ভাঙা আয়নার ওপারে।।
শহরের এক প্রান্তে ছিল ছোট্ট একটি ফটোগ্রাফির দোকান। দোকানটির নাম ‘আলোরেখা’। দোকানের মালিক অরুণাভবাবু বহু বছর ধরে মানুষের জীবনের বিশেষ মুহূর্তগুলো ক্যামেরায় ধরে রাখতেন। বিয়ে, জন্মদিন, স্কুলের অনুষ্ঠান—সবকিছুর ছবিই তিনি তুলতেন যত্ন করে। তাঁর বিশ্বাস ছিল, একটি ছবি শুধু মুখের চেহারা দেখায় না, মানুষের জীবনের গল্পও ধরে রাখে।
একদিন তাঁর দোকানে এল ষোলো বছরের মেয়ে তিতলি। হাতে একটি পুরোনো ছবি। ছবিতে দেখা যাচ্ছে, একটি ছোট মেয়ে তার মায়ের হাত ধরে দাঁড়িয়ে আছে। ছবিটির একপাশ ছেঁড়া, মুখের ওপর গভীর দাগ।
তিতলি ছবিটি কাউন্টারে রেখে বলল, “কাকু, ছবিটা কি ঠিক করা যাবে?”
অরুণাভবাবু ছবিটি হাতে নিয়ে মন দিয়ে দেখলেন। “চেষ্টা করতে পারি। কিন্তু ছবির কিছু অংশ নষ্ট হয়ে গেছে। সবটা আগের মতো করা সম্ভব নাও হতে পারে।”
তিতলি মাথা নাড়ল। “যতটা পারেন, করুন। এটা আমার মায়ের একমাত্র ছবি, যেখানে তিনি তাঁর মায়ের সঙ্গে আছেন।”
অরুণাভবাবু অবাক হয়ে তাকালেন। তিতলির মা বহু বছর আগে মারা গেছেন বলে তিনি জানতেন। কিন্তু মেয়েটির কথায় বোঝা গেল, ছবিটি তার কাছে শুধু স্মৃতি নয়, নিজের শিকড়কে চিনে নেওয়ার একমাত্র উপায়।
তিতলি চলে যাওয়ার পর অরুণাভবাবু ছবিটি স্ক্যান করলেন। আধুনিক সফটওয়্যারের সাহায্যে দাগ সরানো, ছেঁড়া অংশ জোড়া দেওয়া, আলো-ছায়া ঠিক করা—সবই করা সম্ভব। কিন্তু ছবির একটি অংশ এতটাই নষ্ট ছিল যে সেখানে মেয়েটির মুখের কিছুটা আর বোঝা যাচ্ছিল না।
তাঁর সহকারী বলল, “স্যার, সফটওয়্যার দিয়ে মুখটা বানিয়ে দিলেই তো হয়। দেখতে সুন্দর হবে।”
অরুণাভবাবু চুপ করে রইলেন। প্রযুক্তি দিয়ে একটি মুখের আদল তৈরি করা যায়, কিন্তু সেই মুখ যে সত্যিই ছবির মানুষের মুখ, তার নিশ্চয়তা কোথায়?
পরদিন তিতলি আবার দোকানে এল। অরুণাভবাবু তাকে ছবিটির দুটি সংস্করণ দেখালেন। প্রথমটিতে দাগ সরিয়ে যতটা সম্ভব মূল ছবিকে উদ্ধার করা হয়েছে। দ্বিতীয়টিতে সফটওয়্যার দিয়ে অস্পষ্ট মুখের অংশ কৃত্রিমভাবে পূরণ করা হয়েছে।
দ্বিতীয় ছবিটি দেখতে অনেক বেশি সুন্দর। তিতলি সেটির দিকে তাকিয়ে বলল, “এটাই তো ভালো হয়েছে! মা আর দিদিমাকে পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে।”
অরুণাভবাবু শান্তভাবে বললেন, “ছবিটা সুন্দর হয়েছে ঠিকই। কিন্তু ওই মুখের কিছু অংশ আমি নিজে তৈরি করেছি। তোমার দিদিমা সত্যিই এমন দেখতে ছিলেন কি না, তা আমি জানি না।”
তিতলি থমকে গেল। কিছুক্ষণ পরে জিজ্ঞেস করল, “তাহলে প্রথম ছবিটাই কি সত্যি?”
“প্রথম ছবিটা মূল ছবির যতটা সম্ভব কাছাকাছি। তাতে কিছু অপূর্ণতা আছে, কিন্তু যা আছে, তা সত্যিকারের ছবির অংশ। দ্বিতীয়টি তোমার কল্পনাকে সাহায্য করতে পারে, তবে তাকে আসল ছবি বলা ঠিক হবে না।”
তিতলি অনেকক্ষণ ধরে দুটি ছবি দেখল। তারপর প্রথম ছবিটি বেছে নিল।
“কাকু, আমি দিদিমার মুখ পুরোপুরি দেখতে চাই, ঠিকই। কিন্তু যেটা সত্যি, সেটাই রাখতে চাই। মায়ের স্মৃতির মধ্যে নতুন করে বানানো কোনো মুখ ঢুকিয়ে দিতে চাই না।”
অরুণাভবাবু মৃদু হাসলেন। ছবিটি বড় করে ছাপিয়ে সুন্দর একটি ফ্রেমে সাজিয়ে দিলেন। তিতলি ছবিটি বুকে জড়িয়ে দোকান থেকে বেরিয়ে গেল।
কয়েক সপ্তাহ পরে তিতলি আবার এল। সঙ্গে একটি ছোট্ট বাক্স। বাক্সের মধ্যে ছিল তার মায়ের লেখা কিছু চিঠি, পুরোনো একটি পরিচয়পত্র এবং দিদিমার হাতে লেখা কয়েকটি রান্নার রেসিপি।
সে বলল, “কাকু, এগুলোও একটু গুছিয়ে দিতে পারবেন? আমি চাই, আমার ভবিষ্যতের সন্তানরা যেন জানতে পারে তাদের পরিবারের গল্প।”
অরুণাভবাবু বুঝলেন, তিতলি শুধু একটি ছবি উদ্ধার করতে আসেনি। সে নিজের পরিবারের হারিয়ে যাওয়া ইতিহাসকে যত্ন করে বাঁচিয়ে রাখতে চাইছে।
তিনি চিঠিগুলো পরিষ্কার খামে ভরে দিলেন, পরিচয়পত্রটি সংরক্ষণের উপযোগী করে সাজালেন, আর রেসিপিগুলো ডিজিটাল কপি করে দিলেন। প্রতিটি নথির সঙ্গে লিখে দিলেন, কোনটি কোথায় পাওয়া গেছে এবং কোন অংশের লেখা অস্পষ্ট।
সেদিন দোকান বন্ধ করার আগে অরুণাভবাবু নিজের পুরোনো অ্যালবাম খুললেন। বহু বছর আগে তোলা একটি ছবিতে তাঁর বাবার মুখের ওপরও সময়ের দাগ পড়েছে। ছবিটি ঠিক করার কথা ভেবেও তিনি এত দিন করেননি।
এবার তিনি ছবিটি স্ক্যান করলেন। দাগগুলো পুরোপুরি সরালেন না। শুধু ছবিটিকে এমনভাবে সংরক্ষণ করলেন, যাতে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম সেটিকে দেখতে পারে।
তিনি উপলব্ধি করলেন, সময়ের ছাপ সব সময় মুছে ফেলতে হয় না। কিছু দাগ ক্ষতির চিহ্ন, আবার কিছু দাগ প্রমাণ করে—কোনো স্মৃতি দীর্ঘ পথ পেরিয়ে আজও বেঁচে আছে।
শিক্ষা: সত্যকে সুন্দর করে তোলার চেয়ে সত্যকে সম্মানের সঙ্গে সংরক্ষণ করা বেশি গুরুত্বপূর্ণ। প্রযুক্তি আমাদের স্মৃতি ফিরিয়ে দিতে সাহায্য করতে পারে, কিন্তু কল্পনাকে কখনও প্রমাণের জায়গায় বসানো উচিত নয়।

