ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে এক অমোচনীয় অধ্যায়ের নাম সেলুলার জেল।

ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে এক অমোচনীয় অধ্যায়ের নাম সেলুলার জেল। আন্দামান দ্বীপপুঞ্জের রাজধানী পোর্ট ব্লেয়ারে অবস্থিত এই ঐতিহাসিক কারাগার কেবল একটি পর্যটন স্থান নয় — এটি ভারতের ত্যাগ, বীরত্ব ও বেদনায় ভেজা এক জীবন্ত প্রতীক। আজ যখন আমরা এখানে ভ্রমণে যাই, তখন সমুদ্রের নীল ঢেউয়ের সাথে যেন মিশে যায় স্বাধীনতার আর্তনাদ, এবং প্রতিটি ইট যেন বলে ওঠে — “স্বাধীনতা রক্তের বিনিময়ে এসেছে।”


🔹 ইতিহাসের পাতা থেকে

সেলুলার জেলের নির্মাণ শুরু হয় ১৮৯৬ সালে এবং শেষ হয় ১৯০৬ সালে ব্রিটিশ শাসনামলে। এই জেলখানা তৈরি করা হয়েছিল ভারতের বিপ্লবী স্বাধীনতা সংগ্রামীদের নির্বাসনে পাঠিয়ে নির্যাতনের জন্য। নামটি “সেলুলার” কারণ এখানে প্রতিটি বন্দীকে রাখা হতো আলাদা আলাদা সেলে — যেন কারোর সঙ্গে কারোর যোগাযোগ না থাকে, এক নিঃসঙ্গ মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেওয়া হতো তাঁদের।

এখানে বন্দী ছিলেন বীর সাভারকর, বটুকেশ্বর দত্ত, যোগেশচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, উল্লাসকর দত্ত, সুশীল দাসগুপ্ত প্রমুখ বহু স্বাধীনতা সংগ্রামী। তাঁদের মধ্যে অনেকেই অকথ্য নির্যাতন, বেত্রাঘাত ও অনাহারে মৃত্যুবরণ করেন।


🔹 স্থাপত্যের বিস্ময়

সেলুলার জেলটি মূলত একটি তারকা আকৃতির স্থাপনা — সাতটি ডানা বা উইং একত্রে কেন্দ্রীয় পর্যবেক্ষণ টাওয়ারের সাথে যুক্ত ছিল। প্রত্যেক উইংয়ে তিনতলা করে মোট ৬৯৩টি সেল ছিল। প্রতিটি সেল মাত্র ১৩.৫ ফুট লম্বা ও ৭ ফুট চওড়া, যেখানে বন্দীকে একাকী বন্দিত্বে রাখা হতো।

আজ এর মধ্যে তিনটি উইং টিকে আছে, বাকিগুলি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ধ্বংস হয়। বর্তমানে এই স্থাপনাগুলি সংস্কার করে দর্শনার্থীদের জন্য সংরক্ষিত করা হয়েছে।


🔹 সেলুলার জেলের অভ্যন্তরে ভ্রমণ

জেলের ভেতরে প্রবেশ করলেই প্রথমেই চোখে পড়ে বিশাল জাতীয় স্মৃতিসৌধ — যেখানে জাতীয় পতাকা গর্বভরে উড়ছে। এরপর ধাপে ধাপে আপনি দেখতে পাবেন—

  • বীর সাভারকরের সেল : এখানেই কাটিয়েছিলেন তাঁর দীর্ঘ বন্দিত্বের দিনগুলি। সেলের বাইরে তাঁর জীবনের উপর একটি ক্ষুদ্র জাদুঘর রয়েছে।
  • ফাঁসিঘর : এটি সেই জায়গা যেখানে বহু বিপ্লবীকে ফাঁসি দেওয়া হয়েছিল। ভ্রমণের সময় মনে হয়, বাতাসে আজও তাঁদের আত্মত্যাগের ধ্বনি ভেসে বেড়ায়।
  • লাইট অ্যান্ড সাউন্ড শো : সন্ধ্যায় অনুষ্ঠিত এই অনুষ্ঠানটি দর্শকদের মনকে আলোড়িত করে। এখানে আলোক ও শব্দের মাধ্যমে ব্রিটিশ শাসনের নির্মমতা, স্বাধীনতা সংগ্রামীদের ত্যাগ ও স্বাধীনতার আহ্বান জীবন্ত হয়ে ওঠে।

🔹 সেলুলার জেল ভ্রমণের অভিজ্ঞতা

যে কেউ প্রথমবার এই স্থানে গেলে এক অবর্ণনীয় অনুভূতি অনুভব করেন। চোখের সামনে যখন ফাঁসিঘরের দড়ি দুলে ওঠে, কিংবা সাভারকরের কক্ষে দাঁড়িয়ে তাঁর লেখা “জয় হিন্দ” শব্দটি পড়েন, তখন হৃদয় ভারাক্রান্ত হয়ে ওঠে।
সামুদ্রিক বাতাসের শীতল স্পর্শও যেন থমকে যায় এই বেদনার সামনে।

কিন্তু সেই সঙ্গে এক অনন্য গর্বও জন্ম নেয় — আমরা এমন এক জাতির উত্তরসূরি যারা স্বাধীনতার জন্য মৃত্যুকেও তুচ্ছ করেছে।


🔹 ভ্রমণ সংক্রান্ত তথ্য

  • অবস্থান: পোর্ট ব্লেয়ার, দক্ষিণ আন্দামান
  • প্রবেশমূল্য: প্রায় ₹৩০ (ভারতীয় নাগরিকদের জন্য)
  • লাইট অ্যান্ড সাউন্ড শো টিকিট: ₹১৫০ (সন্ধ্যা ৬টা থেকে)
  • খোলার সময়: প্রতিদিন সকাল ৯টা থেকে দুপুর ১২টা ও বিকেল ১টা থেকে ৪টা পর্যন্ত (সোমবার বন্ধ)
  • নিকটতম বিমানবন্দর: ভীর সাভারকর আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর, পোর্ট ব্লেয়ার
  • নিকটবর্তী দর্শনীয় স্থান: রাজীব গান্ধী ওয়াটার স্পোর্টস কমপ্লেক্স, রস দ্বীপ, করবিনস কোভ বিচ, নর্থ বে আইল্যান্ড।

🔹 ভ্রমণ পরামর্শ

  • ভ্রমণের আগে অনলাইনে শো টিকিট বুক করে রাখলে ভালো।
  • গাইড সহ ভ্রমণ করলে ইতিহাস জানা সহজ হয়।
  • সূর্যাস্তের সময় জেলের ছায়া ও আকাশের রঙে এক অপার্থিব সৌন্দর্য ফুটে ওঠে, তা মিস করবেন না।

🔹 উপসংহার

সেলুলার জেল আজ কেবল ইট-পাথরের স্থাপনা নয় — এটি ভারতীয় জাতির আত্মমর্যাদা ও আত্মত্যাগের অমর প্রতীক।
এখানে প্রতিটি দেওয়ালে লেখা আছে একেকটি অজানা বীরের কাহিনি, প্রতিটি জানালার ফাঁক দিয়ে উঁকি দেয় স্বাধীনতার সূর্য।

যে কেউ এই স্থানে ভ্রমণ করলে কেবল ইতিহাস নয়, নিজের ভেতরের ভারতত্বকেও খুঁজে পাবেন নতুন করে।


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *