মুর্শিদাবাদের খোশবাগ — নবাবদের নিঃশব্দ বিশ্রামভূমি।
ইতিহাসপ্রেমীদের কাছে মুর্শিদাবাদ এক অপূর্ব ভান্ডার। এখানে প্রতিটি ইট, প্রতিটি গলি, প্রতিটি প্রাসাদে লুকিয়ে আছে এক রাজকীয় অতীতের স্মৃতি। হাজারদুয়ারি, কাতরা মসজিদ, কাঠগোলা বাগানবাড়ি, নিমতলা কেল্লা—সবই যেন নবাবদের রাজকীয় শৌর্যের প্রতীক। কিন্তু এই রাজকীয় ঐতিহ্যের মধ্যেও এক স্থানের আবহ অন্যরকম—শান্ত, নিঃস্তব্ধ, অথচ গভীরভাবে ঐতিহাসিক। সেই স্থানই খোশবাগ—নবাব সিরাজউদ্দৌলার চিরনিদ্রার প্রিয় আশ্রয়স্থল।
🏰 ইতিহাসের পটভূমি
খোশবাগের নামের অর্থই হল “সুখের বাগান” বা “Garden of Happiness”। এই বাগান তৈরি করেছিলেন নবাব আলিবর্দি খাঁ, যিনি চেয়েছিলেন নিজের ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের জন্য এক শান্ত, পবিত্র বিশ্রামভূমি। পরবর্তীকালে এখানেই সমাহিত হন তাঁর নাতি নবাব সিরাজউদ্দৌলা, তাঁর স্ত্রী লুৎফা বেগম, তাঁর দাদি আলিবর্দি খাঁর মা ও অন্যান্য আত্মীয়রা।
১৭৫৭ সালের পলাশীর যুদ্ধ-এর পর যখন সিরাজউদ্দৌলা বিশ্বাসঘাতকতার শিকার হয়ে মৃত্যুবরণ করেন, তখন তাঁকে এই খোশবাগেই সমাহিত করা হয়। তাই ইতিহাসের এক অন্যতম করুণ অধ্যায়ের নিঃশব্দ সাক্ষী আজও এই খোশবাগের মাটি।
🌿 বাগানের সৌন্দর্য ও পরিবেশ
খোশবাগের বিস্তৃতি প্রায় ৭.৬৫ একর জমিতে। ভাগীরথী নদীর পশ্চিম তীরে অবস্থিত এই বাগান ঘেরা রয়েছে উঁচু লাল ইটের প্রাচীর দিয়ে। প্রবেশদ্বার পেরোতেই চোখে পড়ে সুশৃঙ্খল পথ, দুই পাশে শতবর্ষ প্রাচীন আম ও কাঁঠাল গাছ, আর বাতাসে এক অদ্ভুত শান্ত ভাব।
বাগানের মাঝখানে রয়েছে সাদা মার্বেল পাথরে ঘেরা সমাধি এলাকা। এখানে পাশাপাশি শুয়ে আছেন নবাব সিরাজউদ্দৌলা ও তাঁর প্রিয় স্ত্রী লুৎফা বেগম। তাঁদের সমাধির চারপাশে ছোট ছোট পাথরের ফলকে খোদাই করা রয়েছে আরবি ভাষায় কোরআনের বাণী। পুরো স্থানটি এক পবিত্র নিস্তব্ধতায় ভরা — যেন সময় এখানে থমকে গেছে।
🕌 খোশবাগের স্থাপত্যশৈলী
খোশবাগের স্থাপত্যে দেখা যায় ইসলামী ও মুঘল স্থাপত্যশৈলীর সমন্বয়। সমাধিগুলির চারপাশে রয়েছে ছোট গম্বুজাকৃতি ছাউনি, লাল ও সাদা মার্বেলের ব্যবহার, এবং বাগানের চারপাশে সমান্তরাল পথ — যা সেই সময়ের নবাবি রুচির পরিচয় বহন করে।
প্রবেশদ্বারের উপর রয়েছে ফারসি ভাষায় একটি শিলালিপি, যেখানে লেখা আছে নবাব সিরাজউদ্দৌলার নাম ও মৃত্যুবর্ষ। এই স্থাপত্যের সরলতা ও মহিমা একসঙ্গে মন ছুঁয়ে যায়।
⚓ ভাগীরথীর তীরে খোশবাগ
খোশবাগের অন্যতম আকর্ষণ হল তার নদী তীরবর্তী অবস্থান। ভাগীরথী নদীর শান্ত জলে সূর্যাস্তের প্রতিফলন এক অনন্য দৃশ্য সৃষ্টি করে। দূরে দেখা যায় মুর্শিদাবাদ শহর, আর নদীর ধারে বসে শোনা যায় শুধু পাখির ডাক আর জলতরঙ্গের মৃদু শব্দ।
এই নদীপাড়ের বাতাসে যেন ইতিহাসের গন্ধ মিশে আছে—যেখানে নবাব সিরাজের স্বপ্ন, তাঁর বেদনাময় পরিণতি, আর এক হারানো সাম্রাজ্যের নিঃশব্দ প্রতিধ্বনি আজও ভেসে আসে।
🚗 কীভাবে পৌঁছানো যায়
- রেলপথে: কলকাতা থেকে বহরমপুর কোর্ট স্টেশন পর্যন্ত ট্রেনে পৌঁছানো যায়। সেখান থেকে টোটো বা গাড়ি ভাড়া করে লালবাগ পর্যন্ত যেতে হয়। ভাগীরথী নদী পার হলেই অপর পারে খোশবাগ।
- সড়কপথে: NH34 ধরে মুর্শিদাবাদ পৌঁছে লালবাগ ঘাট থেকে নৌকায় পার হয়ে সহজেই পৌঁছানো যায় খোশবাগে।
- নৌকাপথে: ভাগীরথী নদীর উপর দিয়ে নৌকা ভ্রমণ নিজেই এক আলাদা অভিজ্ঞতা — বিশেষ করে সন্ধ্যাবেলায়।
🕰️ ভ্রমণের উপযুক্ত সময়
খোশবাগ দর্শনের শ্রেষ্ঠ সময় হলো অক্টোবর থেকে মার্চ পর্যন্ত। শীতের মৃদু রোদে বাগানের সৌন্দর্য ও নদীর ধারের নিরবতা উপভোগ করা যায় পরিপূর্ণভাবে। বর্ষাকালে নদীর সৌন্দর্য আরও বেড়ে যায়, তবে জলপথে চলাচল কিছুটা কষ্টকর হয়।
✨ উপসংহার
মুর্শিদাবাদের খোশবাগ কেবল একটি সমাধিক্ষেত্র নয়; এটি বাংলার ইতিহাসের এক নিঃশব্দ অধ্যায়ের প্রতীক। এখানে এসে বোঝা যায়—রাজকীয় ঐশ্বর্যের অবসানও কত শান্ত, কত মহিমান্বিত হতে পারে।
খোশবাগের শান্ত বাতাসে, পাখির কূজনের মাঝে, ভাগীরথীর ঢেউয়ের শব্দে আজও যেন শোনা যায় নবাব সিরাজউদ্দৌলার নিঃশব্দ আর্তনাদ, তাঁর স্বপ্নভঙ্গের বেদনা, এবং বাংলার ইতিহাসের এক চিরস্মরণীয় অধ্যায়ের গম্ভীর প্রতিধ্বনি।
খোশবাগে গেলে মনে হয়—ইতিহাস আসলে মরে না, সে কেবল চুপচাপ শুয়ে থাকে, সময়ের বালিতে, ভাগীরথীর তীরে। 🌾

