কাংলা ফোর্ট (Kangla Fort) — ইম্ফালের কেন্দ্রে অবস্থিত এক প্রাচীন রাজপ্রাসাদ ও দুর্গ, যা মণিপুরের রাজকীয় ঐতিহ্য, মেইতেই সভ্যতা এবং স্বাধীনতার প্রতীক।
উত্তর-পূর্ব ভারতের হৃদয়ে অবস্থিত মণিপুর রাজ্য তার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও সমৃদ্ধ ইতিহাসের জন্য খ্যাত। আর সেই ইতিহাসের অন্যতম উজ্জ্বল প্রতীক হলো কাংলা ফোর্ট (Kangla Fort) — ইম্ফালের কেন্দ্রে অবস্থিত এক প্রাচীন রাজপ্রাসাদ ও দুর্গ, যা মণিপুরের রাজকীয় ঐতিহ্য, মেইতেই সভ্যতা এবং স্বাধীনতার প্রতীক হিসেবে আজও গর্বভরে দাঁড়িয়ে আছে।
🏛️ কাংলা ফোর্টের পরিচয়
“কাংলা” শব্দটির অর্থ “শুষ্ক ভূমি” বা “উচ্চভূমি”। প্রাচীন মেইতেই সভ্যতার কেন্দ্র হিসেবে কাংলা ছিল মণিপুর রাজ্যের রাজধানী। এই দুর্গই ছিল প্রায় দুই হাজার বছর আগে প্রতিষ্ঠিত মেইতেই রাজবংশের ক্ষমতার কেন্দ্র।
দীর্ঘদিন ধরে এটি শুধু একটি দুর্গ নয়, বরং ধর্মীয়, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্র হিসেবে বিকশিত হয়েছে।
📜 ইতিহাসের পাতায় কাংলা
- প্রাচীন যুগ: কিংবদন্তি অনুসারে, কাংলা রাজবংশের প্রতিষ্ঠাতা রাজা পাখাংবা খ্রিস্টপূর্ব প্রথম শতকে এখানে তার রাজধানী স্থাপন করেন।
- মধ্যযুগ: কাংলা ছিল মণিপুর রাজ্যের রাজাদের আবাসভূমি এবং প্রশাসনিক সদর। এখান থেকেই বহু যুদ্ধ, সংস্কার ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড পরিচালিত হতো।
- ব্রিটিশ আগ্রাসন (1891): মণিপুর যুদ্ধের পর ব্রিটিশরা এই দুর্গ দখল করে নেয় এবং দীর্ঘদিন এটি সামরিক ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
- আধুনিক যুগ: ২০০৪ সালে ভারতীয় সেনাবাহিনী এই দুর্গটি মণিপুর সরকারের হাতে ফিরিয়ে দেয়। এরপর থেকেই এটি জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত এক ঐতিহ্যবাহী পর্যটন কেন্দ্র।
🌿 স্থাপত্য ও দর্শনীয় স্থান
কাংলা ফোর্ট একদিকে যেমন ঐতিহাসিক নিদর্শন, অন্যদিকে এটি শিল্প ও স্থাপত্যের অনন্য মিশ্রণ। এর ভিতরে রয়েছে বহু প্রাচীন স্থাপনা, মন্দির ও প্রতীকচিহ্ন, যা দর্শকদের মুগ্ধ করে।
- কাংলা শা (Kangla Sha): প্রবেশদ্বারে দাঁড়িয়ে থাকা দুই বিশাল ড্রাগন আকৃতির পৌরাণিক প্রাণী “কাংলা শা” দুর্গের রক্ষাকর্তা বলে বিশ্বাস করা হয়।
- রাজপ্রাসাদ অবশেষ: প্রাচীন মেইতেই রাজাদের আবাসভবনের ধ্বংসাবশেষ এখনও দেখা যায়।
- শ্রী গোবিন্দজী মন্দির: দুর্গের ভেতরে অবস্থিত এই মন্দিরে বৈষ্ণব সংস্কৃতির গভীর প্রভাব লক্ষ্য করা যায়।
- জলাশয় ও উদ্যান: দুর্গের ভিতরে একাধিক পুকুর ও বৃক্ষশোভিত উদ্যান রয়েছে, যা স্থানের সৌন্দর্যকে বহুগুণ বাড়িয়ে তোলে।
- মণিপুর প্রত্নতাত্ত্বিক জাদুঘর: এখানে কাংলার ইতিহাস, রাজবংশের প্রতীক, প্রাচীন অস্ত্র, পোশাক ও প্রত্নবস্তু সংরক্ষিত আছে।
🌸 ধর্ম ও সংস্কৃতির মিলনস্থল
কাংলা শুধুমাত্র রাজকীয় দুর্গ নয় — এটি মেইতেই ধর্ম ও সংস্কৃতির কেন্দ্রবিন্দু।
- এখানে সানামাহী ধর্ম ও বৈষ্ণব ধর্ম উভয়ের প্রভাব দেখা যায়।
- কাংলা দেবতা এবং দেবী পাখাংবার পূজা আজও অনুষ্ঠিত হয়।
- দুর্গ প্রাঙ্গণে মেইতেই ঐতিহ্যবাহী উৎসব যেমন লাই হারাওবা অনুষ্ঠিত হয়, যা স্থানীয় সংস্কৃতির জীবন্ত প্রতিফলন।
🚶♂️ ভ্রমণ অভিজ্ঞতা
কাংলা ফোর্টে প্রবেশ করলেই মনে হয়, আপনি সময়ের স্রোত বেয়ে ইতিহাসের এক গহীনে প্রবেশ করেছেন।
প্রাচীন প্রাচীর, মন্দির, ভাস্কর্য ও বৃক্ষাবলিতে ঘেরা প্রশস্ত পথ ধরে হাঁটতে হাঁটতে মণিপুরের অতীত রাজকীয় জৌলুস যেন চোখের সামনে জীবন্ত হয়ে ওঠে।
সন্ধ্যাবেলা, সূর্যাস্তের কোমল আলোয় কাংলা শার পাথরের মূর্তি যখন লালচে আভায় দীপ্ত হয় — সেই দৃশ্য অনবদ্য ও মনোমুগ্ধকর।
🗺️ যাতায়াত ব্যবস্থা
- অবস্থান: কাংলা ফোর্ট ইম্ফাল শহরের কেন্দ্রস্থলে, ইম্ফাল নদীর তীরে।
- কীভাবে যাবেন:
- নিকটতম বিমানবন্দর: ইম্ফাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর (প্রায় ৭ কিমি দূরে)।
- ট্যাক্সি ও অটোতে সহজেই পৌঁছানো যায়।
- প্রবেশ ফি: অল্প পরিমাণ টিকিটের বিনিময়ে পর্যটকরা ভিতরে প্রবেশ করতে পারেন।
🌤️ ভ্রমণের সেরা সময়
অক্টোবর থেকে এপ্রিল মাস পর্যন্ত সময় কাংলা ফোর্ট ঘোরার জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত। এই সময় আবহাওয়া আরামদায়ক থাকে এবং দুর্গের পরিবেশে প্রকৃতির সৌন্দর্যও ফুটে ওঠে।
🕊️ উপসংহার
কাংলা ফোর্ট কেবলমাত্র এক ঐতিহাসিক নিদর্শন নয়; এটি মণিপুরের আত্মার প্রতীক — যেখানে রাজকীয় গৌরব, ধর্মীয় ঐতিহ্য ও সাংস্কৃতিক ঐক্য একসূত্রে গাঁথা।
ইম্ফাল ভ্রমণে কাংলা ফোর্ট না দেখা মানে মণিপুরের হৃদয়কে না জানা।
প্রাচীন রাজাদের পদচিহ্নে পা রেখে যখন কাংলার নিস্তব্ধ প্রাচীরের পাশে দাঁড়াবেন, তখন আপনি অনুভব করবেন — ইতিহাস আজও এখানে নিঃশব্দে শ্বাস নিচ্ছে। 🌿✨

