যে বাড়িতে আয়না ছিল না।
শহর থেকে প্রায় চল্লিশ কিলোমিটার দূরে ছোট্ট একটি গ্রাম। গ্রামের শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়ে ছিল একটি দোতলা পুরোনো বাড়ি। বাড়িটির চারপাশে বড় বড় গাছ, আগাছায় ভরা উঠোন এবং ভাঙা পাঁচিল।
লোকজন বাড়িটিকে বলত—“আয়নাহীন বাড়ি।”
কারণ সেই বাড়িতে কোনো আয়না ছিল না।
কেন ছিল না, তা কেউ জানত না।
অরিন্দম বহু বছর পর গ্রামে ফিরে এসে জানতে পারল, বাড়িটি তার দাদুর। বাবা-মা মারা যাওয়ার পর সম্পত্তির কাগজপত্রের কাজে তাকে কয়েক দিনের জন্য সেখানে থাকতে হবে।
গ্রামের সবাই তাকে বাড়িটিতে রাত কাটাতে নিষেধ করল।
“দিনের বেলা থাকুন, কিন্তু রাতে ওই বাড়িতে থাকবেন না,” গ্রামের বৃদ্ধ হরিপদ বললেন।
অরিন্দম হেসে বলল,
“ভূতের ভয়ে?”
হরিপদ উত্তর দিলেন না।
শুধু বললেন,
“ওখানে ভূত আছে কি না জানি না। তবে রাতে নিজের মুখ দেখতে যাবেন না।”
অরিন্দম কথাটার কোনো অর্থ বুঝল না।
সেদিন সন্ধ্যায় সে বাড়িতে ঢুকল।
বাড়ির প্রতিটি ঘরেই পুরোনো আসবাব। দেওয়ালে পুরোনো ছবি। কিন্তু সত্যিই কোথাও কোনো আয়না নেই।
রাত দশটার দিকে অরিন্দম খাওয়া শেষ করে নিজের ঘরে শুয়ে পড়ল।
হঠাৎ রাত একটা নাগাদ ঘুম ভেঙে গেল।
ঘরের দরজার বাইরে যেন কারও পায়ের শব্দ।
ধীরে ধীরে…
ঠক…
ঠক…
ঠক…
অরিন্দম উঠে দরজা খুলল।
করিডোরে কেউ নেই।
কিন্তু মেঝেতে একটি ভেজা পায়ের ছাপ।
তারপর আরেকটি।
তারপর আরও একটি।
পায়ের ছাপগুলো সিঁড়ির দিকে চলে গেছে।
অরিন্দম অনুসরণ করতে লাগল।
দোতলার শেষ ঘরের সামনে এসে পায়ের ছাপগুলো থেমে গেল।
দরজা ভেতর থেকে বন্ধ।
হঠাৎ ভেতর থেকে একটি মেয়ের কণ্ঠ ভেসে এল—
“তুমি কি আমাকে দেখতে পাচ্ছ?”
অরিন্দমের শরীর ঠান্ডা হয়ে গেল।
সে কোনো উত্তর দিল না।
আবার সেই কণ্ঠ—
“একবার দরজা খোলো।”
অরিন্দম দরজার হাতলে হাত রাখল।
ঠিক তখনই নিচতলা থেকে প্রচণ্ড শব্দ হলো।
সে ছুটে নিচে নেমে এল।
ড্রয়িংরুমের পুরোনো দেওয়ালঘড়িটি মেঝেতে পড়ে গেছে।
কিন্তু ঘড়িটি চলছিল।
কাঁটা ঘুরছে উল্টো দিকে।
অরিন্দম আতঙ্কিত হয়ে পিছিয়ে গেল।
ঠিক তখনই তার চোখ পড়ল দেওয়ালের একটি ছবিতে।
ছবিতে তার দাদু, দিদা এবং আরও একজন তরুণী দাঁড়িয়ে আছে।
তরুণীটির মুখ অদ্ভুতভাবে আঁচড় দিয়ে মুছে দেওয়া।
ছবির নিচে লেখা—
“মাধবী — আমাদের মেয়ে।”
অরিন্দম স্তব্ধ।
তার তো জানা ছিল, দাদুর একমাত্র সন্তান তার বাবা।
তাহলে মাধবী কে?
পরদিন সকালে সে গ্রামের বৃদ্ধ হরিপদের কাছে গেল।
সব শুনে হরিপদ দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
“মাধবী ছিল আপনার বাবার ছোট বোন।”
“তাহলে তার কথা কেউ বলে না কেন?”
“কারণ সে মারা যাওয়ার পর থেকেই ওই বাড়িতে অদ্ভুত ঘটনা শুরু হয়।”
অরিন্দম জানতে চাইল,
“কীভাবে মারা গিয়েছিল?”
হরিপদ কিছুক্ষণ চুপ থেকে বললেন,
“সে নিজের মুখ দেখতে খুব ভালোবাসত। একদিন শহর থেকে একটি বড় আয়না এনে নিজের ঘরে লাগায়। তারপর দাবি করে, আয়নায় সে এমন একজনকে দেখতে পাচ্ছে যে তার মতো দেখতে নয়।”
“তারপর?”
“এক রাতে সে নিখোঁজ হয়ে যায়।”
অরিন্দম অবাক হয়ে বলল,
“নিখোঁজ?”
“হ্যাঁ। কিন্তু তার ঘরে আয়নাটা ভাঙা অবস্থায় পাওয়া যায়। এরপর আপনার দাদু বাড়ির সব আয়না সরিয়ে ফেলেন।”
অরিন্দমের মনে পড়ল আগের রাতের সেই কণ্ঠ।
“তুমি কি আমাকে দেখতে পাচ্ছ?”
সেদিন সন্ধ্যায় অরিন্দম বাড়িতে ফিরে সোজা দোতলার বন্ধ ঘরের সামনে গেল।
দরজা এবার খোলা।
ঘরের মাঝখানে একটি বিশাল পুরোনো কাঠের বাক্স।
বাক্স খুলতেই সে দেখতে পেল একটি কাপড়ে ঢাকা আয়না।
তার হাত কাঁপছিল।
তবু কাপড়টি সরিয়ে দিল।
আয়নায় তার নিজের মুখ দেখা গেল।
কিন্তু কয়েক সেকেন্ড পর অরিন্দম বুঝতে পারল—
আয়নার ভেতরের অরিন্দম হাসছে।
অথচ সে হাসছে না।
আয়নার মানুষটি ধীরে ধীরে হাত তুলল।
অরিন্দম পিছিয়ে গেল।
তারপর আয়নার ভেতরের মানুষটি ঠোঁট নাড়ল—
“তুমি আমাকে এতদিন কোথায় রেখেছিলে?”
অরিন্দম চিৎকার করে আয়নাটি মেঝেতে ফেলে দিল।
আয়না ভাঙল না।
বরং তার ভেতর থেকে সেই মেয়েটির মুখ ভেসে উঠল।
মাধবী।
মাধবী বলল,
“আমাকে কেউ হত্যা করেনি। আমি এই আয়নার ভেতরে আটকে গিয়েছিলাম।”
অরিন্দম কাঁপা গলায় বলল,
“আমি কীভাবে তোমাকে মুক্ত করব?”
মাধবী বলল,
“আয়নাটা ভাঙবে না। শুধু আমার ছবিটা যেখানে মুছে দেওয়া হয়েছে, সেখানে আমার নামটা আবার লিখে দাও।”
অরিন্দম নিচে নেমে পুরোনো ছবিটি খুলে নিল।
মুছে যাওয়া মুখের নিচে কলম দিয়ে লিখল—
“মাধবী—এই পরিবারের মেয়ে।”
ঠিক সেই মুহূর্তে দোতলা থেকে প্রচণ্ড শব্দ হলো।
অরিন্দম ছুটে ওপরে গেল।
আয়নাটি এবার সত্যিই ভেঙে হাজার টুকরো হয়ে পড়ে আছে।
আর ঘরের জানালা দিয়ে ভোরের আলো ঢুকছে।
সেই দিন থেকে বাড়িতে আর কোনো অদ্ভুত ঘটনা ঘটেনি।
অরিন্দম বাড়িটি সংস্কার করার সিদ্ধান্ত নিল।
তবে একটি জিনিস সে বদলায়নি।
দোতলার সেই ঘরের দেওয়ালে মাধবীর ছবিটি নতুন করে বাঁধিয়ে টাঙিয়ে দিল।
ছবির নিচে লেখা রইল—
“যাদের আমরা ভুলে যাই, তারা সবসময় হারিয়ে যায় না।”

