প্রতিশ্রুতির ভিড়ে হারিয়ে যাওয়া এক পরিবারের লড়াই।

জলপাইগুড়ি, নিজস্ব সংবাদদাতা:- হাতেগোনা আর কয়েকটা দিন—তারপরেই ভোট। চারদিক এখন মাইক, মিছিল আর প্রতিশ্রুতির ঝড়ে সরগরম। রাজনৈতিক উত্তেজনার এই চরম মুহূর্তে উন্নয়নের বড় বড় দাবিতে ভরে উঠছে সভা-মঞ্চ। কিন্তু সেই কোলাহলের মাঝেই নিঃশব্দে বয়ে চলেছে এক পরিবারের টিকে থাকার লড়াই—যা চোখে জল এনে দেয়, মনকে ভারী করে তোলে।

জলপাইগুড়ি জেলার মাল ব্লকের ওদলাবাড়ি হিন্দি স্কুল সংলগ্ন ঈদগাহ ময়দানের পাশে এক কোণে দাঁড়িয়ে আছে একটি ভাঙাচোরা আশ্রয়। ঘর বললেও যেন কম বলা হয়—বাঁশের বেড়া, ছেঁড়া ত্রিপল আর অস্থায়ী ছাউনি দিয়ে কোনোমতে টিকে থাকা। সেখানেই স্ত্রী-সন্তানকে নিয়ে বসবাস করেন ফয়জুদ্দিন—একজন দিনমজুর, যার আয় মানেই দিন এনে দিন খাওয়া।

কিন্তু ভাগ্য যেন আরও কঠিন পরীক্ষা নিয়েছে। অসুস্থ হয়ে পড়ায় কাজ করার ক্ষমতা প্রায় হারিয়েছেন তিনি। ফলে থমকে গেছে সংসারের একমাত্র আয়ের পথ। এখন একবেলা খাবার জোটে তো আরেকবেলার চিন্তা তাড়া করে ফেরে। অনিশ্চয়তার এই চক্রে দিন কাটছে চরম কষ্টে।

দুর্দশার এখানেই শেষ নয়। চারদিকে সরকারি প্রকল্পের কথা শোনা গেলেও, তাদের ভাগ্যে জোটেনি একটি পাকা ঘর। নেই শৌচালয়ের মতো ন্যূনতম সুবিধাও। প্রতিদিন প্রাকৃতিক প্রয়োজনে দূরে যেতে বাধ্য হন পরিবারের সদস্যরা। আধুনিকতার এই সময়ে দাঁড়িয়ে এমন বাস্তবতা যেন এক নির্মম প্রশ্ন ছুঁড়ে দেয়—উন্নয়নের আলো কি সত্যিই পৌঁছেছে সবার ঘরে?

ফয়জুদ্দিনের জামাই ফিরোজ আলমের কথায় ধরা পড়ে দীর্ঘদিনের হতাশা—
“আমার বিয়ে হয়েছে ছয় বছর আগে। তখন যেমন অবস্থায় ওদের দেখেছি, আজও ঠিক তেমনই আছে। এত প্রকল্প থাকার পরও একটা ঘরও পায়নি ওরা। এটা সত্যিই দুঃখজনক।”

পরিবারের অভিযোগ, ভোট এলেই বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা-নেত্রীরা আসেন, প্রতিশ্রুতি দেন। “এই হবে, সেই হবে”—এই আশ্বাসে ভরে ওঠে চারপাশ। কিন্তু ভোট মিটে গেলে সেই প্রতিশ্রুতিগুলো মিলিয়ে যায়। থেকে যায় শুধু অপেক্ষা আর বঞ্চনা।

স্থানীয় পঞ্চায়েত সদস্য মোহাম্মদ সাইনুল কে ফোন করলে তিনি সাংবাদিক জানিয়েছেন, একবার প্লাস্টিক দিয়ে সাহায্য করা হয়েছিল। পাশাপাশি আশ্বাস দিয়েছেন, ভোটের পর ঘর পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে এবং তালিকায় নামও আছে। তবে সেই “সম্ভাবনা” কবে বাস্তবে রূপ নেবে, সেটাই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।

রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বারবার বলেছেন কোরআন, বাইবেল শেষ হয়ে যাবে, কিন্তু আমার প্রকল্প শেষ হবে না। ”দেখুন ভিডিওটি,কিন্তু ওদলাবাড়ির এই পরিবারের দিকে তাকালে সেই কথার বাস্তবতা নিয়ে প্রশ্ন উঠতেই পারে।

ভোটের উত্তাপে যখন রাজনীতি তুঙ্গে, তখন এই নিঃশব্দ সংগ্রাম যেন আমাদের মনে করিয়ে দেয়
উন্নয়নের আলো এখনো পৌঁছয়নি অনেক ঘরে। প্রতিশ্রুতি আর বাস্তবতার এই ফারাকই আজকের সবচেয়ে বড় কষ্টের কথা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *