বৃষ্টির দিনে যে প্রতিশ্রুতি।
সেদিন কলকাতার আকাশ সকাল থেকেই কালো হয়ে ছিল। দুপুরের পর হঠাৎ ঝমঝম করে বৃষ্টি নামল।
অদিতি জানালার পাশে দাঁড়িয়ে বৃষ্টি দেখছিল। পাঁচ বছর হয়ে গেছে, তবু বৃষ্টি নামলেই তার মনে পড়ে অয়নের কথা।
অয়ন বলেছিল,
“যেদিন সবচেয়ে বেশি বৃষ্টি হবে, সেদিন আমি তোমাকে বিয়ে করতে আসব।”
কথাটা বলেছিল কলেজের শেষ বছরে।
তখন তাদের পৃথিবী ছিল খুব ছোট। কলেজ, গঙ্গার ধারে বসে গল্প, রাস্তার পাশের চা আর ভবিষ্যতের হাজার স্বপ্ন।
অয়ন চাকরি পাওয়ার জন্য অন্য শহরে চলে গেল। যাওয়ার আগে অদিতির হাত ধরে বলেছিল,
“একটু সময় দাও। নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে ফিরে আসব।”
অদিতি অপেক্ষা করেছিল।
এক বছর।
দুই বছর।
তিন বছর।
তারপর একদিন অয়নের ফোন বন্ধ হয়ে গেল।
কোনো মেসেজ নেই।
কোনো খবর নেই।
অদিতির পরিবার তাকে অনেকবার বিয়ে দিতে চেয়েছিল। সে রাজি হয়নি।
কিন্তু ধীরে ধীরে সেও বুঝেছিল, হয়তো অয়ন আর ফিরবে না।
পাঁচ বছর পর অদিতি একটি স্কুলে শিক্ষকতা করছিল। নিজের জীবন নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েছিল।
তবু বৃষ্টি এলে পুরোনো কথাগুলো ফিরে আসত।
সেদিন সন্ধ্যায় দরজায় কড়া নাড়ার শব্দ হলো।
অদিতি দরজা খুলে স্তব্ধ হয়ে গেল।
সামনে অয়ন দাঁড়িয়ে।
ভিজে জামাকাপড়। হাতে একটি পুরোনো ব্যাগ।
অদিতির মুখ দিয়ে শুধু বের হলো,
“তুমি?”
অয়ন মৃদু হেসে বলল,
“অনেক দেরি হয়ে গেল।”
অদিতি দরজা থেকে সরে দাঁড়াল।
“কেন এসেছ?”
অয়ন ঘরে ঢুকল না।
“আমি শুধু কথা বলতে এসেছি।”
“পাঁচ বছর পর?”
“হ্যাঁ।”
“একটা ফোন করতে পারোনি?”
অয়ন মাথা নিচু করল।
“পারিনি।”
“কেন?”
অয়ন কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,
“চাকরিতে যাওয়ার কয়েক মাস পর আমার বাবা মারা যান। বাড়িতে তখন শুধু মা আর ছোট বোন। ঋণের বোঝা ছিল। আমি একসঙ্গে তিনটে কাজ করতাম।”
অদিতি চুপ করে শুনছিল।
“তোমাকে ফোন করলে তুমি অপেক্ষা করবে জানতাম। কিন্তু আমি চাইনি তুমি আমার জন্য নিজের জীবন থামিয়ে রাখো।”
অদিতির চোখে জল এসে গেল।
“তাই আমাকে কিছু না জানিয়ে চলে গেলে?”
“ভেবেছিলাম, তুমি আমাকে ভুলে যাবে।”
“ভুলিনি।”
অয়ন তাকাল তার দিকে।
“জানি।”
“কীভাবে জানো?”
অয়ন ব্যাগ থেকে একটি ছোট বাক্স বের করল।
বাক্স খুলতেই অদিতি দেখল একটি পুরোনো চিঠি।
“এটা তুমি আমাকে পাঁচ বছর আগে লিখেছিলে। কিন্তু পাঠাওনি।”
অদিতি অবাক।
“এটা তোমার কাছে কীভাবে?”
“তোমার এক বান্ধবীর কাছ থেকে পেয়েছি। সে আমাকে কয়েক মাস আগে খুঁজে বের করে।”
অদিতি চিঠিটি খুলল।
ভেতরে লেখা—
“অয়ন, তুমি যদি ফিরে আসো, আমি এখনও অপেক্ষা করব।”
অদিতি ধীরে ধীরে বলল,
“এখন কেন ফিরেছ?”
অয়ন এবার হাসল।
“কারণ এবার আমার কোনো অজুহাত নেই।”
কিছুক্ষণ নীরবতা।
তারপর অদিতি বলল,
“তোমার বিয়ে হয়েছে?”
অয়ন মাথা নাড়ল।
“না।”
“কাউকে ভালোবাসো?”
“হ্যাঁ।”
অদিতির বুকটা ধক করে উঠল।
“কে?”
অয়ন বলল,
“যে মেয়েটি পাঁচ বছর আগে আমাকে বলেছিল—‘যদি সত্যিই ভালোবাসো, তবে ফিরে এসো।’”
অদিতির চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ল।
কিন্তু সে সঙ্গে সঙ্গে কোনো উত্তর দিল না।
অয়ন বলল,
“আমি জানি, পাঁচ বছর অনেক সময়। তোমার জীবন বদলে যেতে পারে। তুমি অন্য কাউকে ভালোবাসতেও পারো। তাই কোনো দাবি নিয়ে আসিনি।”
অদিতি জানালার বাইরে তাকাল।
বৃষ্টি তখনও পড়ছে।
হঠাৎ তার মনে পড়ল সেই কলেজের দিন।
একটি ছাতা।
দুজন মানুষ।
ভেজা রাস্তা।
আর অয়নের সেই প্রতিশ্রুতি—
“সবচেয়ে বেশি বৃষ্টির দিনে আমি ফিরে আসব।”
অদিতি মৃদু হেসে বলল,
“তুমি জানো আজ কী দিন?”
অয়ন অবাক হয়ে তাকাল।
“কী?”
“আজ আমাদের কলেজের শেষ দিনের ঠিক পাঁচ বছর পূর্ণ হয়েছে।”
অয়ন কিছু বলতে পারল না।
অদিতি দরজার পাশে রাখা ছাতাটি তুলে নিল।
“চলো।”
“কোথায়?”
“যেখানে আমাদের প্রথম দেখা হয়েছিল।”
দুজন বৃষ্টির মধ্যে বেরিয়ে পড়ল।
পাঁচ বছর আগের সেই রাস্তা অনেক বদলে গেছে। পুরোনো চায়ের দোকান নেই। কলেজের সামনে নতুন ভবন হয়েছে।
কিন্তু বৃষ্টি একই রকম।
অয়ন ধীরে ধীরে বলল,
“তুমি কি আমাকে ক্ষমা করেছ?”
অদিতি উত্তর দিল,
“ক্ষমা করেছি কি না জানি না।”
অয়নের মুখ মলিন হয়ে গেল।
অদিতি হাসল।
“তবে তোমার সঙ্গে আবার হাঁটতে রাজি হয়েছি।”
অয়ন থেমে গেল।
অদিতিও থামল।
তারপর অয়ন বলল,
“তাহলে এবার কি সত্যিই ফিরে এসেছি?”
অদিতি তার দিকে তাকিয়ে বলল,
“এবার আর কোথাও যেও না।”
বৃষ্টির শব্দের মধ্যে অয়ন শুধু বলল,
“কখনও না।”
সেদিন বৃষ্টি অনেকক্ষণ হয়েছিল।
আর পাঁচ বছর ধরে অপেক্ষা করা একটি প্রতিশ্রুতি অবশেষে তার ঠিকানা খুঁজে পেয়েছিল।

