ভারতের দক্ষিণের তেলেঙ্গানা রাজ্যের খম্মম জেলায় অবস্থিত ভদ্রাচলম (Bhadrachalam) এক অনন্য তীর্থস্থান।

ভারতের দক্ষিণের তেলেঙ্গানা রাজ্যের খম্মম জেলায় অবস্থিত ভদ্রাচলম (Bhadrachalam) এক অনন্য তীর্থস্থান, যা শুধু ধর্মীয় নয়, প্রাকৃতিক সৌন্দর্যেও সমৃদ্ধ। ‘গোদাবরী নদী’কে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা এই শহরকে বলা হয় “দক্ষিণ ভারতের অযোধ্যা”। ভগবান শ্রী রামের ভক্তদের কাছে এটি এক পবিত্র স্থান, আর ভ্রমণপিপাসুদের কাছে এটি এক শান্ত, মনোরম ও ঐতিহাসিক গন্তব্য।


🌿 ভদ্রাচলমের ইতিহাস ও ধর্মীয় গুরুত্ব

ভদ্রাচলমের ইতিহাস সরাসরি যুক্ত শ্রী রামচন্দ্রের সঙ্গে। কথিত আছে, রামায়ণের অরণ্যকাণ্ডে শ্রী রাম, সীতা ও লক্ষ্মণ এখানে কিছুদিন আশ্রয় নিয়েছিলেন। স্থানটির নাম এসেছে ‘ভদ্র’ নামের এক ঋষির কাছ থেকে, যিনি এখানে কঠোর তপস্যা করেছিলেন শ্রী রামের দর্শনের আশায়। তাঁর তপস্যায় সন্তুষ্ট হয়ে ভগবান রাম তাঁকে দর্শন দেন এবং আশীর্বাদ করেন— সেই স্মৃতিতেই এই স্থানের নাম হয় ভদ্রাচলম, অর্থাৎ ‘ভদ্রের পাহাড়’।


🛕 শ্রী শীতারামাচন্দ্র স্বামী মন্দির

ভদ্রাচলমের প্রাণকেন্দ্র হল শ্রী শীতারামাচন্দ্র স্বামী মন্দির। সপ্তদশ শতকে ভক্ত কবি কাঞ্চারলা গোপন্না, যিনি পরে ভক্ত রামদাসু নামে পরিচিত হন, এই মন্দিরটি নির্মাণ করেন। মন্দিরের স্থাপত্য দ্রাবিড় শৈলীতে গড়া এবং গোপুরমটি সোনালী রঙে মোড়ানো। এখানে রাম, সীতা ও লক্ষ্মণের দেবমূর্তি দর্শন করলে মনে হয়, যেন রামায়ণের জীবন্ত অধ্যায় চোখের সামনে ফুটে উঠেছে।

মন্দিরে প্রতিদিন শত শত ভক্তের সমাগম হয়, আর রামনবমীর সময় এটি পরিণত হয় এক বিশাল উৎসবে। ভক্তদের কণ্ঠে “জয় শ্রী রাম” ধ্বনি, ফুলে সজ্জিত গোদাবরীর ঘাট, আর সোনালী আলোয় আলোকিত মন্দিরের চূড়া—সব মিলিয়ে দৃশ্যটি অবিস্মরণীয়।


🌊 গোদাবরী নদী ও পবিত্র স্নান

ভদ্রাচলমের পাশ দিয়ে বয়ে গেছে দক্ষিণ ভারতের অন্যতম প্রধান নদী গোদাবরী। নদীর ধারে নির্মিত ঘাটে প্রতিদিন অসংখ্য তীর্থযাত্রী স্নান করেন এবং পূজা অর্চনা করেন। বিশ্বাস করা হয়, এই নদীতে স্নান করলে পাপ মোচন হয় ও আত্মা পবিত্র হয়। সন্ধ্যায় গোদাবরীর তীরে আরতি অনুষ্ঠান দেখার মতো এক অনন্য অভিজ্ঞতা — নদীর জলে প্রতিফলিত প্রদীপের আলো যেন ভক্তির প্রতীক হয়ে ওঠে।


🌄 ভদ্রাচলমের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য

গোদাবরীর তীর, সবুজ অরণ্য, পাহাড়ি ঢাল আর পাখির কূজন — সব মিলিয়ে ভদ্রাচলম প্রকৃতিপ্রেমীদের জন্যও স্বর্গসম স্থান। কাছেই রয়েছে সুন্দর পাপিকোণ্ডালু পাহাড়শ্রেণি, যা গোদাবরীর বুকে নৌকাভ্রমণের অন্যতম আকর্ষণ। নদীপথে ঘুরতে ঘুরতে দেখা যায় ঘন জঙ্গল, উপজাতি গ্রাম এবং পাহাড়ের ছায়ায় ঝিকিমিকি করা জল।


🏞️ পাশাপাশি দর্শনীয় স্থানসমূহ

  1. পাপিকোণ্ডালু (Papikondalu): ভদ্রাচলম থেকে নৌকা করে ঘুরে আসা যায় এই মনোমুগ্ধকর পাহাড়শ্রেণি।
  2. পার্ণশালা (Parnasala): কথিত আছে, এখানে শ্রী রাম ও সীতা তাঁদের বনবাসের কিছু সময় কাটিয়েছিলেন। বর্তমানে এখানে সীতার আশ্রম, রামের পদচিহ্ন ও রাবণের প্রতীকী চিত্র দেখা যায়।
  3. অবধূত আশ্রম: একটি শান্ত নির্জন আশ্রম, যেখানে ধ্যান ও যোগাভ্যাসের পরিবেশ অসাধারণ।

🍴 খাবার ও স্থানীয় জীবনযাপন

ভদ্রাচলমে দক্ষিণ ভারতের ঐতিহ্যবাহী খাবারের স্বাদ পাওয়া যায়। ইডলি, দোসা, সাম্বার, তেঁতুল ভাত, পায়াসম—সবই অত্যন্ত জনপ্রিয়। স্থানীয় মানুষের আন্তরিকতা ও ভক্তিভাব ভ্রমণকে করে তোলে আরও হৃদয়গ্রাহী।


🚗 কীভাবে পৌঁছাবেন

  • রেলপথে: ভদ্রাচলম রোড স্টেশন (Kothagudem) সবচেয়ে কাছের রেলস্টেশন। সেখান থেকে বাস বা ট্যাক্সিতে ৪০ কিলোমিটার দূরে মন্দিরে পৌঁছানো যায়।
  • সড়কপথে: হায়দরাবাদ, বিজয়ওয়াড়া ও রাজামুন্দ্রি থেকে নিয়মিত বাস পরিষেবা রয়েছে।
  • বিমানপথে: সবচেয়ে কাছের বিমানবন্দর রাজামুন্দ্রি (১৮০ কিমি)।

📸 ভ্রমণকারীর অভিজ্ঞতা

ভদ্রাচলমে পৌঁছেই মনে হয়, একাধারে যেন রামায়ণের ইতিহাসে প্রবেশ করেছি। ভক্তদের মুখে রামের নাম, বাতাসে মন্দিরের ঘণ্টাধ্বনি, নদীর স্রোতের শব্দ—সব মিলে এক অদ্ভুত শান্তির অনুভূতি দেয়। সন্ধ্যাবেলায় গোদাবরীর ধারে বসে সূর্যাস্ত দেখা, আর নদীর ওপারে সোনালি আলোয় ভেসে ওঠা মন্দির—এ এক অপরূপ দৃশ্য, যা হৃদয়ে থেকে যায় দীর্ঘদিন।


🌺 শেষ কথা

ভদ্রাচলম শুধু একটি তীর্থস্থান নয়, এটি এক আত্মিক ভ্রমণ—যেখানে মানুষ নিজের অন্তরের শান্তি ও বিশ্বাসকে নতুন করে খুঁজে পায়। এখানে ইতিহাস, পুরাণ, প্রকৃতি ও ভক্তি মিলেমিশে এক আশ্চর্য সুর রচনা করেছে।

যদি আপনি চান ভক্তির আবেশে ভরা এক ভ্রমণ, আর প্রকৃতির কোলে কিছুক্ষণ ধ্যানমগ্ন সময় কাটাতে, তবে ভদ্রাচলম আপনার জন্যই আদর্শ গন্তব্য।


🌸 ভদ্রাচলম — যেখানে গোদাবরীর জলে ভেসে আসে ভক্তির সুর, আর প্রতিটি বাতাসে মিশে থাকে “জয় শ্রী রাম”-এর ধ্বনি। 🌸

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *