গল্প: বাঁশবনের ভেতর লুকিয়ে থাকা পথ।

সুবর্ণপুর গ্রামের শেষ প্রান্তে ছিল একটি বিশাল বাঁশবন। দিনের আলোতেও সেখানে ঢুকলে অদ্ভুত অন্ধকার মনে হত। গ্রামের মানুষ সেই জায়গা এড়িয়ে চলত।

কারণ বাঁশবনের ভেতরে একটি পথ ছিল, যেটা নাকি কোথাও গিয়ে শেষ হয় না।

গ্রামের স্কুলের বিজ্ঞান শিক্ষক সায়ন এসব কুসংস্কার বিশ্বাস করতেন না।

একদিন স্কুল ছুটির পর তিনি বাঁশবনের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন। হঠাৎ লক্ষ্য করলেন, মাটিতে নতুন পায়ের ছাপ।

পায়ের ছাপগুলো বাঁশবনের ভেতরে চলে গেছে।

কৌতূহল সামলাতে না পেরে সায়ন ভেতরে ঢুকলেন।

কিছুদূর যাওয়ার পর তিনি একটি সরু পথ দেখতে পেলেন।

পথটি এতটাই পরিষ্কার যে বোঝা যায়, নিয়মিত কেউ ব্যবহার করে।

সায়ন পায়ের ছাপ অনুসরণ করতে লাগলেন।

প্রায় আধঘণ্টা পর বাঁশবন শেষ হয়ে একটি নিচু পাহাড়ি ঢালে পৌঁছালেন।

সেখানে একটি পরিত্যক্ত কুঁড়েঘর।

দরজা বন্ধ।

জানালার ফাঁক দিয়ে উঁকি দিয়ে সায়ন দেখলেন, ঘরের মধ্যে পুরোনো বাক্স আর কিছু কৃষি যন্ত্রপাতি।

হঠাৎ পিছনে শব্দ।

তিনি ঘুরে দাঁড়াতেই দেখলেন এক কিশোর পালিয়ে যাচ্ছে।

“এই! দাঁড়াও!”

ছেলেটি দৌড়ে বাঁশবনের দিকে চলে গেল।

সায়ন তার পিছু নিলেন।

কিছুদূর গিয়ে ছেলেটিকে ধরে ফেললেন।

“তুমি এখানে কী করছ?”

ছেলেটি ভয়ে চুপ করে রইল।

“নাম কী?”

“বাপন।”

“এই ঘরে কে থাকে?”

বাপন বলল,

“কেউ থাকে না। কিন্তু রাতে লোক আসে।”

“কী লোক?”

“আমি জানি না।”

সায়ন তাকে নিয়ে কুঁড়েঘরের কাছে ফিরে এলেন।

দরজা এবার খোলা।

ভেতরে ঢুকে তিনি অবাক হয়ে দেখলেন, মাটির নিচে একটি বড় গর্ত।

গর্তের ভেতর প্লাস্টিকের পাইপ চলে গেছে দূরের দিকে।

সায়ন বুঝলেন, এটি কোনো সাধারণ কুঁড়েঘর নয়।

পাইপের পাশে ছিল কয়েকটি বড় ড্রাম।

ড্রামের গায়ে রাসায়নিক পদার্থের নাম লেখা।

সায়নের সন্দেহ হল, আশেপাশের কৃষিজমিতে বেআইনি রাসায়নিক ফেলা হচ্ছে।

তিনি ছবি তুলতে শুরু করলেন।

ঠিক তখনই বাইরে মোটরবাইকের শব্দ।

বাপন ফিসফিস করে বলল,

“ওরা এসেছে!”

দুজনেই ঘরের পেছনের সরু পথে বেরিয়ে বাঁশবনের মধ্যে লুকিয়ে পড়ল।

কয়েকজন লোক কুঁড়েঘরে ঢুকল।

তারা ড্রামগুলো পরীক্ষা করে আবার বেরিয়ে গেল।

সায়ন বুঝলেন, বিষয়টি বড়।

পরদিন তিনি গ্রামের কৃষকদের সঙ্গে কথা বললেন।

অনেকেই জানালেন, গত কয়েক মাস ধরে জমির ফলন কমে গেছে। পুকুরের মাছও মারা যাচ্ছে।

কেউ কারণ জানত না।

সায়ন সমস্ত তথ্য নিয়ে প্রশাসনের কাছে গেলেন।

তদন্ত শুরু হল।

কয়েকদিনের মধ্যেই ধরা পড়ল, গ্রামের বাইরে থাকা একটি কারখানা বর্জ্য শোধন না করে গোপনে পাইপের মাধ্যমে জলের খাল ও জমির দিকে পাঠাচ্ছিল।

বাঁশবনের কুঁড়েঘরটি ছিল সেই বর্জ্য পরিবহনের অস্থায়ী কেন্দ্র।

বাপনই প্রথম বিষয়টি দেখতে পেয়েছিল।

কিন্তু সে ভয়ে কাউকে বলতে পারেনি।

তদন্তের পর কারখানাটির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হল। দূষিত জমি ও জলাশয় পরিষ্কারের কাজ শুরু হল।

কয়েক মাস পরে বাঁশবনের পাশের খালটিতে আবার মাছ দেখা গেল।

ধানের জমিতেও সবুজ চারা উঠল।

একদিন স্কুলে সায়ন বাপনকে ডেকে বললেন,

“তুই না দেখলে আমরা কেউ জানতেই পারতাম না।”

বাপন মাথা নিচু করে বলল,

“আমি তো শুধু পায়ের ছাপ দেখেছিলাম।”

সায়ন হেসে বললেন,

“সেটাই তো বড় কথা। সবাই দেখে, কিন্তু সবাই প্রশ্ন করে না।”

কয়েকদিন পর গ্রামের মানুষ বাঁশবনের সেই পথটিকে পরিষ্কার করে দিল।

পথের শুরুতে একটি ছোট ফলক বসানো হল—

“প্রকৃতিকে রক্ষা করার পথ এখান থেকেই।”

সায়ন মাঝে মাঝে সেই পথে হাঁটেন।

বাঁশের পাতার ফাঁক দিয়ে যখন সূর্যের আলো মাটিতে পড়ে, তখন তার মনে হয়—একসময় যে পথটিকে সবাই ভয়ের বলে মনে করত, সেটিই আসলে গ্রামের মানুষকে সত্যের কাছে নিয়ে গিয়েছিল।

কারণ অন্ধকার জায়গা সবসময় ভয়ের হয় না।

কখনও কখনও অন্ধকারের মধ্যেই লুকিয়ে থাকে এমন একটি সত্য, যা সামনে এলে পুরো পৃথিবী একটু বেশি সবুজ হয়ে ওঠে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *