যে গাছটি কারও ছায়া কেড়ে নেয়নি।।
শহরের মাঝখানে ছিল একটি বিশাল পুরোনো বটগাছ। তার শিকড় মাটির গভীরে নেমে গিয়েছিল, ডালপালা ছড়িয়ে পড়েছিল চারদিকে। গরমের দুপুরে রিকশাচালকরা তার নিচে বিশ্রাম নিতেন, স্কুলফেরত শিশুরা বসে গল্প করত, আর বিকেলে বয়স্ক মানুষদের আড্ডায় মুখর হয়ে উঠত গাছতলা।
কিন্তু শহর বদলাচ্ছিল। রাস্তা চওড়া করার পরিকল্পনা হল। নতুন বাজার, গাড়ি রাখার জায়গা আর আধুনিক দোকান তৈরি হবে। পরিকল্পনার মানচিত্রে বটগাছটির ঠিক মাঝখান দিয়ে একটি নতুন রাস্তা চলে গেছে।
খবরটি ছড়িয়ে পড়তেই শহরের মানুষ দুই ভাগে ভাগ হয়ে গেলেন। একদল বললেন, উন্নয়নের জন্য পুরোনো গাছ কাটতেই হবে। অন্য দল বললেন, গাছটি বাঁচানো জরুরি। কিন্তু কেউই এমন কোনো সমাধান দিতে পারছিলেন না, যাতে রাস্তার প্রয়োজনও মেটে, আবার গাছটিও বেঁচে থাকে।
সেই শহরেই থাকত চৌদ্দ বছরের মেয়ে ইরা। তার বাবা ছিলেন বাসচালক। প্রতিদিন স্কুলে যাওয়ার পথে সে বটগাছটির নিচে দাঁড়িয়ে বাসের জন্য অপেক্ষা করত। গাছটির সঙ্গে তার কোনো বিশেষ আবেগের সম্পর্ক ছিল না, কিন্তু সে জানত, প্রচণ্ড গরমে ওই ছায়াটুকু কত মানুষের কাজে লাগে।
একদিন স্কুল থেকে ফিরে সে বাবাকে জিজ্ঞেস করল, “বাবা, রাস্তা কি একটু অন্য দিক দিয়ে করা যায় না?”
বাবা ক্লান্ত গলায় বললেন, “রাস্তা বানানো এত সহজ নয়। জমি, খরচ, নকশা—অনেক হিসাব থাকে।”
ইরা বলল, “তাহলে যারা নকশা করেছেন, তাঁদের কাছে অন্য নকশার কথা বলা যায় না?”
বাবা মেয়ের দিকে তাকিয়ে হেসে ফেললেন। “বলতে তো পারিস। তবে শুধু ইচ্ছা থাকলেই হবে না, যুক্তিও দেখাতে হবে।”
কথাটা ইরার মনে রইল।
পরদিন সে স্কুলের গ্রন্থাগারে গিয়ে রাস্তা নির্মাণ ও শহরের পরিকল্পনা নিয়ে কয়েকটি বই খুঁজল। সবকিছু সে বুঝতে পারল না, কিন্তু একটা বিষয় বুঝল—রাস্তার নকশা তৈরি করার সময় পথচারী, যানবাহন, জমির ব্যবহার এবং আশপাশের পরিবেশের কথা বিবেচনা করা হয়।
সে নিজের খাতায় বটগাছটির চারপাশের রাস্তা এঁকে দেখল। তারপর কয়েকজন সহপাঠীকে নিয়ে দিনের বিভিন্ন সময়ে সেখানে মানুষের চলাচল পর্যবেক্ষণ করল। তারা গাড়ির সংখ্যা গুনল, পথচারীদের চলার দিক লক্ষ করল এবং কোন জায়গায় যানজট বেশি হয় তা লিখে রাখল। কোনো গাড়ির নম্বর বা ব্যক্তিগত তথ্য তারা সংগ্রহ করল না।
কয়েক দিন পর ইরা তার ভূগোলের শিক্ষককে সব দেখাল।
শিক্ষক মন দিয়ে খাতাটি দেখে বললেন, “তোমরা ভালো কাজ করেছ। তবে এই তথ্য দিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া যাবে না। রাস্তার প্রকৌশলগত দিক, জমির সীমানা, নিরাপত্তা—এসব বিশেষজ্ঞদের পরীক্ষা করতে হবে।”
ইরা বলল, “আমরা কি আমাদের পর্যবেক্ষণগুলো পৌরসভাকে জানাতে পারি?”
শিক্ষক সম্মতি দিলেন।
পৌরসভার একটি উন্মুক্ত সভায় ইরা তার খাতা নিয়ে উপস্থিত হল। প্রথমে কর্মকর্তারা একটু অবাক হয়েছিলেন। এত ছোট একটি মেয়ে রাস্তার পরিকল্পনা নিয়ে কথা বলতে এসেছে!
ইরা মঞ্চে উঠে বলল, “আমি বলছি না যে রাস্তা তৈরি করা উচিত নয়। শহরের উন্নয়ন দরকার। কিন্তু উন্নয়ন করতে গিয়ে আমরা যদি এমন কিছু হারাই, যার উপকার প্রতিদিন অনেক মানুষ পায়, তাহলে অন্য সম্ভাবনাগুলোও পরীক্ষা করা উচিত।”
সে নিজের আঁকা মানচিত্র দেখাল। একটি বিকল্প নকশায় রাস্তার বাঁক সামান্য বদলানো হয়েছে, আরেকটিতে পথচারীদের জন্য আলাদা জায়গা রাখার প্রস্তাব রয়েছে। সে এটাও স্পষ্ট করে দিল যে, এগুলি তার প্রাথমিক ধারণা, অনুমোদিত প্রকৌশলগত পরিকল্পনা নয়।
সভায় উপস্থিত একজন প্রকৌশলী নকশাগুলি দেখে বললেন, “এই বিকল্পগুলির মধ্যে কয়েকটি পরীক্ষা করা যেতে পারে। তবে জমির অবস্থান ও যান চলাচলের নিরাপত্তা বিচার করে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।”
কাজ শুরু হল নতুন করে সমীক্ষা করার। প্রকৌশলীরা দেখলেন, রাস্তার একটি অংশ সামান্য ঘুরিয়ে দিলে বটগাছটির প্রধান শিকড়ের এলাকা এড়ানো সম্ভব। তবে তার জন্য একটি পুরোনো নর্দমা সরাতে হবে এবং পাশের মোড়ে যানবাহন চলাচলের ব্যবস্থা বদলাতে হবে। খরচও কিছুটা বাড়বে।
পৌরসভা সব দিক বিচার করে সংশোধিত নকশা গ্রহণ করল। রাস্তা তৈরি হল, কিন্তু বটগাছটি কাটা পড়ল না। গাছের শিকড় যাতে ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, সে জন্য কাজের সময় বিশেষ সতর্কতা নেওয়া হল। গাছটির চারপাশে উপযুক্ত খোলা মাটিও রাখা হল।
কাজ শেষ হওয়ার দিন শহরের মানুষ বটগাছটির নিচে দাঁড়িয়ে নতুন রাস্তা দেখছিলেন। বাস চলছিল, দোকান খুলেছিল, পথচারীরাও চলাচল করছিলেন। গাছের ছায়ায় বসে এক বৃদ্ধ বললেন, “দেখো, উন্নয়নও হল, গাছটাও রয়ে গেল।”
ইরা পাশে দাঁড়িয়ে শুনছিল। তার মনে হচ্ছিল, সে কোনো অসাধারণ কাজ করেনি। শুধু একটি প্রশ্ন তুলেছিল, আর সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে অনেক মানুষ একসঙ্গে কাজ করেছেন।
কয়েক মাস পরে গরমের এক দুপুরে ইরা স্কুল থেকে ফিরছিল। বটগাছটির নিচে এক নতুন বাসচালক গাড়ি থামিয়ে জল খাচ্ছিলেন। দুজন শ্রমিক বিশ্রাম নিচ্ছিলেন। কয়েকটি শিশু ছায়ায় দাঁড়িয়ে আইসক্রিম খাচ্ছিল।
ইরা গাছটির দিকে তাকিয়ে হাসল।
তার মনে হল, কিছু সিদ্ধান্তের মূল্য শুধু আজকের সুবিধায় বোঝা যায় না। কখনো কখনো একটি গাছ বাঁচানো মানে বহু অচেনা মানুষের আগামী দিনের একটু স্বস্তি বাঁচিয়ে রাখা।
বটগাছটি কিছু বলল না। তার পাতাগুলি বাতাসে দুলল, আর তার ছায়া নিঃশব্দে সবার জন্য ছড়িয়ে রইল।
শিক্ষা: উন্নয়ন ও প্রকৃতি সব সময় পরস্পরের শত্রু নয়। তথ্য, যুক্তি, বিশেষজ্ঞের পরামর্শ এবং বিকল্প সমাধান খোঁজার মানসিকতা থাকলে অনেক সময় এমন পথ তৈরি করা যায়, যাতে মানুষের প্রয়োজন মেটে, আবার পরিবেশের মূল্যবান সম্পদও রক্ষা পায়।

