তাঞ্জাভুর: দক্ষিণ ভারতের শিল্প, স্থাপত্য ও ভক্তির রাজধর্মে গাঁথা এক চিরন্তন নগরী।
তামিলনাড়ুর মাটিতে এমন কিছু শহর আছে, যাদের প্রতিটি ইট যেন কথা বলে ইতিহাসের।
তাঞ্জাভুর (Thanjavur), সেইরকমই এক শহর— যেখানে চোল সাম্রাজ্যের গৌরব, দ্রাবিড় স্থাপত্যের মহিমা, ভারতীয় শিল্পকলার ঐশ্বর্য আর সঙ্গীতের আত্মা একসূত্রে গাঁথা।
যে শহরকে আজও সারা বিশ্বে চেনে— “গ্রেট লিভিং চোলা টেম্পলস”-এর জন্য, যা UNESCO-র World Heritage Site হিসেবে ঘোষিত।
🌿 তাঞ্জাভুরের ইতিহাস
তাঞ্জাভুরের নামের উৎস নিয়ে নানা কাহিনি প্রচলিত।
এক মত অনুযায়ী, “তাঞ্জন” নামে এক অসুরকে ভগবান বিষ্ণু এখানে বধ করেছিলেন—
তাঁর নামেই এই স্থানের নাম রাখা হয় তাঞ্জাভুর।
তবে ইতিহাস বলে, তাঞ্জাভুর ছিল চোল রাজবংশের রাজধানী (৯ম থেকে ১৩শ শতাব্দী)।
রাজরাজ চোল, রাজেন্দ্র চোলের মতো মহারাজাদের পৃষ্ঠপোষকতায় এই শহর পরিণত হয়েছিল শিল্প, সাহিত্য ও স্থাপত্যের এক স্বর্ণযুগের কেন্দ্রে।
চোলদের পরে পাণ্ড্য, নায়ক ও মারাঠা শাসকরাও তাঞ্জাভুরে রাজত্ব করেছেন, এবং প্রত্যেকে শহরটিকে আরও সমৃদ্ধ করে গেছেন তাঁদের নিজস্ব সাংস্কৃতিক ছোঁয়ায়।
🕉️ বৃহদীশ্বর মন্দির: তাঞ্জাভুরের প্রাণ
তাঞ্জাভুর মানেই বৃহদীশ্বর মন্দির (Brihadeeswarar Temple)।
এটি ভারতের স্থাপত্য ইতিহাসের এক বিস্ময়!
- নির্মাতা: রাজরাজ চোল প্রথম (১০১০ খ্রিষ্টাব্দে)
- দেবতা: ভগবান শিব
- স্থাপত্যশৈলী: দ্রাবিড় শৈলী
- বৈশিষ্ট্য: ২১৬ ফুট উঁচু বিশাল বিমানা (গোপুরম), যা একটিমাত্র ৮০ টনের গ্রানাইট পাথর দিয়ে গঠিত!
মন্দিরের প্রধান গর্ভগৃহে বিরাজমান বিশাল শিবলিঙ্গ এবং তার সামনে থাকা নন্দী মূর্তি বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ।
অবিশ্বাস্য বিষয় হলো— গোপুরমের ছায়া কখনও মন্দিরের ভূমিতে পড়ে না!
এই প্রকৌশল কৌশল আজও স্থপতিদের বিস্মিত করে।
UNESCO ঘোষিত World Heritage Site হিসেবে বৃহদীশ্বর মন্দিরের স্থান পৃথিবীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ স্থাপত্য কীর্তির তালিকায়।
🎨 তাঞ্জাভুর শিল্প (Thanjavur Painting)
তাঞ্জাভুর শুধু মন্দিরের শহর নয়, এটি ভারতের এক শিল্পনগরী।
বিশ্ববিখ্যাত “তাঞ্জাভুর পেইন্টিং”— যার ইতিহাস ১৬শ শতাব্দীর নায়ক শাসনকাল থেকে শুরু।
এই ছবিগুলি সাধারণত কাঠের পাটের ওপর তৈরি হয়, যেখানে সোনার পাত, রত্নখচিত অলংকার ও দেবদেবীর উজ্জ্বল মুখচ্ছবি এক মায়াবী আভা ছড়ায়।
লক্ষ্মী, সরস্বতী, বালকৃষ্ণ বা শ্রী রামের চরিত্রকে এই চিত্রকলায় স্বর্ণাভ দীপ্তিতে ফুটিয়ে তোলা হয়।
আজও এই শিল্প আন্তর্জাতিক পর্যায়ে তামিলনাড়ুর ঐতিহ্য বহন করছে।
🪔 সংস্কৃতি ও সঙ্গীতের তীর্থভূমি
তাঞ্জাভুরকে বলা হয় “Carnatic Music”-এর জন্মস্থান।
চোল রাজাদের পৃষ্ঠপোষকতায় এখানে বিকশিত হয়েছিল দক্ষিণ ভারতের ধ্রুপদী সঙ্গীতধারা।
তাঞ্জাভুর থেকেই উঠে এসেছিলেন ভারতীয় সঙ্গীতজগতের তিন মহারথী—
ত্যাগরাজ, মুত্থুস্বামী দীক্ষিতর ও শ্যামা শাস্ত্রী, যাঁরা “কার্নাটিক ত্রয়ী” নামে পরিচিত।
প্রতিবছর এখানে অনুষ্ঠিত হয় থিরুভাইয়ারু মিউজিক ফেস্টিভ্যাল, যেখানে সারা বিশ্ব থেকে শিল্পীরা ভগবান ত্যাগরাজের স্মৃতিতে সঙ্গীত পরিবেশন করেন।
🏰 তাঞ্জাভুর মারাঠা প্যালেস (Thanjavur Maratha Palace)
চোল যুগের পরে মারাঠা রাজারা তাঁদের রাজধানী গড়েছিলেন এখানেই।
রাজবাড়িটি আজও গর্বভরে দাঁড়িয়ে আছে তার প্রাচীন শৌর্যের স্মৃতি নিয়ে।
এর ভিতরে রয়েছে—
- সুন্দর প্রাচীন চিত্রকলায় সাজানো প্রাসাদ,
- ১৮শ শতাব্দীর রাজা সারফোজি মহারাজের লাইব্রেরি (Saraswathi Mahal Library),
- এবং তাঞ্জাভুর আর্ট গ্যালারি, যেখানে রাখা আছে চোল যুগের বিরল ব্রোঞ্জ মূর্তি।
🌊 কাবেরী নদীর তীরের সৌন্দর্য
তাঞ্জাভুরের পাশ দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে পবিত্র কাবেরী নদী।
সকালবেলা নদীর ঘাটে দাঁড়ালে দেখা যায়— নারীরা ফুল নিয়ে পূজার থালা সাজাচ্ছেন, পুরোহিতরা মন্ত্রপাঠ করছেন, আর বাতাসে বাজছে ঘণ্টাধ্বনি।
এই দৃশ্য যেন দক্ষিণ ভারতের আধ্যাত্মিকতার প্রতিমূর্তি।
🛍️ তাঞ্জাভুরের বিশেষ দ্রব্য
ভ্রমণে এসে কিছু না কিছু সঙ্গে নিয়ে ফেরা তো চাই!
তাঞ্জাভুর বিখ্যাত—
- তাঞ্জাভুর পেইন্টিং
- পিতলের নটরাজ মূর্তি
- দক্ষিণ ভারতীয় সিল্ক ও শাড়ি
- কলা কাঠের কারুকাজ
— এর জন্য।
এগুলোর প্রতিটি জিনিসেই রয়েছে এখানকার সংস্কৃতির ছোঁয়া।
🚉 কীভাবে পৌঁছাবেন
- রেলপথে: চেন্নাই, ত্রিচি, কুম্ভকোনম, মাদুরাই প্রভৃতি শহর থেকে নিয়মিত ট্রেন আসে তাঞ্জাভুর স্টেশনে।
- সড়কপথে: ত্রিচি (৬০ কিমি), কুম্ভকোনম (৪০ কিমি), মাদুরাই (২০০ কিমি) থেকে বাস ও ক্যাব সহজলভ্য।
- বিমানপথে: নিকটতম বিমানবন্দর ত্রিচি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর, যা প্রায় দেড় ঘণ্টার পথ।
🏨 থাকার ব্যবস্থা
তাঞ্জাভুরে ভক্ত ও পর্যটকদের জন্য রয়েছে নানা রকমের হোটেল, লজ ও হেরিটেজ রিসর্ট।
মন্দির সংলগ্ন এলাকায় ভক্তরা ধর্মশালায়ও থাকতে পারেন।
এছাড়াও এখানকার দক্ষিণ ভারতীয় নিরামিষ খাবারের স্বাদ— দোসা, ইডলি, সাম্বর— একবার খেলেই মনে থাকবে চিরকাল।
🌸 সমাপ্তি
তাঞ্জাভুর এমন এক শহর, যেখানে ইতিহাস নিঃশব্দে ফিসফিস করে,
মন্দিরের ঘণ্টাধ্বনি মিলেমিশে যায় কাবেরীর তরঙ্গধ্বনির সঙ্গে,
আর মানুষ আজও শিল্প, ভক্তি ও ঐতিহ্যের মিলনে বেঁচে আছে চোল রাজাদের উত্তরাধিকার বহন করে।
তাই বলা যায়—
তাঞ্জাভুর কেবল একটি গন্তব্য নয়, এটি এক অনুভব, এক তীর্থ, এক চিরন্তন দক্ষিণ ভারতের আত্মা।

