা যায়।”
রুদ্রের বুক ভার হয়ে এল।
“কিন্তু আমি তো কিছুই মনে করতে পারি না।”
মা কাঁদতে কাঁদতে বললেন,
“দুর্ঘটনার পর তুমি কয়েক মাস কথা বলতে না। ডাক্তার বলেছিলেন, সেই সময়ের স্মৃতি তোমার মস্তিষ্ক নিজেই মুছে দিয়েছে।”
রুদ্র বইটির দিকে তাকাল।
শেষ পাতায় মাত্র একটি বাক্য লেখা ছিল—
“তুমি আমাকে ভুলে গিয়েছিলে, কিন্তু আমি তোমাকে ভুলিনি।”
তার নিচে একটি তারিখ।
১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬।
পরদিন সকালে রুদ্র আবার বইয়ের দোকানে গেল।
কিন্তু দোকানটি বন্ধ।
পাশের চায়ের দোকানের লোককে জিজ্ঞেস করতেই সে বলল,
“ওই দোকান? আরে, সেটা তো পাঁচ বছর ধরে বন্ধ!”
রুদ্র হতভম্ব।
“কিন্তু কাল তো একজন বৃদ্ধ ছিলেন!”
লোকটি মাথা নাড়ল।
“দোকানের মালিক হরিপদবাবু মারা গেছেন পাঁচ বছর আগে।”
রুদ্রের হাতে ধরা লাল বইটি কাঁপতে লাগল।
বাড়ি ফিরে সে বইটি আবার খুলল।
এবার শেষ পাতার লেখাটি বদলে গেছে।
নতুন করে লেখা—
“এবার আমাকে মনে পড়ছে, দাদা?”
রুদ্র চোখ বন্ধ করল।
হঠাৎ তার মনে পড়ে গেল—
একটি নদী।
একটি ভাঙা সেতু।
তার হাত শক্ত করে ধরে থাকা একটি ছোট্ট ছেলে।
আর অর্ণবের শেষ কথা—
“ভয় পাস না রুদ্র, আমি তোকে ছেড়ে যাব না।”
রুদ্রের চোখ বেয়ে জল নেমে এল।
পনেরো বছর ধরে সে তার ভাইকে ভুলে ছিল।
সেদিন রাতে রুদ্র লাল বইটি বুকের কাছে নিয়ে ফিসফিস করে বলল,
“অর্ণব, এবার আর তোকে ভুলব না।”
জানালার বাইরে তখন হালকা বাতাস বইছিল।
টেবিলের ওপর রাখা নীল খামটি হঠাৎ নিজে থেকেই খুলে গেল।
ভেতরে নতুন একটি চিঠি।
মাত্র এক লাইন—
“আমিও জানতাম, তুমি একদিন আমাকে মনে করবে।”

