শেষ পাতার অসমাপ্ত ছবি।।
শহরের এক কোণে ছিল একটি পুরোনো গণগ্রন্থাগার। দোতলা বাড়িটির দেয়ালে শ্যাওলা জমেছিল, কাঠের জানালাগুলির রং উঠে গিয়েছিল, আর বর্ষাকালে ছাদের এক জায়গা দিয়ে জল পড়ত। তবু প্রতিদিন বিকেলে সেখানে কয়েকজন মানুষ আসতেন। কেউ খবরের কাগজ পড়তেন, কেউ চাকরির পরীক্ষার প্রস্তুতি নিতেন, আর কেউ নিছক বইয়ের গন্ধে হারিয়ে যেতেন।
সেই গ্রন্থাগারের দেখাশোনা করতেন অবসরপ্রাপ্ত ডাকঘরকর্মী হরিপদবাবু। বইয়ের প্রতি তাঁর ভালোবাসা ছিল গভীর। তিনি জানতেন, একটি বই শুধু কাগজের মলাট নয়—কখনো কখনো সেটি মানুষের জীবনের বন্ধ দরজা খুলে দেয়।
একদিন বইয়ের তাক পরিষ্কার করতে গিয়ে তিনি একটি পুরোনো ছবি আঁকার খাতা খুঁজে পেলেন। খাতাটির মলাটে নাম লেখা ছিল—‘অনির্বাণ সেন’। ভিতরে পাতায় পাতায় আঁকা ছিল নদী, পাখি, বাড়ি, মানুষের মুখ এবং অদ্ভুত সব কল্পনার দৃশ্য। কিন্তু শেষ কয়েকটি পাতায় ছিল শুধু পেন্সিলের হালকা দাগ। যেন কেউ ছবি আঁকতে শুরু করেও শেষ করতে পারেনি।
হরিপদবাবু খাতাটি গ্রন্থাগারের টেবিলে রেখে দিলেন। পরদিন সেটি দেখতে এল ষোলো বছরের মেয়ে মেঘলা। সে ছবি আঁকতে ভালোবাসত, কিন্তু নিজের আঁকা কাউকে দেখাতে সাহস পেত না। তার ধারণা ছিল, ভালো ছবি আঁকতে হলে জন্মগত প্রতিভা থাকতে হয়।
খাতার ছবিগুলি দেখে সে বিস্মিত হয়ে গেল।
“দাদু, এই মানুষটি এখন কোথায়?” মেঘলা জানতে চাইল।
হরিপদবাবু বললেন, “তা জানি না। বহু বছর আগে এই গ্রন্থাগারে আসতেন। তারপর আর দেখিনি।”
মেঘলা শেষ পাতাগুলির দিকে তাকিয়ে বলল, “উনি ছবিগুলো শেষ করতে পারেননি কেন?”
হরিপদবাবু মৃদু হেসে বললেন, “সব অসমাপ্ত কাজের পেছনে একই কারণ থাকে না। হয়তো সময় পাননি, হয়তো অন্য কিছু ঘটেছিল। আমরা না জেনে তাঁর হয়ে উত্তর বানিয়ে দিতে পারি না।”
কথাটা মেঘলার মনে রয়ে গেল।
পরের কয়েক দিন সে খাতাটি দেখতে গ্রন্থাগারে আসত। ছবিগুলির রেখা, আলো-ছায়া আর ছোট ছোট খুঁটিনাটি দেখে তার মনে হতো, অনির্বাণ যেন নিজের চারপাশের পৃথিবীকে অন্য চোখে দেখতেন। একদিন সে খাতার একটি ছবির পাশে নিজের আঁকা একটি ছোট ছবি রাখল। ছবিতে ছিল বৃষ্টির পরে রাস্তার জমা জলে আকাশের প্রতিবিম্ব।
হরিপদবাবু ছবিটি দেখে বললেন, “তুমি কি এটা এখানে প্রদর্শন করতে চাও?”
মেঘলা তাড়াতাড়ি মাথা নাড়ল। “না না! আমার ছবি অত ভালো নয়।”
“কে বলেছে?”
“আমার সহপাঠীরা বলে, আমার আঁকাগুলো দেখতে ঠিক ছবির মতো হয় না।”
হরিপদবাবু ছবিটি আবার দেখলেন। তারপর বললেন, “তোমার ছবিতে রাস্তার রেখা নিখুঁত নয়, কিন্তু জলের মধ্যে আকাশটা খুব সুন্দর ধরা পড়েছে। সবাই একইভাবে পৃথিবী দেখবে, এমন তো নয়।”
সেই প্রথম মেঘলা নিজের ছবির মধ্যে একটি ভালো দিক খুঁজে পেল।
এরপর সে একটি সিদ্ধান্ত নিল। গ্রন্থাগারের দেয়ালে শিশু-কিশোরদের আঁকা ছবি নিয়ে ছোট্ট প্রদর্শনী হবে। সে হরিপদবাবুর কাছে অনুমতি চাইল। প্রথমে তিনি একটু চিন্তায় পড়লেন। পুরোনো দেয়ালে ছবি টাঙানো, লোকজনের আসা-যাওয়া—সবকিছুরই কিছু ব্যবস্থা দরকার। তবে তিনি বললেন, গ্রন্থাগারের নিয়ম মেনে এবং বইয়ের ক্ষতি না করে প্রদর্শনী করা যেতে পারে।
মেঘলা স্কুলে গিয়ে বন্ধুদের বলল। কেউ নিজের আঁকা বাড়ির ছবি দিল, কেউ পাখি, কেউ আবার নিজের কল্পনার গ্রহ এঁকে আনল। প্রথমে অনেকেই সংকোচ করেছিল। মেঘলা তাদের বলেছিল, “এখানে সেরা ছবি বেছে নেওয়া হবে না। প্রত্যেকে নিজের ছবির গল্প বলবে।”
প্রদর্শনীর দিন গ্রন্থাগারের দেয়াল রঙিন হয়ে উঠল। দর্শকেরা ছবির সামনে দাঁড়িয়ে শিল্পীদের কথা শুনছিলেন। একটি ছোট ছেলে তার আঁকা কুকুরের ছবির পাশে লিখেছিল, “আমি বড় হয়ে পথের কুকুরদের জন্য আশ্রয় বানাতে চাই।” আরেকটি মেয়ে আঁকেছিল তার ঠাকুমার রান্নাঘর, যেখানে জানালা দিয়ে সকালের আলো ঢুকছে।
বিকেলের দিকে এক বৃদ্ধ প্রদর্শনী দেখতে এলেন। তিনি অনেকক্ষণ ধরে ছবিগুলি দেখলেন। তারপর হঠাৎ পুরোনো খাতাটির সামনে এসে দাঁড়ালেন, যেটি মেঘলা একটি কাচের বাক্সে যত্ন করে রেখেছিল।
বৃদ্ধের চোখ স্থির হয়ে গেল খাতার মলাটে।
“এই খাতাটা তোমরা কোথায় পেলে?” তিনি কাঁপা গলায় জিজ্ঞেস করলেন।
হরিপদবাবু এগিয়ে এসে বললেন, “গ্রন্থাগারের পুরোনো তাক থেকে। আপনি কি অনির্বাণ সেন?”
বৃদ্ধ ধীরে মাথা নাড়লেন।
অনির্বাণবাবু জানালেন, ছোটবেলায় তিনি এখানে ছবি আঁকতে আসতেন। পরে পরিবারের দায়িত্ব নিতে গিয়ে আঁকা ছেড়ে চাকরি শুরু করেন। বহু বছর নিজের পুরোনো খাতার কথা ভাবেননি। শেষ পাতাগুলি কেন অসমাপ্ত, তার কোনো বিশেষ রহস্য ছিল না—জীবন তাঁকে অন্য দিকে নিয়ে গিয়েছিল।
“কখনো ভেবেছিলাম, আবার আঁকব,” তিনি বললেন। “কিন্তু যত দিন গেছে, ততই মনে হয়েছে, এত বছর পরে আর কী হবে?”
মেঘলা তাঁর দিকে তাকিয়ে বলল, “আপনার ছবিগুলো দেখে আমি আবার আঁকা শুরু করেছি। আপনি না আঁকলেও আপনার ছবিগুলো তো আমার কাজে লেগেছে।”
অনির্বাণবাবু কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন। তারপর মেঘলার কাছ থেকে একটি সাদা কাগজ চাইলেন। টেবিলে বসে তিনি ধীরে ধীরে একটি জানালা আঁকলেন। জানালার বাইরে ছিল একটি ছোট গাছ, আর গাছের ডালে বসে ছিল একটি পাখি।
ছবিটি শেষ করে তিনি নিচে লিখলেন—‘ফিরে আসার জন্য কখনো দেরি হয় না।’
মেঘলা ছবিটি দেখে হাসল। হরিপদবাবু সেটি প্রদর্শনীর অন্য ছবিগুলির পাশে রাখলেন।
সেদিন গ্রন্থাগারের কেউ প্রথম, দ্বিতীয় বা তৃতীয় পুরস্কার পেল না। তবু অনেকেই বাড়ি ফেরার সময় নতুন করে আঁকার, লেখার কিংবা বহু দিন ধরে ফেলে রাখা কোনো কাজ শুরু করার কথা ভাবলেন।
অনির্বাণবাবু পরের সপ্তাহেও এলেন। তারপর তার পরের সপ্তাহেও। তিনি নিয়মিত ছবি আঁকতে শুরু করলেন। মেঘলাও আঁকতে থাকল—কখনো সুন্দর, কখনো অসম্পূর্ণ, কখনো নিজের কাছেই অদ্ভুত মনে হয় এমন ছবি।
তারপর একদিন মেঘলা নিজের খাতার শেষ পাতায় একটি জানালা আঁকল। জানালাটি খোলা, বাইরে অসীম আকাশ।
পাতার নিচে সে লিখল, “শেষ বলে কিছু নেই। কখনো কখনো একটি শেষ পাতাই নতুন শুরুর জায়গা হয়ে ওঠে।”
শিক্ষা: অসম্পূর্ণতা মানেই ব্যর্থতা নয়। নিজের কাজকে নিখুঁত হওয়ার অপেক্ষায় আটকে না রেখে আবার শুরু করার সাহস রাখতে হয়। আমাদের একটি ছোট পদক্ষেপ অন্য কাউকেও নতুন করে স্বপ্ন দেখতে সাহায্য করতে পারে।

