আয়নার দোকানে অদ্ভুত নিয়ম।।

শহরের পুরোনো বাজারে একটি ছোট দোকান ছিল, যার নাম ‘আয়নাঘর’। দোকানের বাইরে কোনো বড় সাইনবোর্ড ছিল না। কাঠের দরজার ওপরে শুধু পিতলের অক্ষরে নামটি লেখা ছিল। দোকানের ভিতরে ছোট-বড় নানা আয়না সাজানো থাকত। কোনোটি গোল, কোনোটি চৌকো, কোনোটি আবার এমনভাবে বাঁকানো যে তাতে মুখ দেখলে মানুষকে অদ্ভুত লাগত।

দোকানটির মালিক ছিলেন অদ্বৈতবাবু। বয়স সত্তরের কাছাকাছি। তিনি খুব কম কথা বলতেন। তবে তাঁর দোকানে একটি অদ্ভুত নিয়ম ছিল। কেউ আয়না কিনতে এলে তিনি প্রথমে দাম বলতেন না। বরং একটি প্রশ্ন করতেন—

“আপনি আয়নায় কী দেখতে চান?”

কেউ বলত, নিজের মুখ। কেউ বলত, ঘরের সাজ। কেউ আবার হেসে বলত, নিজের সৌন্দর্য।

অদ্বৈতবাবু প্রত্যেকের উত্তর শুনে তারপর আয়না দেখাতেন।

একদিন সেই দোকানে এল রুদ্র নামে এক তরুণ। সে সদ্য কলেজ পাশ করেছে এবং একটি চাকরির সাক্ষাৎকারে ব্যর্থ হয়েছে। তার ধারণা, নিজের চেহারা ও ব্যক্তিত্ব আকর্ষণীয় নয় বলেই সে চাকরিটি পায়নি। তাই সে এমন একটি আয়না কিনতে চায়, যাতে নিজেকে আরও সুন্দর দেখায়।

দোকানে ঢুকেই সে বলল, “আমাকে এমন একটা আয়না দিন, যাতে আমাকে দেখতে ভালো লাগে।”

অদ্বৈতবাবু চশমার ওপর দিয়ে তার দিকে তাকালেন।

“তুমি নিজেকে এখন কেমন দেখো?”

রুদ্র একটু বিরক্ত হয়ে বলল, “যেমন আছি, তেমনই। কিন্তু অন্যদের চোখে ভালো দেখাতে চাই।”

বৃদ্ধ কোনো উত্তর দিলেন না। তিনি তাকে একটি লম্বা আয়নার সামনে দাঁড় করালেন। আয়নাটি ছিল সামান্য বাঁকানো। তাতে রুদ্রর মাথা একটু বড় আর শরীর ছোট দেখাচ্ছিল।

রুদ্র মুখ কুঁচকে বলল, “এটা কী! আমাকে তো অদ্ভুত দেখাচ্ছে।”

অদ্বৈতবাবু বললেন, “আয়নাটি মিথ্যে বলছে না। সে শুধু তোমাকে একটি বিশেষ দৃষ্টিকোণ থেকে দেখাচ্ছে।”

তারপর তিনি আরেকটি আয়না দেখালেন। তাতে রুদ্রর মুখের এক পাশ বেশি উজ্জ্বল, অন্য পাশ ছায়ায় ঢাকা।

“এবার কেমন?”

“এবারও ঠিক নয়।”

শেষে বৃদ্ধ একটি সাধারণ, সমতল আয়না সামনে ধরলেন। রুদ্র নিজের মুখ দেখল। সেখানে না অতিরিক্ত সৌন্দর্য, না কোনো বিকৃতি।

অদ্বৈতবাবু বললেন, “এই আয়নাটি তোমার চেহারা বদলাবে না। কিন্তু তুমি কীভাবে নিজেকে দেখছ, সেটা নিয়ে ভাবতে সাহায্য করতে পারে।”

রুদ্র এবার একটু শান্ত হল। সে জিজ্ঞেস করল, “আপনি কি বলতে চাইছেন, আমার চেহারায় কোনো সমস্যা নেই?”

“আমি তোমার চেহারা নিয়ে বিচার করতে বসিনি,” বৃদ্ধ বললেন। “আমি শুধু জানতে চাই, একটি সাক্ষাৎকারে ব্যর্থ হওয়ার পর তুমি কেন নিজের পুরো অস্তিত্বকেই ব্যর্থ ভাবছ?”

প্রশ্নটি শুনে রুদ্র থমকে গেল।

কিছুক্ষণ পরে সে বলল, “ওরা আমাকে কয়েকটি প্রশ্ন করেছিল। আমি উত্তর দিতে পারিনি। তারপর মনে হয়েছে, আমি কিছুই পারি না।”

অদ্বৈতবাবু দোকানের পেছন থেকে একটি পুরোনো খাতা বের করলেন। খাতার পাতায় বিভিন্ন মানুষের নামের পাশে ছোট ছোট বাক্য লেখা ছিল।

“এগুলো কী?” রুদ্র জানতে চাইল।

“বহু বছর ধরে দোকানে আসা মানুষের কিছু কথা লিখে রেখেছি,” বৃদ্ধ বললেন। “একজন একসময় পরীক্ষায় বারবার ব্যর্থ হয়েছিলেন। পরে তিনি নিজের পছন্দের কাজে দক্ষ হয়ে ওঠেন। আরেকজন ব্যবসায় ক্ষতি করে ভেঙে পড়েছিলেন। পরে নতুন করে হিসাব শিখে ছোট দোকান শুরু করেন। কেউ নিজের চেহারা নিয়ে অখুশি ছিলেন, কেউ অন্যের সাফল্য দেখে নিজেকে ছোট ভাবতেন।”

রুদ্র খাতাটি উল্টে-পাল্টে দেখল।

“তাহলে আপনি কি বলতে চাইছেন, সবাই একদিন সফল হয়?”

অদ্বৈতবাবু মাথা নাড়লেন। “না। সবাই যে একইভাবে সফল হবে, এমন প্রতিশ্রুতি দেওয়া যায় না। কিন্তু একটি ব্যর্থতা দিয়ে কারও সম্পূর্ণ মূল্য নির্ধারণ করাও ঠিক নয়।”

কথাগুলো রুদ্রর মনে গভীরভাবে দাগ কাটল।

সে সেদিন আয়না কিনে বাড়ি ফিরল। তবে আয়নাটি দিয়ে নিজের চেহারা পরীক্ষা করার বদলে সে প্রতিদিন সকালে নিজের প্রস্তুতির দিকে মন দিতে শুরু করল। সাক্ষাৎকারে যে প্রশ্নগুলির উত্তর দিতে পারেনি, সেগুলি লিখে রাখল। বন্ধুদের সঙ্গে অনুশীলন করল। নিজের দক্ষতা কোথায় বাড়াতে হবে, তা বোঝার চেষ্টা করল।

কয়েক মাস পরে আরেকটি চাকরির সাক্ষাৎকারের সুযোগ এল। এবারও সে সব প্রশ্নের উত্তর দিতে পারেনি, কিন্তু আগের চেয়ে অনেক ভালোভাবে নিজের ভাবনা প্রকাশ করতে পেরেছিল। কয়েক দিন পর সে জানতে পারল, চাকরিটি অন্য একজন পেয়েছেন।

খবরটি শুনে তার মন খারাপ হল। কিন্তু এবার সে নিজের চেহারা বা সামর্থ্যকে দোষ দিল না। বরং সাক্ষাৎকারের অভিজ্ঞতা থেকে পরেরবারের জন্য কিছু শিক্ষা লিখে রাখল।

সেদিন সন্ধ্যায় সে আবার ‘আয়নাঘর’-এ গেল।

“চাকরিটা পাইনি,” রুদ্র বলল।

অদ্বৈতবাবু শান্ত গলায় জিজ্ঞেস করলেন, “তাহলে আয়নাটা ফেরত দিতে এসেছ?”

রুদ্র হেসে ফেলল। “না। আয়নাটা ঠিকই আছে। শুধু বুঝেছি, আয়না আমার মুখ দেখাতে পারে, কিন্তু আমার ভবিষ্যৎ দেখাতে পারে না।”

বৃদ্ধের চোখে তৃপ্তির হাসি ফুটল।

রুদ্র চলে যাওয়ার পর অদ্বৈতবাবু দোকানের দরজার পাশে একটি নতুন বাক্য লিখে রাখলেন—

“নিজেকে দেখুন, কিন্তু একটি মুহূর্তের প্রতিচ্ছবিকে নিজের সম্পূর্ণ পরিচয় ভাববেন না।”

এরপর বহু মানুষ দোকানে এসে সেই বাক্যটি পড়তেন। কেউ হয়তো আয়না কিনতেন, কেউ কিনতেন না। কিন্তু অনেকেই কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে নিজের সঙ্গে একটু কথা বলে যেতেন।

আর অদ্বৈতবাবু জানতেন, তাঁর দোকানের সবচেয়ে মূল্যবান জিনিস কোনো আয়না নয়। সেটি হলো মানুষের নিজের সম্পর্কে নতুন করে ভাবতে শেখার সুযোগ।

শিক্ষা: একটি ব্যর্থতা, একটি প্রত্যাখ্যান বা অন্যের মতামত দিয়ে নিজের সম্পূর্ণ মূল্য বিচার করা উচিত নয়। নিজের দুর্বলতা স্বীকার করে উন্নতির চেষ্টা করা জরুরি, তবে নিজের প্রতি সম্মান হারিয়ে নয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *