ব্রাহ্মণ পুরোহিত নয়, সাঁওতালি ভাষায় মন্ত্রপাঠে দেবী আরাধনা—ভাঙাদিঘীতে আজও অটুট ১৫০ বছরের ঐতিহ্য।

মালদা, নিজস্ব সংবাদদাতা:—- বাংলাদেশের মাটিতে শুরু হওয়া দুর্গাপূজা , দেশভাগের পর স্বপ্ন দেশ পেয়ে আদিবাসী নিয়ম মেনে পুজো চালিয়েছেন বর্তমানে বাবুলাল হাঁসদা। প্রায় ১৫০ বছরেরও বেশি প্রাচীন ঐতিহ্য আজও বয়ে নিয়ে চলেছে মালদহের হবিবপুরের ভাঙাদিঘী গ্রামের আদিবাসী দুর্গাপুজো। এখানে নেই প্রচলিত ব্রাহ্মণ পুরোহিতের মন্ত্রোচ্চারণ। আদিবাসী ভাষায় মন্ত্রপাঠ এবং নিজস্ব ধর্মীয় রীতিনীতি মেনেই আরাধনা করা হয় এই গ্রামে দেবী দুর্গার।দেশভাগের পর ভারতে চলে আসেন আদিবাসী সম্প্রদায়ের মানুষ বাবুলাল হাঁসদার পরিবারসহ বেশ কিছু পরিবার সে সময় এই গ্রামে ছিলনা সেভাবে ঘর বাড়ি এলাকায় জঙ্গলে ভরা ছিলো ভাঙ্গাদিঘি গ্রাম, সেখানেই স্বপ্ন দেশ পেয়ে ছিল এই আদিবাসী পরিবার তখন থেকে টিনের ছাউনির নীচে কোন ভাবে৷ দেবীর বেদি, আর গ্রামবাসীদের অগাধ বিশ্বাসকে সম্বল করেই বছরের পর বছর ধরে পুজো চালিয়ে যাছেন।

মালদার হবিবপুর ব্লকের কেন্দপুকুরের ভাঙাদিঘী গ্রাম।এই গ্রামের দুর্গাপুজোকে ঘিরে রয়েছে দীর্ঘ ইতিহাস। এই পুজোর মূল আকর্ষণ পুরোহিত ছাড়াই আদিবাসী নিজস্ব ভাষায় নিজেই পুজো করেন বাবুলাল হাঁসদা সমাজের নিজস্ব সংস্কৃতি, বিশ্বাস ও ধর্মীয় রীতিনীতি।যুগের পরিবর্তনের সাথে সাথে পুজোর দায়িত্ব এখন তুলে দিয়েছেন গ্রামবাসীর হাতে। এখন পুজো কমিটির দায়িত্ব পেয়েছেন আদিবাসী সর্বজনীন দুর্গাপূজা কমিটি।

বাবুলাল হাঁসদা বলেন,, অবিভক্ত ভারতের বর্তমান বাংলাদেশের নাচোল থানার হাকরোল গ্রামে তাদের পরিবারের পূর্বপুরুষ লব হাঁসদা এই পুজোর সূচনা করেছিলেন। জনশ্রুতি রয়েছে, দেবী দুর্গার স্বপ্নাদেশ পেয়ে ঘট পুজোর মাধ্যমে শুরু হয়েছিল মায়ের আরাধনা। পরবর্তীকালে দেশভাগের পর ভারতে চলে আসেন লব হাঁসদা। মালদার হবিবপুর ব্লকের কেন্দপুকুরের ভাঙাদিঘী গ্রামে বসবাস শুরু করলেও দেবী দুর্গার আরাধনা বন্ধ করেননি তিনি। সেই থেকেই প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে নিষ্ঠার সঙ্গে চলে আসছে এই পুজো।

এই দুর্গাপুজোর অন্যতম বিশেষত্ব হল আদিবাসী ভাষায় মন্ত্রোচ্চারণ। প্রচলিত প্রথায় ব্রাহ্মণ পুরোহিতের পরিবর্তে একজন প্রবীণ আদিবাসী নিজস্ব ধর্মীয় রীতিনীতি মেনে পুজোর দায়িত্ব পালন করেন। সাঁওতালি ভাষায় মন্ত্রপাঠের মাধ্যমে আহ্বান করা হয় দেবী দুর্গাকে। পুষ্পাঞ্জলি থেকে শুরু করে বিভিন্ন ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান—সবেতেই রয়েছে আদিবাসী সংস্কৃতির নিজস্ব ছাপ। এই পুজো শুধু ধর্মীয় উৎসব নয়, বরং আদিবাসী সমাজের নিজস্ব পরিচয় ও ঐতিহ্য সংরক্ষণেরও এক গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম।

গ্রামের প্রায় ২০০টি আদিবাসী পরিবারের আর্থিক সহযোগিতা ও সম্মিলিত উদ্যোগে অনুষ্ঠিত হয় এই পুজো। এখানে সকলের সহযোগিতায় তৈরি হচ্ছে নতুন পাকা মন্দির । একটি সাধারণ টিনের ছাউনির নীচে বেদিতে অধিষ্ঠিত হতেন দেবী দুর্গা। পুজোর পাঁচ দিন ধরে উৎসবের আবহে মেতে ওঠেন গ্রামের মানুষ। পাশাপাশি আয়োজন করা হয় পংক্তিভোজনের। সকলে একসঙ্গে বসে খাওয়াদাওয়া করেন, ভাগ করে নেন উৎসবের আনন্দ। এর মধ্য দিয়েই আরও দৃঢ় হয় পারস্পরিক সম্প্রীতি ও সামাজিক বন্ধন। এই প্রথমবার রাজ্য সরকারের এক লক্ষ টাকার চেক সাহায্য পেল এই পুজো কমিটি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *