শেষ ট্রেনের যাত্রী।।
রাত তখন ১১টা ৪৭ মিনিট।
স্টেশনের নাম—চন্দ্রপুর।
ছোট্ট স্টেশন। দিনে এখানে বেশ ভিড় থাকে। কিন্তু রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে প্ল্যাটফর্মটা যেন ধীরে ধীরে পৃথিবী থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।
সেদিন স্টেশনে একা দাঁড়িয়ে ছিল অয়ন।
কলকাতা থেকে কাজ সেরে বাড়ি ফিরতে দেরি হয়ে গিয়েছিল। শেষ ট্রেনটা ধরতেই হবে। না হলে রাতটা স্টেশনেই কাটাতে হবে।
প্ল্যাটফর্মের ঘড়িতে ১১টা ৫২ বাজতেই দূর থেকে ট্রেনের আলো দেখা গেল।
অয়ন স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল।
ট্রেন এসে থামল।
অদ্ভুত ব্যাপার, এত বড় ট্রেন অথচ প্রায় সব কামরাই ফাঁকা।
অয়ন মাঝের একটি কামরায় উঠে জানালার পাশে বসে পড়ল।
ট্রেন ছাড়ল।
কিছুক্ষণ পর অয়নের চোখ পড়ল সামনের সিটে বসে থাকা এক মেয়ের দিকে।
মেয়েটি জানালার বাইরে তাকিয়ে ছিল।
পরনে হালকা নীল শাড়ি। খোলা চুল। হাতে একটি পুরনো বই।
অয়নের মনে হলো, মেয়েটিকে কোথাও যেন আগে দেখেছে।
কিন্তু কোথায়?
সে অনেকক্ষণ তাকিয়ে থেকেও মনে করতে পারল না।
হঠাৎ মেয়েটি বই থেকে চোখ তুলে বলল,
“আপনি কি চন্দ্রপুরেই নামবেন?”
অয়ন অবাক হয়ে বলল,
“হ্যাঁ। আপনি?”
“আমিও।”
মেয়েটি হাসল।
“আমার নাম নীলা।”
“আমি অয়ন।”
তারপর দুজনের মধ্যে আর কোনো কথা হলো না।
ট্রেন ছুটে চলল অন্ধকারের মধ্যে।
কিছুক্ষণ পর অয়ন লক্ষ্য করল, কামরায় আর কোনো যাত্রী নেই।
শুধু সে আর নীলা।
অয়ন বলল,
“আপনি এত রাতে একা যাচ্ছেন? ভয় করছে না?”
নীলা জানালার বাইরে তাকিয়েই বলল,
“সব ভয় মানুষকে নিয়ে নয়।”
অয়ন হেসে বলল,
“তাহলে?”
“কখনও কখনও স্মৃতিই বেশি ভয়ঙ্কর।”
কথাটা শুনে অয়ন চুপ করে গেল।
কিছুক্ষণ পর নীলা তাকে জিজ্ঞেস করল,
“আপনি কি কাউকে ভালোবাসেন?”
প্রশ্নটা অপ্রত্যাশিত।
অয়ন একটু হেসে বলল,
“ভালোবাসতাম।”
“এখন?”
“এখনও ভালোবাসি। শুধু সে আমার জীবনে নেই।”
নীলা এবার তার দিকে তাকাল।
“কেন?”
অয়ন জানালার বাইরে তাকিয়ে বলল,
“তিন বছর আগে আমাদের বিয়ে হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু বিয়ের এক সপ্তাহ আগে ও একটা দুর্ঘটনায় মারা যায়।”
নীলা ধীরে ধীরে বলল,
“তার নাম?”
অয়ন বলল,
“তৃষা।”
মেয়েটির মুখে হঠাৎ অদ্ভুত একটা পরিবর্তন দেখা গেল।
“আপনি কি এখনও তার জন্য অপেক্ষা করেন?”
“জানি না।”
“যদি সে ফিরে আসে?”
অয়ন মৃদু হেসে বলল,
“মৃত মানুষ তো ফিরে আসে না।”
নীলা কোনো উত্তর দিল না।
ট্রেনের গতি হঠাৎ কমে গেল।
অয়ন বাইরে তাকিয়ে দেখল—স্টেশন।
কিন্তু স্টেশনের নামফলক দেখে তার বুক কেঁপে উঠল।
মাধবপুর।
এই স্টেশন তো বহু বছর ধরে বন্ধ!
অয়ন উঠে দাঁড়াল।
“এই ট্রেন এখানে কেন থামল?”
নীলা বলল,
“কারও জন্য।”
“কার জন্য?”
নীলা তার দিকে তাকিয়ে বলল,
“যে এখনও অপেক্ষা করছে।”
ঠিক তখনই ট্রেনের দরজা খুলে গেল।
প্ল্যাটফর্মে কেউ নেই।
শুধু দূরে একটি হলুদ বাতি জ্বলছে।
অয়ন আবার নীলার দিকে তাকাল।
“আপনি এসব কী বলছেন?”
নীলা এবার উঠে দাঁড়াল।
“আপনি কি তৃষাকে শেষবার কোথায় দেখেছিলেন?”
অয়ন বলল,
“এই মাধবপুরেই।”
নীলা মাথা নাড়ল।
“না। আপনি ভুল করছেন।”
“মানে?”
“তৃষা এখানে মারা যায়নি।”
অয়নের বুকের ভেতরটা ধক করে উঠল।
“আপনি কীভাবে জানেন?”
নীলা কোনো উত্তর দিল না।
সে ধীরে ধীরে দরজার দিকে এগিয়ে গেল।
অয়ন তার পিছু নিল।
প্ল্যাটফর্মে পা রাখতেই চারপাশের দৃশ্য বদলে গেল।
স্টেশনটা আর পরিত্যক্ত মনে হলো না।
চারপাশে মানুষ।
চায়ের দোকান।
হকার।
টিকিট কাউন্টার।
ঘড়িতে সময়—
রাত ১১টা ৫৮ মিনিট।
অয়ন হতবাক হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।
তারপর সে দেখল—
প্ল্যাটফর্মের শেষ প্রান্তে একটি মেয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
হলুদ পোশাক।
চোখে সেই পরিচিত হাসি।
অয়নের শরীর অবশ হয়ে গেল।
“তৃষা!”
মেয়েটি তার দিকে তাকিয়ে হাসল।
অয়ন ছুটে গেল।
কিন্তু কাছে পৌঁছানোর আগেই দৃশ্যটা আবার বদলে গেল।
স্টেশন ফাঁকা।
সব আলো নিভে গেছে।
নীলাও নেই।
অয়ন একা দাঁড়িয়ে।
তার পায়ের কাছে পড়ে আছে একটি পুরনো বই।
সে বইটি তুলে নিল।
প্রথম পাতায় লেখা—
“তৃষার জন্য—নীলা।”
অয়নের মাথা ঘুরতে লাগল।
বইয়ের ভেতর একটি পুরনো ছবি ছিল।
ছবিতে তৃষা আর নীলা পাশাপাশি দাঁড়িয়ে।
পেছনে লেখা—
“দুই বোন, এক স্বপ্ন।”
অয়ন অবাক হয়ে গেল।
তৃষার তো কোনো বোন ছিল না!
সে বইয়ের পরের পাতাগুলো খুলতে লাগল।
সেখানে লেখা ছিল তৃষার ডায়েরির কিছু অংশ।
একটি পাতায় লেখা—
“অয়ন ভাবে আমি তাকে ছেড়ে চলে যাব। কিন্তু আমি জানি, আমাদের বিয়ে হবেই।”
আরেকটি পাতায়—
“আমার বোন নীলা বলেছে, সে আমাদের বিয়েতে সবচেয়ে বেশি নাচবে।”
অয়নের হাত কাঁপতে লাগল।
শেষ পাতায় লেখা—
“আজ অয়নের সঙ্গে শেষবার দেখা করতে যাচ্ছি। ওকে একটা কথা বলব। কিন্তু যদি আমার কিছু হয়, নীলা যেন অয়নকে সব সত্যি বলে।”
অয়ন পাতা উল্টে দেখল—
শেষ লাইনটি অসম্পূর্ণ।
তারপর আর কিছু নেই।
হঠাৎ তার পেছন থেকে নীলার কণ্ঠ এল,
“তৃষা তোমাকে কোনোদিন ছেড়ে যেতে চায়নি।”
অয়ন ঘুরে দাঁড়াল।
নীলা দাঁড়িয়ে আছে।
কিন্তু এবার তার চোখে জল।
অয়ন বলল,
“তুমি কে?”
নীলা ধীরে ধীরে বলল,
“আমি তৃষার বোন।”
অয়ন স্তব্ধ।
“কিন্তু তৃষা বলেছিল তার কোনো বোন নেই।”
“কারণ আমাদের পরিবারে একটা ঘটনা ঘটেছিল। আমাকে ছোটবেলায় অন্য পরিবারে দিয়ে দেওয়া হয়েছিল। পরে তৃষার সঙ্গে আমার যোগাযোগ হয়।”
“তাহলে তুমি…”
“আমি সেই রাতের সত্যিটা জানি।”
অয়ন এগিয়ে গেল।
“বল।”
নীলা চোখ নামিয়ে বলল,
“তৃষার মৃত্যু দুর্ঘটনা ছিল না।”
অয়নের বুকের ভেতর যেন আগুন জ্বলে উঠল।
“তাহলে?”
“যে গাড়িটা তাকে ধাক্কা দিয়েছিল, সেটা ইচ্ছা করে তাকে অনুসরণ করছিল।”
“কে চালাচ্ছিল?”
নীলা চুপ করে রইল।
“কে?”
“যে মানুষটা তোমাদের বিয়ে ভাঙতে চেয়েছিল।”
অয়ন বুঝতে পারল—তৃষার পরিবারের এক আত্মীয়ের কথা বলা হচ্ছে, যিনি তাদের সম্পর্কের বিরুদ্ধে ছিলেন।
“প্রমাণ?”
নীলা বলল,
“এই বইয়ের ভেতর আছে।”
অয়ন বইটি খুলল।
শেষ পাতার নিচে একটি ছোট খাম।
খামের ভেতরে ছিল একটি পুরনো মেমোরি কার্ড।
নীলা বলল,
“তৃষা মৃত্যুর আগে সবকিছু রেকর্ড করেছিল।”
ঠিক তখনই দূর থেকে ট্রেনের শব্দ শোনা গেল।
নীলা বলল,
“আমার সময় শেষ।”
“তুমি কোথায় যাবে?”
“যেখানে তৃষা অপেক্ষা করছে।”
অয়নের চোখে জল এসে গেল।
“তৃষা কি সত্যিই এখানে আছে?”
নীলা মৃদু হাসল।
“কিছু মানুষ চলে গেলেও অপেক্ষা করতে থাকে।”
ট্রেন এসে থামল।
অয়ন চোখ বন্ধ করল।
এক মুহূর্ত পর চোখ খুলে দেখল—
প্ল্যাটফর্মে কেউ নেই।
শুধু বইটি তার হাতে।
সে দ্রুত স্টেশন থেকে বেরিয়ে গেল।
পরদিন মেমোরি কার্ডটি পুলিশের হাতে তুলে দিল।
তদন্ত শুরু হলো।
পুরনো মামলাটি আবার খোলা হলো।
শেষ পর্যন্ত বেরিয়ে এল সত্যি।
তৃষার মৃত্যুর ঘটনায় পরিকল্পিত ষড়যন্ত্র ছিল।
অপরাধী ধরা পড়ল।
কিন্তু অয়নের কাছে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন থেকে গেল—
নীলা কোথায়?
পুলিশের নথি ঘেঁটে সে জানতে পারল, তৃষার কথিত বোন নীলার নাম কোনো নথিতে নেই।
আরও আশ্চর্যের বিষয়—
তিন বছর আগে তৃষার মৃত্যুর দিনই একজন অজ্ঞাতপরিচয় তরুণীর মৃতদেহ উদ্ধার হয়েছিল মাধবপুর স্টেশনের কাছে।
মেয়েটির পরিচয় কখনও জানা যায়নি।
অয়ন সেই রিপোর্ট পড়ে স্তব্ধ হয়ে গেল।
ছবিটি দেখে তার চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ল।
ছবিতে সেই মুখ।
নীলা।
সেদিন রাতের পর অয়ন আর কখনও শেষ ট্রেনে ওঠেনি।
কিন্তু প্রতি বছর তৃষার মৃত্যুদিবসে সে মাধবপুর স্টেশনে যায়।
রাত ১১টা ৫৮ মিনিটে।
একদিন সে প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়ে ছিল।
হঠাৎ দূরে ট্রেনের আলো দেখা গেল।
ট্রেন এসে থামল।
জানালার পাশে দুটি মেয়ে বসে আছে।
তৃষা আর নীলা।
তৃষা জানালা দিয়ে তাকিয়ে হাসল।
তার ঠোঁট নড়ল—
“এবার বাড়ি ফিরে যাও, অয়ন।”
ট্রেন ছেড়ে দিল।
অয়ন অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল।
তারপর আকাশের দিকে তাকিয়ে বলল,
“আমি তোমাদের ভুলব না।”
সেদিন প্রথমবার তার মনে হলো—
সব অপেক্ষার শেষ হয় না।
কিছু অপেক্ষা শুধু মানুষের জীবন বদলে দেয়।
আর কিছু ভালোবাসা—
মৃত্যুর পরেও শেষ ট্রেনের মতো,
নীরবে ফিরে আসে।
সমাপ্ত

