অরুণাচল প্রদেশের রোইং: প্রাকৃতিক শান্তি ও পাহাড়ি সৌন্দর্যের মেলবন্ধন।।
ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চল যেন প্রকৃতির গোপন রত্নভান্ডার। এই রত্নভান্ডারের অন্যতম উজ্জ্বল রত্ন হলো রোইং (Roing) — অরুণাচল প্রদেশের লোয়ার দিবাং ভ্যালি জেলার কোলে লুকিয়ে থাকা এক স্বর্গীয় পাহাড়ি শহর। শান্ত পাহাড়, ঘন জঙ্গল, নদীর কলতান ও মেঘের খেলা—রোইং এমনই এক স্থান, যেখানে প্রকৃতি যেন নিজেই তার শিল্পকলার প্রদর্শনী সাজিয়েছে।
🌿 রোইং-এর পরিচয়
রোইং হলো অরুণাচল প্রদেশের এক শান্ত, সবুজে মোড়া শহর। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৪০০ মিটার উচ্চতায় অবস্থিত এই অঞ্চলটি ঘেরা রয়েছে দিবাং নদী, মিশমি পাহাড়, আর বাঁশে ঢাকা জঙ্গল দিয়ে। এটি মূলত আদিবাসী মিশমি সম্প্রদায়ের বসবাসস্থল, যারা শতাব্দী ধরে পাহাড়ের বুকে প্রকৃতির সঙ্গে সহাবস্থান করে চলেছে।
রোইং নামটি এসেছে ‘রো’ ও ‘ইং’ শব্দ থেকে, যার অর্থ—“পাহাড়ের নীচে নদীর দেশ”। নামেই যেন প্রকৃতির ছোঁয়া!
🏞️ দর্শনীয় স্থানসমূহ
🏔️ মিশমি হিলস (Mishmi Hills)
রোইং-এর সবচেয়ে আকর্ষণীয় স্থান। বরফে মোড়া চূড়া, সবুজ বন, ও পাহাড়ি বুনো ফুলের সৌন্দর্য এই অঞ্চলে মন ভরিয়ে দেয়। হাইকিং, ট্রেকিং ও ক্যাম্পিং-এর জন্য এই পাহাড় একেবারে আদর্শ স্থান।
🌅 মেইদো ভ্যালি (Mehao Valley) ও মেইদো লেক
রোইং থেকে মাত্র কয়েক কিলোমিটার দূরে অবস্থিত মেইদো লেক, যা ৪,০০০ ফুট উচ্চতায় অবস্থিত এক চমৎকার প্রাকৃতিক হ্রদ। আশেপাশে মেইদো বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য, যেখানে হাতি, মাকাক, চিতা, ও নানা প্রজাতির পাখি দেখা যায়। প্রকৃতিপ্রেমীদের জন্য এটি যেন এক স্বপ্নপুরী।
🪶 ইজু গ্রাম (Idu Mishmi Village)
মিশমি আদিবাসী সংস্কৃতি বোঝার জন্য ইজু গ্রাম অপরিহার্য গন্তব্য। এখানকার মানুষের পোশাক, গান, নাচ, ও হস্তশিল্প আজও প্রাচীন ঐতিহ্যের ধারক। স্থানীয়দের আতিথেয়তাও মন জয় করে নেয়।
🌊 দিবাং নদী (Dibang River)
স্বচ্ছ, নীল জলধারা আর নদীর দুই ধারে পাহাড়—দিবাং নদীর তীরে বসে সূর্যাস্ত দেখা এক অনন্য অভিজ্ঞতা। অ্যাডভেঞ্চারপ্রেমীরা এখানে রিভার র্যাফটিং, ফিশিং ও ক্যাম্পিং-এর সুযোগও পেতে পারেন।
🏞️ সালি লেক (Sally Lake)
রোইং-এর কাছেই অবস্থিত এই শান্ত হ্রদটি স্থানীয় ও পর্যটক উভয়ের প্রিয়। চারপাশে পাহাড়ের ছায়া পড়ে তৈরি করে এক স্বপ্নিল পরিবেশ। সকালের সূর্যের আলোতে হ্রদের জল যেন সোনালি আভা ছড়িয়ে দেয়।
🕊️ সংস্কৃতি ও মানুষ
রোইং-এর মানুষেরা সরল, অতিথিপরায়ণ ও প্রকৃতিপ্রেমী। মিশমি উপজাতি এখানকার প্রধান বাসিন্দা, যারা প্রকৃতিকে দেবতা মনে করে পূজা করেন। তাদের রেহ ফেস্টিভ্যাল (Reh Festival) রোইং-এর সবচেয়ে জনপ্রিয় উৎসব, যা সাধারণত ফেব্রুয়ারি মাসে অনুষ্ঠিত হয়। এই উৎসবে সঙ্গীত, নৃত্য ও ঐতিহ্যবাহী খাবারের মহোৎসব হয়, যা পর্যটকদের কাছে এক অনন্য অভিজ্ঞতা।
🛣️ কীভাবে পৌঁছানো যায়
রোইং পৌঁছানোর সবচেয়ে সহজ উপায় হলো ডিব্রুগড় বা তেজপুর পর্যন্ত ট্রেন বা বিমানযোগে এসে সেখান থেকে সড়কপথে যাত্রা করা।
- নিকটবর্তী রেলস্টেশন: তিনসুকিয়া (প্রায় ১৪০ কিমি দূরে)
- নিকটবর্তী বিমানবন্দর: ডিব্রুগড় (মোহনবাড়ি বিমানবন্দর)
রোইং পর্যন্ত রাস্তা অত্যন্ত মনোরম—পাহাড়, নদী, আর বাঁশবনের মধ্য দিয়ে চলার অভিজ্ঞতা সত্যিই অবিস্মরণীয়।
🍲 খাবার ও থাকার ব্যবস্থা
রোইং-এ কয়েকটি সুন্দর হোমস্টে ও সরকারি ট্যুরিস্ট লজ রয়েছে, যেখানে সহজেই থাকা যায়। স্থানীয় মিশমি রান্না যেমন বাঁশে রান্না করা মাংস, পাহাড়ি ভাত, ও অর্গানিক সবজি—এসব স্বাদ নিতে ভুলবেন না।
🌸 উপসংহার
রোইং এমন এক জায়গা যেখানে প্রকৃতি এখনো অক্ষত, নিস্তব্ধতাও সুন্দর। পাহাড়ের কোল, নদীর কলধ্বনি, পাখির গান আর আদিবাসী সংস্কৃতির উষ্ণতা—সব মিলিয়ে রোইং ভ্রমণ মানে আত্মার এক গভীর প্রশান্তি।
যারা প্রকৃতির কাছাকাছি থাকতে চান, শহরের কোলাহল থেকে মুক্তি খোঁজেন, তাঁদের জন্য রোইং হলো এক অপরূপ নির্জন স্বর্গ। 🌿🏞️

