রাজনীতির ভেদাভেদ ভুলে একসঙ্গে বিসর্জন, খট্টিমারিতে সম্প্রীতির নজির গড়ল ৩৭ বছরের পুজো।

খট্টিমারি, নিজস্ব সংবাদদাতা:-রাজনীতির ভেদাভেদ ভুলে এক । কাতারে বিজেপি-তৃণমূল,জাঁকজমক নয়, মানুষের টানেই অনন্য জনকল্যাণ ক্লাব ও পাঠাগারের ৩৭তম দুর্গাপুজো। বড় বাজেটের পুজো নয়, নেই চোখ ধাঁধানো আলোক সজ্জা কিংবা জাঁক জমকপূর্ণ মণ্ডপ। তবুও ঐতিহ্য, সম্প্রীতি আর গ্রাম বাংলার মাটির টানে বছরের পর বছর মানুষের মন জয় করে চলেছে খট্টিমারি বাজার জনকল্যাণ ক্লাব ও পাঠাগারের দুর্গাপুজো। এ বছর ৩৭তম বর্ষে পা রাখা এই পুজোর বিসর্জন উৎসব যেন নতুন করে ফিরিয়ে আনল হারিয়ে যেতে বসা গ্রামীণ সংস্কৃতিকে। আবিরের রং, ব্যান্ডের বাজনা আর মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে বিজয়া দশমীর দু’দিন পর খট্টিমারি হয়ে উঠল এক মিলন মেলার প্রাঙ্গণ। জলপাইগুড়ি জেলার প্রত্যন্ত গ্রামীণ জনপদ খট্টিমারি। আশপাশের আট থেকে ন’টি গ্রামের মানুষের নিত্য দিনের কেনা কাটা থেকে শুরু করে উৎসব-পার্বণে মিলিত হওয়ার অন্যতম কেন্দ্র এই বাজার। সেই জনপদের মানুষকে এক সুতোয় বাঁধার কাজ করে চলেছে খট্টিমারি বাজার জনকল্যাণ ক্লাব ও পাঠাগার। গত ৩৬ বছর ধরে দুর্গা পুজোকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন গ্রামের মানুষের মধ্যে গড়ে উঠেছে এক নিবিড় সামাজিক বন্ধন। এ বছর চতুর্থী থেকে দশমী পর্যন্ত ক্লাব প্রাঙ্গণে নিয়ম-নিষ্ঠার সঙ্গে অনুষ্ঠিত হয় দেবী দুর্গার আরাধনা। পুজোকে ঘিরে আয়োজন করা হয় আনন্দ মেলারও। তবে এ বারের বিশেষ আকর্ষণ হয়ে ওঠে প্রতিমা বিসর্জন। অতীতে বিজয়া দশমীর দিনেই সাধারণ ভাবে বিসর্জন সম্পন্ন হলেও এ বছর বিজয়া দশমীর দু’দিন পর বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রার মধ্য দিয়ে সম্পূর্ণ অন্য আবহে মাকে বিদায় জানালেন এলাকার মানুষ।
এদিন আট থেকে আশি সব বয়সের মানুষ শামিল হন বিসর্জন উৎসবে। মহিলা, পুরুষ থেকে শুরু করে কচিকাঁচা, সকলের উপস্থিতিতে উৎসবের রং ছড়িয়ে পড়ে গ্রামজুড়ে। আবির মেখে, ব্যান্ডের তালে নাচতে নাচতে ক্লাব প্রাঙ্গণ থেকে বের হয় দেবী দুর্গার প্রতিমা। বিভিন্ন মেঠোপথ ধরে পার্শ্ববর্তী একাধিক গ্রাম পরিক্রমা করে এগিয়ে চলে বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা।
এই শোভা যাত্রার অন্যতম উল্লেখযোগ্য দিক ছিল রাজনৈতিক ভেদাভেদ ভুলে সকলের একসঙ্গে অংশগ্রহণ। বিজেপি ও তৃণমূলের নেতাকর্মীদের কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে উৎসবে শামিল হতে দেখা যায়। রাজনীতির পরিচয় ছাপিয়ে এদিন বড় হয়ে ওঠে সামাজিক সম্প্রীতি ও উৎসবের আনন্দ। যেন খট্টিমারি আবারও মনে করিয়ে দিল, উৎসবের আসল শক্তি মানুষের মিলনেই।
বিভিন্ন গ্রাম পরিক্রমার পর ডাউকিমারি আউট পোস্টের পুলিশের কড়া নিরাপত্তায় গিলান্ডি নদীতে প্রতিমা বিসর্জন দেওয়া হয়। বিসর্জন পর্ব শেষে ক্লাব প্রাঙ্গণে আয়োজন করা হয় ভোজনের। সব মিলিয়ে এ দিনের উৎসব কেবল প্রতিমা নিরঞ্জনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি, বরং তা পরিণত হয়েছিল এলাকার মানুষের পারস্পরিক সম্পর্ক ও ঐক্যের উদ্‌যাপনে।
ক্লাব কর্তৃপক্ষের দাবি, আগামী দিনেও হারিয়ে যেতে বসা এই গ্রামীণ সংস্কৃতি ও বিসর্জনের ঐতিহ্যকে আরও বৃহত্তর পরিসরে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা চালিয়ে যাবেন তাঁরা। তাঁদের মতে, পুজোর সার্থকতা শুধু মণ্ডপের জৌলুস কিংবা আলোকসজ্জায় নয় বরং মানুষের পাশে থাকা, একে অপরের সঙ্গে আনন্দ ভাগ করে নেওয়া এবং সামাজিক বন্ধন অটুট রাখার মধ্যেই তার প্রকৃত সার্থকতা।
খট্টিমারি বাজার জনকল্যাণ ক্লাব ও পাঠাগারের দুর্গাপুজো তাই শুধু একটি ধর্মীয় উৎসব নয়, আশপাশের একাধিক গ্রামের মানুষের মিলন ক্ষেত্রও। গ্রাম বাংলার সহজ-সরল পরিবেশ, দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য আর সম্প্রীতির মেলবন্ধনে এ বছরের বিসর্জন যেন নতুন করে প্রমাণ করল উৎসব সবার, আনন্দও সবার।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *