লবণের পাহাড়ে এক মুঠো মিষ্টি।

সমুদ্রের ধারে ছোট্ট শহরটির নাম ছিল নোনাজল। শহরের একদিকে বিস্তীর্ণ সমুদ্র, অন্যদিকে লবণ তৈরির মাঠ। বছরের বেশির ভাগ সময় সেখানে বাতাসে লবণের গন্ধ ভেসে বেড়াত। শহরের মানুষ সেই গন্ধে অভ্যস্ত হলেও বারো বছরের মেয়ে তিথির কাছে পৃথিবীটা ছিল অন্য রকম। সে প্রতিদিন এমন কিছু খুঁজত, যা অন্যদের চোখ এড়িয়ে যায়।

তিথির বাবা ছিলেন জেলে। মা বাড়িতে আচার তৈরি করে বিক্রি করতেন। সংসারে অভাব ছিল, কিন্তু তিথির কৌতূহলের অভাব ছিল না। স্কুল থেকে ফিরে সে কখনো ঝিনুক কুড়োত, কখনো ঢেউয়ের ওঠানামা দেখত, আবার কখনো সমুদ্রের ধারে বসে নিজের মনে গল্প বানাত।

একদিন স্কুলে শিক্ষক ঘোষণা করলেন, পরের সপ্তাহে শহরে একটি বড় খাদ্য উৎসব হবে। বিভিন্ন দোকান নিজেদের তৈরি খাবার নিয়ে আসবে। সেরা খাবার প্রস্তুতকারককে পুরস্কার দেওয়া হবে।

তিথির মা খবরটা শুনে বললেন, “আমরাও যদি আমাদের আমের আচার নিয়ে যেতাম! কত মানুষ আমাদের আচার খেতে পারত।”

কিন্তু পরক্ষণেই তাঁর মুখ ম্লান হয়ে গেল। উৎসবে দোকান বসাতে যে টাকা লাগবে, তা তাঁদের কাছে ছিল না।

তিথি কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, “মা, দোকান না হোক, আমরা অন্যভাবে অংশ নিতে পারি না?”

মা হেসে বললেন, “সব জায়গায় শুধু ভালো খাবার থাকলেই হয় না রে। অনেক সময় সেখানে পৌঁছনোরও খরচ থাকে।”

কথাটা তিথির মনে গেঁথে গেল।

পরদিন স্কুল থেকে ফেরার পথে সে দেখল, শহরের পুরোনো বাজারের কাছে এক বৃদ্ধ বসে আছেন। তাঁর সামনে কয়েকটি ছোট কাচের বয়াম। বয়ামগুলিতে রঙিন গুঁড়ো ভরা। কেউ সেগুলির দিকে তাকাচ্ছিল না।

তিথি কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করল, “দাদু, এগুলো কী?”

বৃদ্ধ বললেন, “বিভিন্ন রকমের মশলা। একসময় আমার দোকান ছিল। এখন চোখে কম দেখি, তাই আর দোকান চালাতে পারি না। যা একটু বানাই, এখানে বসে বিক্রি করি।”

তিথি বয়ামগুলির দিকে তাকিয়ে দেখল, হলুদ, লাল, বাদামি—প্রতিটি রঙ যেন আলাদা গল্প বলছে।

“আপনি কি জানেন, কোন মশলা দিয়ে কী খাবারের স্বাদ বদলে যায়?” তিথি জানতে চাইল।

বৃদ্ধের চোখে যেন আলো জ্বলে উঠল। তিনি একে একে বুঝিয়ে দিলেন, কীভাবে সামান্য জিরে ভাজা গন্ধ বাড়ায়, কীভাবে সর্ষে খাবারে ঝাঁজ আনে, আর কীভাবে শুকনো লঙ্কার সঙ্গে একটু মিষ্টি উপাদান মিশলে স্বাদে ভারসাম্য আসে।

তিথি মুগ্ধ হয়ে শুনল। তারপর তার মাথায় একটি বুদ্ধি এল।

বাড়ি ফিরে সে মাকে বলল, “আমরা শুধু আচার বিক্রি করব না। আমরা মানুষের সামনে আচার বানানোর গল্প বলব। প্রত্যেকে একটু করে চেখে দেখবে, আর চাইলে ছোট প্যাকেট কিনতে পারবে। দোকান না থাকলেও তো মানুষ আমাদের চিনতে পারবে!”

মা প্রথমে দ্বিধায় পড়লেন। কিন্তু তিথি হাল ছাড়ল না। সে স্কুলের শিক্ষকের সঙ্গে কথা বলল। শিক্ষক খাদ্য উৎসবের আয়োজকদের কাছে প্রস্তাবটি পৌঁছে দিলেন। তিথির পরিবারের জন্য বিনা খরচে একটি ছোট প্রদর্শনী-জায়গার ব্যবস্থা হল। তবে সেখানে বিক্রি করা খাবারের স্বাস্থ্যবিধি মানা এবং উপকরণের তালিকা স্পষ্ট করে দেওয়া বাধ্যতামূলক ছিল।

উৎসবের দিন তিথি ও তার মা ছোট ছোট বয়ামে আচার সাজিয়ে নিয়ে গেলেন। পাশে একটি হাতে লেখা বোর্ডে তিথি লিখেছিল—

“আমাদের আচারে আছে বাড়ির স্বাদ, ধৈর্যের সময় আর মায়ের ভালোবাসা।”

প্রথম দিকে কেউ তাঁদের দিকে বিশেষ নজর দিল না। বড় বড় দোকানে আলো, সাজসজ্জা আর নানা রকম খাবারের ভিড়। তিথির ছোট্ট টেবিলটি যেন সেই ভিড়ে হারিয়ে যাচ্ছিল।

তবু সে হাল ছাড়ল না। উৎসবে আসা শিশুদের সে বুঝিয়ে বলল, কীভাবে কাঁচা আম ধুয়ে, শুকিয়ে, মশলা মিশিয়ে আচার তৈরি করা হয়। সে কাউকে জোর করে কিছু কিনতে বলল না। শুধু খাবারের স্বাদ আর তৈরির পদ্ধতি নিয়ে কথা বলল।

একসময় কয়েকজন মানুষ থামলেন। তাঁরা আচার চেখে দেখলেন। তারপর আরও কয়েকজন এলেন। দুপুরের মধ্যেই ছোট বয়ামগুলির বেশির ভাগ বিক্রি হয়ে গেল।

কিন্তু সবচেয়ে বড় ঘটনা ঘটল বিকেলের দিকে।

উৎসবের বিচারকেরা তিথিদের টেবিলে এসে থামলেন। তাঁরা শুধু আচার চেখে দেখলেন না, তিথির ব্যাখ্যাও মন দিয়ে শুনলেন। বিচারকদের একজন জিজ্ঞেস করলেন, “তুমি কি নিজেই সব পরিকল্পনা করেছ?”

তিথি মাথা নাড়ল। “আমি শুধু বুঝেছি, আমাদের খাবার ভালো হলেও মানুষ যদি তার গল্প না জানে, তবে তারা আমাদের চিনবে কীভাবে।”

সেদিন তিথির মা প্রথম পুরস্কার পাননি। পুরস্কার পেয়েছিল শহরের বিখ্যাত এক মিষ্টির দোকান। কিন্তু উৎসব শেষে তিনটি ছোট খাবারের দোকান তিথির মায়ের কাছ থেকে নিয়মিত আচার নেওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করল। আয়োজকেরাও পরের উৎসবে ছোট উদ্যোক্তাদের জন্য আলাদা জায়গা রাখার সিদ্ধান্ত নিলেন।

বাড়ি ফেরার পথে মা তিথির হাত ধরে বললেন, “আজ বুঝলাম, বড় হওয়ার জন্য সব সময় বড় দোকান লাগে না। নিজের কাজকে মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার সাহস লাগে।”

তিথি সমুদ্রের দিকে তাকাল। দূরে সূর্য ডুবছিল। লবণের মাঠে শেষ আলো পড়ে সাদা পাহাড়গুলো সোনালি হয়ে উঠেছে।

সে মনে মনে ভাবল, সমুদ্রের জল নোনতা হলেও তার পাশেই কত রকম মিষ্টি গল্প জন্ম নেয়! শুধু সেই গল্পগুলো বলার মতো কাউকে দরকার।

সেদিন থেকে তিথি নিজের চারপাশের ছোট ছোট মানুষের কাজের গল্প লিখতে শুরু করল। কেউ মাছ ধরত, কেউ জাল বুনত, কেউ মাটির হাঁড়ি বানাত। তিথি তাদের কাজের ছবি আঁকত, কথা লিখে রাখত এবং স্কুলের দেওয়াল পত্রিকায় প্রকাশ করত।

কয়েক মাসের মধ্যেই তার লেখাগুলি শহরের মানুষের মধ্যে পরিচিত হয়ে উঠল। তিথি বুঝতে পারল, মানুষের মূল্য শুধু তার পকেটের টাকায় মাপা যায় না। অনেক সময় তার হাতে থাকা সামান্য জিনিসটির পেছনে লুকিয়ে থাকে বহু বছরের অভিজ্ঞতা, পরিশ্রম আর ভালোবাসা।

আর সেই গল্প অন্যদের কাছে পৌঁছে দেওয়াও এক ধরনের বড় কাজ।

শিক্ষা: নিজের প্রতিভা বা কাজের মূল্য বোঝাতে শুধু অর্থ বা আড়ম্বরের প্রয়োজন হয় না। সততা, সৃজনশীলতা এবং নিজের কাজের গল্প তুলে ধরার সাহস থাকলে ছোট উদ্যোগও বড় সম্ভাবনার দরজা খুলে দিতে পারে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *