অনাথ আশ্রমে দুর্গাপুজো হয়নি, নতুন জামা ও রংমশালে কচিকাঁচাদের মুখে হাসি ফোটাল মন্তেশ্বরের পরিবার।

পূর্ব বর্ধমান, নিজস্ব সংবাদদাতা: একদিকে দুর্গাপুজো না হওয়ার মনখারাপ, অন্যদিকে নতুন জামাকাপড় হাতে পেয়ে একরাশ আনন্দ! রংমশাল জ্বালিয়ে উৎসবে মাতল পূর্ব বর্ধমানের পূর্বস্থলীর দামোদরপাড়া অনাথ আশ্রমের কচিকাঁচারা। আর শিশুদের মুখে হাসি ফোটাতে এগিয়ে এলেন মন্তেশ্বরের এক পরিবার। নতুন জামাকাপড়ের পাশাপাশি ভালোবাসা, মমতা ও মানবিকতার এক অনন্য নজির গড়লেন তাঁরা।

সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে ওই পরিবার জানতে পারে, দামোদরপাড়া অনাথ আশ্রমে এবার দুর্গাপুজোর আয়োজন করা হয়নি। গত ছয় বছর ধরে এই আশ্রমে দুর্গাপুজো অনুষ্ঠিত হয়ে আসছিল। সেই সময় আবাসিক শিশুরা জীবন্ত দুর্গা সেজে আনন্দে মেতে উঠত। কিন্তু এবার পুজো না হওয়ায় মন খারাপ ছিল আশ্রমের কচিকাঁচাদের।

এই খবর মন ছুঁয়ে যায় মন্তেশ্বর থানার বামুনপাড়া পঞ্চায়েতের শাহাজাদপুরের বাসিন্দা পরিতোষ ঘোষের। এরপর বাবা তপন ঘোষ ও মা শিখা ঘোষের সঙ্গে আলোচনা করে তিনি সিদ্ধান্ত নেন, আশ্রমের শিশু ও মায়েদের হাতে নতুন জামাকাপড় তুলে দেবেন।

সেই মতো অষ্টমীর দিন আশ্রমের পরিচালক সমর মুখার্জির সঙ্গে ফোনে যোগাযোগ করেন পরিতোষবাবু। এরপর শুরু হয় নতুন জামাকাপড় কেনার প্রস্তুতি। কিন্তু নবমীর সকালে হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েন পরিতোষ ঘোষ। তাঁকে হাসপাতালে ভর্তি করতে হয়। তবে তাঁর অসুস্থতার মধ্যেও পরিবারের মানবিক উদ্যোগ থেমে থাকেনি।

অবশেষে বুধবার সকালে ব্যাগভর্তি নতুন জামাকাপড়, রংমশাল এবং বাড়িতে তৈরি নারকেল নাড়ু নিয়ে দামোদরপাড়া অনাথ আশ্রমে পৌঁছে যান তাঁরা। একে একে আশ্রমের আবাসিকদের হাতে তুলে দেওয়া হয় নতুন পোশাক। অন্যদিকে, নিজের হাতে তৈরি নারকেল নাড়ু শিশুদের খাইয়ে দেন শিখাদেবী।

নতুন জামাকাপড় হাতে পেয়ে আনন্দে আত্মহারা হয়ে ওঠে কচিকাঁচারা। রংমশালের আলোয় আলোকিত হয়ে ওঠে আশ্রমের পরিবেশ। পুজো না হওয়ার যে মনখারাপ এতদিন শিশুদের মনে ছিল, সেই বিষণ্ণতা যেন মুহূর্তেই অনেকটা মুছে গেল। নতুন পোশাক আর রংমশালের আনন্দে তাদের মুখে ফুটে উঠল হাসি।

পরিতোষ ঘোষ জানান, সপ্তমীর দিন সোশ্যাল মিডিয়ায় আশ্রমে দুর্গাপুজো না হওয়ার খবরটি জানতে পারেন তাঁরা। গত ছয় বছর ধরে সেখানে পুজো হয়ে আসছিল। এবার পুজো না হওয়ার কথা শুনে বাবা-মায়ের সঙ্গে আলোচনা করে আশ্রমের শিশু ও মায়েদের নতুন জামাকাপড় দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। সেই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হওয়ায় তাঁরা অত্যন্ত খুশি।

তপন ঘোষ পেশায় দুধ ও ছানার ব্যবসায়ী। ছেলে পরিতোষও বাবার ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত। ব্যস্ত জীবনের মাঝেও তাঁদের এই উদ্যোগ বুঝিয়ে দিল, মানুষের পাশে দাঁড়ানোর জন্য বড় কোনও আয়োজনের প্রয়োজন হয় না। প্রয়োজন শুধু একটি সংবেদনশীল মন এবং অন্যের কষ্ট অনুভব করার ক্ষমতা।

উৎসবের আনন্দ তখনই পূর্ণতা পায়, যখন সেই আনন্দ ভাগ করে নেওয়া যায় তাঁদের সঙ্গে, যাঁদের জীবনে আনন্দের সুযোগ তুলনামূলকভাবে কম। দামোদরপাড়া অনাথ আশ্রমের কচিকাঁচাদের মুখে হাসি ফোটানোর এই উদ্যোগ তাই কেবল নতুন জামাকাপড় উপহার দেওয়ার গল্প নয়, বরং ভালোবাসা ও মানবিকতার এক সুন্দর দৃষ্টান্ত।

নতুন জামাকাপড় হয়তো সময়ের সঙ্গে পুরোনো হয়ে যাবে, রংমশালের আলোও নিভে যাবে। কিন্তু সেদিনের আনন্দ, স্নেহ আর ভালোবাসার স্মৃতি শিশুদের মনে দীর্ঘদিন থেকে যাবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *