হারিয়ে যাওয়া রঙের শহরে শেষ ট্রাম।
কলকাতার পুরোনো পাড়াটার নাম ছিল শ্যামবাজারের কাছাকাছি আনন্দপল্লি। একসময় এই পাড়ার রাস্তায় সকাল থেকে রাত পর্যন্ত মানুষের ভিড় লেগে থাকত। রাস্তার দুপাশে পুরোনো বাড়ি, ছোট ছোট দোকান, চায়ের ঠেক আর মাথার ওপর দিয়ে চলে যাওয়া বৈদ্যুতিক তার—সব মিলিয়ে পাড়াটার নিজস্ব একটা চরিত্র ছিল।
সেই রাস্তা দিয়েই প্রতিদিন ধীরগতিতে চলত একটি ট্রাম। ট্রামটির গায়ের রং বহুবার বদলেছে, কাঠের আসনগুলিও পুরোনো হয়েছে, তবু তার ঘণ্টার পরিচিত শব্দ শুনলে পাড়ার অনেকের মুখে হাসি ফুটত।
কিন্তু সময় বদলাচ্ছিল। দ্রুতগামী বাস, অটো আর গাড়ির ভিড়ে ট্রামের যাত্রীর সংখ্যা কমে গিয়েছিল। একদিন খবর এল, এই রুটের ট্রাম পরিষেবা বন্ধ হয়ে যেতে পারে।
খবরটি শুনে পাড়ার অনেকেই বিশেষ মাথা ঘামালেন না। তাঁদের মতে, শহরে দ্রুত চলাচলের জন্য আধুনিক পরিবহণের প্রয়োজন। পুরোনো ট্রাম নিয়ে আবেগ দেখিয়ে লাভ নেই।
কিন্তু সতেরো বছরের অয়ন খবরটি শুনে অদ্ভুতভাবে মন খারাপ করল।
তার দাদু হরিদাসবাবু একসময় ট্রাম চালাতেন। অবসরের পর তিনি প্রায়ই নাতিকে ট্রামের গল্প শোনাতেন—কীভাবে বৃষ্টির দিনে যাত্রীরা জানালার কাচ মুছে বাইরে তাকাতেন, কীভাবে স্কুলফেরত ছেলেমেয়েরা নির্দিষ্ট স্টপেজে নেমে দৌড়ে বাড়ি যেত, আর কীভাবে ট্রামের ধীর গতি শহরের মানুষকে একটু থামতে শেখাত।
অয়ন ছোটবেলায় দাদুর সঙ্গে ট্রামে চড়েছে। তার মনে আছে, দাদু তাকে জানালার পাশে বসিয়ে বলতেন, “শহরকে চিনতে হলে শুধু গন্তব্য দেখলে হবে না, পথটাকেও দেখতে হবে।”
এখন সেই পথটাই হারিয়ে যেতে বসেছে।
এক সন্ধ্যায় অয়ন দাদুকে বলল, “ট্রামটা বন্ধ হয়ে গেলে কি সবাই ভুলে যাবে যে এই রাস্তায় একসময় ট্রাম চলত?”
হরিদাসবাবু জানালার বাইরে তাকিয়ে বললেন, “মানুষ সব কিছু ভুলে যায় না। তবে স্মৃতিকে বাঁচিয়ে রাখতে কেউ না কেউ উদ্যোগী না হলে অনেক গল্প হারিয়ে যায়।”
কথাটা অয়নের মনে গেঁথে গেল।
পরদিন সে কয়েকজন বন্ধুকে নিয়ে ট্রামের রুট ধরে হাঁটতে বেরোল। তাদের উদ্দেশ্য ছিল, ট্রামটির সঙ্গে জড়িয়ে থাকা মানুষের গল্প সংগ্রহ করা। তারা প্রথমে গেল রাস্তার মোড়ের পুরোনো চায়ের দোকানে।
দোকানদার মদনকাকু তাদের দেখে হেসে বললেন, “ট্রামের গল্প শুনতে এসেছ? এই ট্রামের জন্যই তো আমার দোকানে কত মানুষ আসত! অফিস যাওয়ার আগে কেউ এক কাপ চা খেত, কেউ ফেরার পথে বিস্কুট কিনত। ট্রাম দাঁড়ালে আমার দোকানেও যেন একটু প্রাণ আসত।”
তারপর তারা গেল এক বৃদ্ধার কাছে। তাঁর নাম শৈলবালা দেবী। তিনি বহু বছর ধরে ওই রুটে ট্রামে চড়ে বাজারে যেতেন।
বৃদ্ধা বললেন, “আমার স্বামী বেঁচে থাকতে আমরা দুজনে ট্রামে করে গঙ্গার দিকে যেতাম। জানালার পাশে বসে কত গল্প করতাম! এখন তিনি নেই। আমি এখনও মাঝে মাঝে ট্রামে উঠি। মনে হয়, পুরোনো দিনগুলো একটু কাছে ফিরে আসে।”
অয়ন তাঁর কথাগুলো খাতায় লিখে নিল।
আরও কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলে তারা জানতে পারল, ট্রামটি শুধু যাতায়াতের মাধ্যম ছিল না। অনেকের কাছে তা ছিল শহরের দৈনন্দিন জীবনের অংশ। কারও প্রথম চাকরিতে যাওয়ার স্মৃতি, কারও কলেজে পড়তে যাওয়ার অভ্যাস, কারও আবার পরিবারের সঙ্গে কাটানো আনন্দের মুহূর্ত জড়িয়ে ছিল এই যানের সঙ্গে।
অয়ন বুঝল, ট্রাম নিয়ে মানুষের অনুভূতি শুধু অতীতের প্রতি টান নয়। এর সঙ্গে শহরের পরিবেশ, ঐতিহ্য এবং ধীরগতির গণপরিবহণের প্রশ্নও জড়িয়ে আছে।
তবে সে এটাও বুঝতে পারল, শুধু আবেগ দিয়ে কোনও পরিষেবা চালু রাখা যায় না। নিরাপত্তা, যাত্রীসংখ্যা, রক্ষণাবেক্ষণের খরচ এবং শহরের বর্তমান প্রয়োজন—সব দিক বিচার করা দরকার।
তাই অয়ন ও তার বন্ধুরা একটি পরিকল্পনা করল। তারা ট্রামের ইতিহাস নিয়ে একটি ছোট প্রদর্শনী করবে। সেখানে থাকবে পুরোনো ছবি, যাত্রীদের স্মৃতি, ট্রামকর্মীদের অভিজ্ঞতা এবং শহরের পরিবহণ নিয়ে তথ্য।
কিন্তু সমস্যাটা ছিল, তাদের কাছে পুরোনো ছবি খুব কম। অয়ন দাদুর কাছে সাহায্য চাইল।
হরিদাসবাবু আলমারির ওপরের তাক থেকে একটি টিনের বাক্স নামালেন। বাক্সের মধ্যে ছিল কয়েকটি সাদাকালো ছবি, পুরোনো পরিচয়পত্র, ট্রামকর্মীদের একটি দলগত ছবি এবং বহু বছর আগে পাওয়া একটি সম্মানপত্র।
একটি ছবিতে দেখা যাচ্ছিল, তরুণ হরিদাসবাবু ট্রামের সামনে দাঁড়িয়ে আছেন। পাশে আরও কয়েকজন কর্মী। ছবিটির পেছনে লেখা—‘নতুন রুট চালুর দিন’।
অয়ন ছবিটি হাতে নিয়ে বলল, “দাদু, তুমি তো ইতিহাসের অংশ!”
হরিদাসবাবু হেসে উঠলেন। “ইতিহাসের অংশ হওয়ার জন্য বিখ্যাত হতে হয় না। নিজের কাজটা ঠিকভাবে করলেও সময়ের গল্পে একটা জায়গা থেকে যায়।”
পরবর্তী কয়েক সপ্তাহ অয়ন ও তার বন্ধুরা নিরলসভাবে কাজ করল। কেউ ছবি সংগ্রহ করল, কেউ প্রবীণ যাত্রীদের সাক্ষাৎকার নিল, কেউ আবার ট্রামের ইতিহাস সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য তথ্য জোগাড় করল। তারা একটি বড় চার্টে পুরোনো রুটের মানচিত্র আঁকল এবং কোথায় কোথায় ট্রাম শহরের গুরুত্বপূর্ণ এলাকার সঙ্গে সংযোগ তৈরি করত, তা দেখাল।
অয়নের বন্ধু তিতলি বলল, “আমরা শুধু ট্রাম বাঁচানোর কথা বললে অনেকেই ভাবতে পারেন, আমরা পরিবর্তনের বিরোধী। তার চেয়ে দেখাই না, শহরের পরিবহণে ঐতিহ্য আর আধুনিকতার মধ্যে কীভাবে ভারসাম্য রাখা যায়?”
সবাই তার কথায় রাজি হলো।
তারা প্রদর্শনীর নাম দিল—‘শহরের স্মৃতির পথে’।
পাড়ার ক্লাবঘরে প্রদর্শনীটি শুরু হলো এক রবিবার সকালে। প্রথমে খুব বেশি মানুষ আসেননি। কিন্তু দুপুরের দিকে ভিড় বাড়তে লাগল। প্রবীণরা নিজেদের স্মৃতি খুঁজে পেলেন ছবিতে, তরুণেরা জানতে পারল এমন একটি পরিবহণের কথা, যার ইতিহাস তাদের অনেকেরই অজানা।
একটি ছবির সামনে দাঁড়িয়ে এক মধ্যবয়স্ক ব্যক্তি বললেন, “এই ট্রামেই আমি প্রথম চাকরির সাক্ষাৎকার দিতে গিয়েছিলাম। সেদিন খুব ভয় লাগছিল। ট্রামের জানালায় বসে বাইরে তাকাতে তাকাতে নিজেকে সামলেছিলাম।”
একজন স্কুলছাত্রী জিজ্ঞাসা করল, “ট্রাম কি বাসের চেয়ে কম ধোঁয়া তৈরি করে?”
অয়ন তাকে বোঝাল, বৈদ্যুতিক ট্রাম সরাসরি রাস্তায় ধোঁয়া ছাড়ে না। তবে তার পরিবেশগত সুবিধা নির্ভর করে বিদ্যুতের উৎস, যাত্রীসংখ্যা, রক্ষণাবেক্ষণ এবং অন্য পরিবহণের সঙ্গে তুলনার ওপর। কোনও পরিষেবা চালু রাখা উচিত কি না, তা তথ্য ও বাস্তব প্রয়োজন বিচার করেই ঠিক করা দরকার।
এই উত্তর শুনে পাশে দাঁড়ানো এক শিক্ষক বললেন, “তোমরা ভালো কাজ করেছ। তোমরা শুধু আবেগ দেখাওনি, প্রশ্নও তুলেছ।”
প্রদর্শনীর খবর স্থানীয় সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হলো। কয়েকজন পরিবহণ বিশেষজ্ঞও এসে প্রদর্শনী দেখলেন। তাঁরা বললেন, শহরের ঐতিহ্য সংরক্ষণের পাশাপাশি যাত্রীদের সুবিধা, নিরাপত্তা এবং আর্থিক বাস্তবতা নিয়ে আলোচনা হওয়া জরুরি।
অয়ন ও তার বন্ধুরা একটি আবেদনপত্র তৈরি করল। সেখানে তারা অন্ধভাবে সব পুরোনো রুট চালু রাখার দাবি জানাল না। বরং প্রস্তাব দিল, সম্ভাব্য রুটগুলির যাত্রীসংখ্যা ও পরিবহণের প্রয়োজন সমীক্ষা করা হোক, উপযুক্ত অংশে পরিষেবা উন্নত করার সম্ভাবনা দেখা হোক এবং শহরের ট্রাম-ঐতিহ্য সংরক্ষণের জন্য একটি স্থায়ী সংগ্রহশালা গড়ে তোলা হোক।
তারা আবেদনপত্রটি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে জমা দিল।
কয়েক দিন পর খবর এল, ট্রাম পরিষেবা নিয়ে পর্যালোচনা করা হবে। সঙ্গে সঙ্গে সব সমস্যার সমাধান হয়ে গেল না। ট্রামের ভবিষ্যৎ নিয়ে সিদ্ধান্তও তখনও চূড়ান্ত হয়নি। তবু আলোচনা শুরু হওয়াটাই অয়নদের কাছে বড় প্রাপ্তি ছিল।
এরই মধ্যে একদিন হরিদাসবাবু অয়নকে নিয়ে ট্রামে উঠলেন। বিকেলের আলো জানালা দিয়ে এসে আসনের ওপর পড়ছিল। ট্রাম ধীরে ধীরে এগিয়ে চলল পরিচিত রাস্তা ধরে।
দাদু বললেন, “দেখলি, সব সময় কোনও কিছু বাঁচানোর অর্থ তাকে আগের মতোই রেখে দেওয়া নয়। কখনও তাকে নতুনভাবে কাজে লাগাতে হয়, কখনও তার স্মৃতি সংরক্ষণ করতে হয়, আবার কখনও বাস্তবতার কারণে পরিবর্তন মেনে নিতে হয়।”
অয়ন বলল, “তাহলে আমরা যা করেছি, তা কি যথেষ্ট?”
হরিদাসবাবু তার দিকে তাকিয়ে বললেন, “কোনও উদ্যোগই সব সমস্যার সমাধান করে না। কিন্তু মানুষকে ভাবতে শেখায়, প্রশ্ন করতে শেখায়। সেটাও কম নয়।”
ট্রামটি একটি মোড় ঘুরল। রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা কয়েকজন শিশু হাত নাড়ল। চালক ঘণ্টা বাজিয়ে তাদের দিকে তাকিয়ে হাসলেন।
অয়নের মনে হলো, শহরের সৌন্দর্য শুধু নতুন উঁচু বাড়ি, দ্রুতগামী গাড়ি কিংবা ঝকঝকে রাস্তার মধ্যে নেই। সৌন্দর্য আছে পুরোনো অভিজ্ঞতার সঙ্গে নতুন চিন্তার কথোপকথনেও।
সেদিন বাড়ি ফিরে সে প্রদর্শনীর ছবিগুলো গুছিয়ে রাখল। দাদুর পুরোনো ছবিটি আলাদা করে একটি ফ্রেমে বাঁধিয়ে দিল। ফ্রেমের নিচে লিখল—
‘একটি শহর এগিয়ে যায় ভবিষ্যতের দিকে, কিন্তু তার অতীতকে বোঝার ক্ষমতাও সঙ্গে নিয়ে।’
কয়েক মাস পরে পাড়ার ক্লাবঘরে একটি স্থায়ী পরিবহণ-ঐতিহ্য কর্নার তৈরি হলো। সেখানে ট্রামের ছবি, রুটের মানচিত্র, কর্মীদের স্মৃতি এবং শহরের পরিবহণের পরিবর্তনের বিবরণ রাখা হলো। স্কুলের ছেলেমেয়েরা দল বেঁধে তা দেখতে আসত।
ট্রামের ভবিষ্যৎ নিয়ে বিতর্ক চলতেই থাকল। কেউ আধুনিক বাসব্যবস্থার পক্ষে মত দিলেন, কেউ নির্দিষ্ট রুটে ট্রামের সম্ভাবনা তুলে ধরলেন। কিন্তু অয়ন শিখেছিল, কোনও বিষয়ে সত্যিকারের ভালোবাসা মানে শুধু নিজের পছন্দের জিনিসকে আঁকড়ে থাকা নয়। তার গুরুত্ব বোঝা, সীমাবদ্ধতা স্বীকার করা এবং ভবিষ্যতের জন্য যুক্তিসংগত পথ খোঁজাও ভালোবাসার অংশ।
আর হরিদাসবাবু?
তিনি এখনও মাঝে মাঝে নাতির সঙ্গে ট্রামে চড়তেন। জানালার বাইরে তাকিয়ে পুরোনো দিনের গল্প বলতেন। অয়ন মন দিয়ে শুনত, কারণ সে জানত—একটি শহরের গল্প কেবল ইট-পাথরে লেখা থাকে না; মানুষের অভিজ্ঞতা, শ্রম আর স্মৃতির মধ্যেও তার ইতিহাস বেঁচে থাকে।
শিক্ষা: অতীতকে ভালোবাসা মানে পরিবর্তনকে অস্বীকার করা নয়। ঐতিহ্যকে বুঝে, বাস্তবতার বিচার করে এবং ভবিষ্যতের প্রয়োজনকে সম্মান জানিয়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়াই প্রকৃত সচেতনতার পরিচয়।

