যে ছেলেটি হেরে গিয়েও জিতেছিল।

পুরুলিয়ার একটি ছোট শহরে থাকত অদ্বৈত। তার বাবা ছিলেন সাইকেল মেরামতির মিস্ত্রি। দোকানটি ছিল রেললাইনের পাশের সরু গলিতে। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত সেখানে সাইকেলের ঘণ্টা, পাম্পের শব্দ আর লোহার সঙ্গে লোহার ঠোকাঠুকি শোনা যেত।

অদ্বৈতের পড়াশোনার পাশাপাশি খেলাধুলার প্রতি ছিল গভীর আগ্রহ। তবে তার সবচেয়ে প্রিয় খেলা ছিল দাবা। স্কুলের লাইব্রেরিতে রাখা একটি পুরোনো দাবার বোর্ডে সে প্রথম খেলতে শিখেছিল। পরে নিজের জমানো টাকা দিয়ে একটি সস্তা বোর্ড কিনেছিল। রাতে দোকান বন্ধ হওয়ার পর বাবার সঙ্গে সে দাবা খেলত।

একদিন স্কুলে ঘোষণা হলো, জেলা স্তরের দাবা প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হবে। বিজয়ী রাজ্য স্তরের প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়ার সুযোগ পাবে।

অদ্বৈত নাম নথিভুক্ত করল।

প্রতিযোগিতার আগে সে প্রতিদিন অনুশীলন করতে লাগল। স্কুলের শিক্ষক অনির্বাণবাবু তাকে বিভিন্ন চাল শেখাতেন। কিন্তু অদ্বৈতের নিজের ওপর বিশ্বাস এতটাই বেড়ে গিয়েছিল যে সে ধীরে ধীরে অন্যদের কথা শোনা বন্ধ করে দিল।

একদিন তার বাবা বললেন, “দাবায় শুধু নিজের চাল দেখলে হয় না। প্রতিপক্ষ কী ভাবছে, সেটাও বুঝতে হয়।”

অদ্বৈত হেসে উত্তর দিল, “আমি যদি নিজের চাল ঠিক রাখি, তা হলে অন্যের চাল নিয়ে ভাবতে হবে কেন?”

বাবা আর কিছু বললেন না।

প্রতিযোগিতার দিন অদ্বৈত প্রথম দুটি খেলায় জয় পেল। তৃতীয় খেলায় তার প্রতিপক্ষ ছিল রুদ্র নামে এক শান্ত স্বভাবের ছেলে। রুদ্রের পোশাক সাধারণ, কথা কম, আর খেলার আগে সে অনেকক্ষণ বোর্ডের দিকে তাকিয়ে থাকত।

খেলা শুরু হলো।

অদ্বৈত দ্রুত চাল দিতে লাগল। তার মনে হচ্ছিল, রুদ্রকে সে সহজেই হারিয়ে দেবে। কিন্তু কিছুক্ষণ পর বোর্ডের পরিস্থিতি বদলে গেল। রুদ্র এমন একটি চাল দিল, যা অদ্বৈত একেবারেই আশা করেনি। তার রানি বিপদের মুখে পড়ল।

অদ্বৈত তাড়াহুড়ো করে পাল্টা চাল দিল। তারপর আরও একটি ভুল করল। কয়েক মিনিটের মধ্যেই সে বুঝতে পারল, তার জয়ের সম্ভাবনা প্রায় শেষ।

শেষ পর্যন্ত অদ্বৈত পরাজিত হলো।

খেলা শেষ হওয়ার পর সে বোর্ড থেকে মুখ ফিরিয়ে নিল। তার মনে হচ্ছিল, এত দিনের অনুশীলন, এত আত্মবিশ্বাস—সবকিছু অর্থহীন হয়ে গেল।

রুদ্র এগিয়ে এসে বলল, “তুমি চাইলে আমরা খেলাটার চালগুলো আবার দেখতে পারি। একটা জায়গায় তুমি অন্য চাল দিলে ফল আলাদা হতে পারত।”

অদ্বৈত বিরক্ত হয়ে বলল, “তুমি জিতেছ। এখন আমাকে শেখাতে হবে না।”

রুদ্র চুপ করে নিজের বোর্ড গুছিয়ে চলে গেল।

সেদিন অদ্বৈত আর কোনও খেলা ভালোভাবে খেলতে পারল না। প্রতিযোগিতা শেষে সে বাড়ি ফিরে বাবাকে সব বলল। বাবা তার মাথায় হাত রেখে বললেন, “হারলে কষ্ট হয়, সেটা স্বাভাবিক। কিন্তু হার থেকে কিছু শিখতে না চাইলে একই ভুল বারবার ফিরে আসবে।”

অদ্বৈত কিছু বলল না। রাতে সে নিজের দাবার বোর্ড খুলে বসে রইল। মনে পড়ল, রুদ্রের শেষ কয়েকটি চাল কত শান্তভাবে এসেছিল। সে বুঝতে পারল, রুদ্র শুধু ভালো চাল দেয়নি; সে ধৈর্য ধরে অদ্বৈতের ভুলের অপেক্ষাও করেছিল।

পরদিন অদ্বৈত স্কুলে গিয়ে অনির্বাণবাবুর কাছে নিজের খেলার ভুলগুলো বিশ্লেষণ করতে চাইল। শিক্ষক তাকে বোর্ডে সেই খেলাটি সাজাতে বললেন। দুজনে একে একে চালগুলো পর্যালোচনা করল। কোথায় অদ্বৈত তাড়াহুড়ো করেছে, কোথায় প্রতিপক্ষের সম্ভাব্য চাল বিবেচনা করেনি, কোথায় নিজের অবস্থান না বুঝেই আক্রমণ করেছে—সব পরিষ্কার হয়ে গেল।

অদ্বৈত বুঝল, সে হেরেছে শুধু রুদ্রের দক্ষতার কাছে নয়, নিজের অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাসের কাছেও।

কয়েক দিন পরে স্কুলে দাবা ক্লাবের একটি অনুশীলনী সভা বসে। সেখানে রুদ্রও এসেছিল। অদ্বৈত নিজে থেকে তার কাছে গিয়ে বলল, “সেদিন তোমার কথা শুনিনি। তুমি কি আবার সেই খেলাটা নিয়ে আলোচনা করবে?”

রুদ্র হাসল। “অবশ্যই। আমিও তোমার কাছ থেকে শিখতে পারি।”

সেদিন দুজনে দীর্ঘক্ষণ ধরে দাবা খেলল। কখনও অদ্বৈত জিতল, কখনও রুদ্র। কিন্তু এবার অদ্বৈত প্রতিটি চালের আগে একটু থামত, বোর্ডের অন্য দিকটাও দেখত, আর ভুল হলে তা স্বীকার করত।

কয়েক মাস পরে আরেকটি প্রতিযোগিতায় অদ্বৈত অংশ নিল। সে এবারও প্রথম হয়নি। সেমিফাইনালে একটি কঠিন খেলায় হেরে গেল। কিন্তু খেলা শেষে সে প্রতিপক্ষের সঙ্গে হাত মেলাল এবং নিজের ভুলগুলো লিখে রাখল।

ফল ঘোষণার পর বিচারক তাকে বিশেষ সম্মাননা দিলেন—‘সেরা ক্রীড়াসুলভ আচরণ’-এর জন্য।

অদ্বৈত অবাক হয়ে গেল। সে তো প্রতিযোগিতা জেতেনি!

বিচারক বললেন, “জয়ী হওয়া অবশ্যই আনন্দের। কিন্তু পরাজয়ের পরেও যে খেলাকে সম্মান করতে পারে, প্রতিপক্ষের কাছ থেকে শিখতে পারে এবং নিজের ভুল স্বীকার করতে পারে, সে খেলাটির প্রকৃত মূল্য বুঝেছে।”

বাড়ি ফিরে অদ্বৈত বাবাকে সম্মাননাটি দেখাল। বাবা অনেকক্ষণ সেটির দিকে তাকিয়ে থেকে বললেন, “এবার বুঝেছিস, দাবার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চাল কোনটি?”

অদ্বৈত হেসে উত্তর দিল, “যে চাল আমাকে জিততে সাহায্য করে, শুধু সেটি নয় বাবা। যে চাল আমাকে নিজের ভুল চিনতে শেখায়, সেটিও।”

সেদিন রাতে বাবা-ছেলে আবার দাবার বোর্ডে বসল। বাইরে দোকানের শাটার বন্ধ, গলিতে নীরবতা। বোর্ডের ঘরগুলোয় সাদা-কালো গুটিগুলো সাজানো হলো।

খেলা শুরু হওয়ার আগে অদ্বৈত এবার বাবাকে বলল, “আজ তুমি আগে চাল দাও।”

বাবা মৃদু হেসে প্রথম গুটিটি এগিয়ে দিলেন।

শিক্ষা: পরাজয় জীবনের শেষ কথা নয়। নিজের ভুল স্বীকার করে, অন্যের কাছ থেকে শেখার মানসিকতা রাখলে হারও ভবিষ্যতের সাফল্যের ভিত্তি হয়ে উঠতে পারে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *