শীতের মরশুমে সর্দি-কাশি ও ভাইরাসের সংক্রমণ থেকে কীভাবে বাঁচবেন? সুস্থ থাকতে মেনে চলুন ১০টি জরুরি নিয়ম।

শীতের আগমন যত এগিয়ে আসছে, ততই আবহাওয়ায় পরিবর্তন স্পষ্ট হচ্ছে। ভোরের ঠান্ডা হাওয়া, সন্ধ্যার তাপমাত্রা কমে যাওয়া এবং বাতাসের শুষ্কতা আমাদের দৈনন্দিন জীবনযাত্রায় প্রভাব ফেলছে। এই সময়ে অনেকের সর্দি, কাশি, গলাব্যথা, জ্বর কিংবা নাক বন্ধ হওয়ার মতো সমস্যা দেখা দেয়। বিশেষ করে শিশু, বয়স্ক মানুষ এবং যাঁদের আগে থেকেই হাঁপানি বা অন্য কোনও দীর্ঘস্থায়ী রোগ রয়েছে, তাঁদের বাড়তি সতর্ক থাকা প্রয়োজন।

তবে মনে রাখতে হবে, ঠান্ডা আবহাওয়া নিজে সরাসরি সর্দি-কাশি সৃষ্টি করে না। সাধারণ সর্দি মূলত বিভিন্ন ভাইরাসের সংক্রমণে হয়। শীতকালে মানুষ অনেক সময় বন্ধ ঘরে বেশি সময় কাটান, ফলে কাছাকাছি অবস্থানের কারণে কিছু শ্বাসযন্ত্রের ভাইরাস ছড়ানোর সুযোগ বাড়তে পারে।

তাই শীতের মরশুমে সুস্থ থাকতে শুধু গরম পোশাক পরলেই হবে না। পরিচ্ছন্নতা, সঠিক খাদ্যাভ্যাস, পর্যাপ্ত ঘুম এবং সংক্রমণ প্রতিরোধের কিছু সহজ নিয়ম মেনে চলাও জরুরি।

১. নিয়মিত সাবান দিয়ে হাত ধুয়ে নিন

ভাইরাস ও অন্যান্য জীবাণুর সংক্রমণ প্রতিরোধের অন্যতম সহজ উপায় হলো সঠিকভাবে হাত ধোয়া। বাইরে থেকে বাড়ি ফিরে, খাবার খাওয়ার আগে, শৌচাগার ব্যবহারের পরে এবং কাশি বা হাঁচির পরে সাবান দিয়ে হাত ধুয়ে নিন।

কমপক্ষে ২০ সেকেন্ড ধরে হাতের তালু, হাতের পিঠ, আঙুলের ফাঁক এবং নখের চারপাশ পরিষ্কার করুন। সাবান ও জল না থাকলে উপযুক্ত অ্যালকোহলযুক্ত হ্যান্ড স্যানিটাইজার ব্যবহার করতে পারেন।

অপরিষ্কার হাতে বারবার চোখ, নাক ও মুখ স্পর্শ করার অভ্যাস কমান। কারণ হাতের মাধ্যমে কিছু জীবাণু শরীরে প্রবেশ করতে পারে। বাড়ির শিশুদেরও ছোটবেলা থেকে হাত ধোয়ার অভ্যাস শেখানো উচিত।

২. কাশি ও হাঁচির সময় সতর্ক থাকুন

কাশি বা হাঁচির সময় মুখ ও নাক থেকে ক্ষুদ্র জলকণা বাতাসে ছড়িয়ে পড়তে পারে। এর মাধ্যমে কিছু শ্বাসযন্ত্রের ভাইরাস অন্য মানুষের শরীরে প্রবেশ করতে পারে।

তাই কাশি বা হাঁচির সময় টিস্যু কিংবা কনুইয়ের ভাঁজ দিয়ে মুখ ও নাক ঢেকে রাখুন। ব্যবহৃত টিস্যু ঢাকনাযুক্ত ডাস্টবিনে ফেলে দিন এবং পরে হাত পরিষ্কার করুন।

জ্বর, সর্দি বা কাশি থাকলে সম্ভব হলে অন্যদের কাছ থেকে কিছুটা দূরত্ব বজায় রাখুন। ভিড়ের মধ্যে যাওয়া এড়িয়ে চলুন। বাইরে যাওয়া প্রয়োজন হলে, বিশেষ করে অসুস্থ অবস্থায় বা ঝুঁকিপূর্ণ মানুষের কাছাকাছি থাকলে, ভালোভাবে ফিট করা মাস্ক ব্যবহার করা উপকারী হতে পারে।

৩. ঘরের মধ্যে বাতাস চলাচলের ব্যবস্থা রাখুন

শীত পড়লে অনেকেই ঠান্ডা এড়াতে দরজা-জানালা দীর্ঘ সময় বন্ধ রাখেন। কিন্তু বদ্ধ ঘরে অনেক মানুষের উপস্থিতি থাকলে শ্বাসের মাধ্যমে ছড়ানো কিছু ভাইরাসের সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়তে পারে।

আবহাওয়া ও বাইরের বায়ুর মান অনুকূল থাকলে প্রতিদিন কিছু সময় জানালা খুলে ঘরে তাজা বাতাস চলাচলের ব্যবস্থা করুন। অফিস, স্কুল কিংবা অন্যান্য জনসমাগমস্থলেও বায়ু চলাচলের উপযুক্ত ব্যবস্থা গুরুত্বপূর্ণ।

বাইরে বায়ুদূষণ বেশি থাকলে জানালা খোলার সময় পরিস্থিতি বিবেচনা করুন। ঘরের বাতাস পরিষ্কার রাখার জন্য প্রয়োজনে উপযুক্ত এয়ার পিউরিফায়ার ব্যবহার করা যেতে পারে। তবে কোনও যন্ত্রই পরিচ্ছন্নতা, বায়ু চলাচল এবং অসুস্থ অবস্থায় সতর্ক থাকার বিকল্প নয়।

৪. শরীরের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে সুস্থ রাখুন

শরীরের স্বাভাবিক রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা ঠিকভাবে কাজ করার জন্য পর্যাপ্ত পুষ্টি প্রয়োজন। প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় শাকসবজি, ফল, ডাল, ডিম, মাছ, দুধ অথবা উপযুক্ত বিকল্প এবং অন্যান্য পুষ্টিকর খাবার রাখুন।

পেয়ারা, আমলকি, কমলালেবু, গাজর, পালং শাক ও অন্যান্য মরশুমি খাবার থেকে বিভিন্ন ভিটামিন ও খনিজ পাওয়া যায়। পর্যাপ্ত প্রোটিন শরীরের কোষ ও রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থার স্বাভাবিক কার্যকারিতার জন্যও গুরুত্বপূর্ণ।

তবে কোনও একটি খাবার খেলে সর্দি-কাশি সম্পূর্ণ প্রতিরোধ করা যায় না। চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া অতিরিক্ত ভিটামিন, মিনারেল বা অন্য কোনও সাপ্লিমেন্ট খাওয়ারও প্রয়োজন নেই। সুষম খাদ্যাভ্যাসের পাশাপাশি ঘুম, ব্যায়াম ও পরিচ্ছন্নতার দিকেও নজর দিন।

৫. পর্যাপ্ত ঘুমান এবং শরীরকে বিশ্রাম দিন

ঘুমের অভাব শরীরের স্বাভাবিক কার্যকারিতা ও রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থার উপর প্রভাব ফেলতে পারে। তাই শীতকালে রাত জেগে কাজ করা বা দীর্ঘ সময় মোবাইল ব্যবহার করার অভ্যাস কমিয়ে আনুন।

প্রাপ্তবয়স্কদের সাধারণত প্রতি রাতে সাত থেকে নয় ঘণ্টা ঘুমের প্রয়োজন হয়। প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময়ে ঘুমাতে যাওয়া এবং সকালে ওঠার অভ্যাস তৈরি করুন।

অসুস্থ হয়ে পড়লে শরীরকে পর্যাপ্ত বিশ্রাম দিন। জ্বর বা দুর্বলতা নিয়ে অতিরিক্ত পরিশ্রম করলে সুস্থ হতে বেশি সময় লাগতে পারে। পর্যাপ্ত জল পান করুন এবং শরীরের অবস্থার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে দৈনন্দিন কাজ করুন।

৬. ঠান্ডার উপযোগী পোশাক পরুন

সকাল ও সন্ধ্যায় তাপমাত্রা কমে গেলে গরম পোশাক ব্যবহার করুন। বিশেষ করে শিশু ও বয়স্কদের ক্ষেত্রে শরীর যেন অতিরিক্ত ঠান্ডায় অস্বস্তিতে না পড়ে, সেদিকে নজর রাখুন।

বাইরে যাওয়ার সময় আবহাওয়া অনুযায়ী সোয়েটার, জ্যাকেট, মোজা বা চাদর ব্যবহার করতে পারেন। ভিজে পোশাক দ্রুত বদলে শুকনো পোশাক পরুন।

তবে মনে রাখবেন, গরম পোশাক শরীরকে আরামদায়ক রাখে, কিন্তু ভাইরাসের সংক্রমণ পুরোপুরি আটকাতে পারে না। সংক্রমণ প্রতিরোধে হাত ধোয়া, বায়ু চলাচল, প্রয়োজন অনুযায়ী মাস্ক ব্যবহার এবং অসুস্থ মানুষের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সংস্পর্শ কমানো বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

৭. পর্যাপ্ত জল পান করুন

শীতকালে তৃষ্ণা কম অনুভূত হলেও শরীরের জলীয় চাহিদা বজায় রাখা জরুরি। জল শরীরের স্বাভাবিক কার্যকলাপ এবং হজম প্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

দিনভর নিয়মিত জল পান করুন। সাধারণ জল, হালকা উষ্ণ জল কিংবা চিনি ছাড়া স্যুপ খেতে পারেন। সর্দি বা জ্বর হলে শরীরের তরলের চাহিদা বেড়ে যেতে পারে, বিশেষ করে ঘাম বা জ্বরের কারণে জল হারালে।

গলাব্যথা থাকলে আরামদায়ক উষ্ণ পানীয় সাময়িক স্বস্তি দিতে পারে। তবে খুব গরম জল বা পানীয় পান করবেন না। যাঁদের চিকিৎসক তরল গ্রহণ সীমিত করতে বলেছেন, তাঁরা চিকিৎসকের নির্দেশ মেনে চলুন।

৮. প্রয়োজনীয় টিকা নেওয়ার বিষয়ে সচেতন থাকুন

কিছু ভাইরাসজনিত শ্বাসযন্ত্রের সংক্রমণ প্রতিরোধে টিকা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। বিশেষ করে ইনফ্লুয়েঞ্জার মতো সংক্রমণের ক্ষেত্রে বয়স, স্বাস্থ্যগত অবস্থা ও ব্যক্তিগত ঝুঁকি অনুযায়ী টিকা নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হতে পারে।

শিশু, বয়স্ক এবং দীর্ঘস্থায়ী অসুখে আক্রান্ত ব্যক্তিদের প্রয়োজনীয় টিকা সম্পর্কে চিকিৎসকের সঙ্গে কথা বলা উচিত। কোভিড-১৯ বা অন্যান্য সংক্রমণের ক্ষেত্রে প্রচলিত নির্দেশিকা ও ব্যক্তিগত স্বাস্থ্যগত অবস্থার ভিত্তিতে পরামর্শ নিন।

কোনও টিকাই সব ধরনের সর্দি-কাশি প্রতিরোধ করে না। তবে উপযুক্ত টিকা নির্দিষ্ট সংক্রমণের ঝুঁকি বা গুরুতর অসুস্থতার আশঙ্কা কমাতে সাহায্য করতে পারে।

৯. নিজে থেকে অ্যান্টিবায়োটিক খাবেন না

সর্দি-কাশি শুরু হলেই অনেকেই চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া অ্যান্টিবায়োটিক খেতে শুরু করেন। এটি একটি ভুল অভ্যাস।

সাধারণ সর্দি-কাশির অধিকাংশই ভাইরাসজনিত। অ্যান্টিবায়োটিক ব্যাকটেরিয়ার বিরুদ্ধে কাজ করে, ভাইরাসের বিরুদ্ধে নয়। অপ্রয়োজনীয় অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারে পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হতে পারে এবং ভবিষ্যতে অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধী ব্যাকটেরিয়া তৈরি হওয়ার সমস্যা বাড়তে পারে।

সর্দি হলে বিশ্রাম, পর্যাপ্ত তরল এবং প্রয়োজনে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী উপসর্গের চিকিৎসা করা যেতে পারে। শিশুদের ক্ষেত্রে নিজে থেকে কাশি-সর্দির ওষুধ দেওয়ার আগে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া বিশেষভাবে জরুরি।

১০. বিপদের লক্ষণ চিনুন এবং সময়মতো চিকিৎসা নিন

সাধারণ সর্দি-কাশি অনেক সময় কয়েক দিনের মধ্যে ধীরে ধীরে ভালো হয়ে যায়। কিন্তু কিছু লক্ষণ দেখা দিলে অবহেলা করা উচিত নয়।

নিচের সমস্যাগুলি হলে দ্রুত চিকিৎসা নিন:

  • শ্বাস নিতে কষ্ট হওয়া বা শ্বাসকষ্ট বেড়ে যাওয়া।
  • বুকে ব্যথা বা চাপ অনুভব করা।
  • শরীরে জলের ঘাটতির লক্ষণ দেখা দেওয়া।
  • জ্বর দীর্ঘস্থায়ী হওয়া বা কমে যাওয়ার পর আবার বেড়ে যাওয়া।
  • কাশি ক্রমশ বাড়তে থাকা বা দীর্ঘদিন স্থায়ী হওয়া।
  • শিশু, বয়স্ক বা দীর্ঘস্থায়ী অসুখে আক্রান্ত ব্যক্তির স্বাস্থ্যের দ্রুত অবনতি হওয়া।

তীব্র শ্বাসকষ্ট, অজ্ঞান হয়ে যাওয়া বা বুকে প্রচণ্ড ব্যথা হলে জরুরি চিকিৎসা নিন। গুরুতর উপসর্গ দেখা দিলে ঘরোয়া চিকিৎসার উপর নির্ভর করে সময় নষ্ট করবেন না।

উপসংহার

শীতের মরশুমে সর্দি-কাশি ও ভাইরাসের সংক্রমণ থেকে সতর্ক থাকতে হলে দৈনন্দিন জীবনে কয়েকটি সহজ অভ্যাস গড়ে তোলা দরকার। নিয়মিত হাত ধোয়া, কাশি-হাঁচির সময় মুখ ঢেকে রাখা, ঘরে বাতাস চলাচলের ব্যবস্থা, পুষ্টিকর খাবার, পর্যাপ্ত ঘুম এবং প্রয়োজনীয় টিকা—সবকটিই সুস্থ থাকার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ।

সর্দি-কাশি হলেই আতঙ্কিত হওয়ার প্রয়োজন নেই, আবার সমস্যাকে অবহেলাও করা উচিত নয়। নিজের শরীরের লক্ষণ বুঝুন, অসুস্থ হলে অন্যদের সুরক্ষার কথা ভাবুন এবং প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসকের সাহায্য নিন।

মনে রাখবেন, সুস্থ থাকা কোনও এক দিনের কাজ নয়। প্রতিদিনের ছোট ছোট সচেতন অভ্যাসই আপনাকে এবং আপনার পরিবারকে শীতের মরশুমে আরও নিরাপদ ও সুস্থ থাকতে সাহায্য করতে পারে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *