উদয়গিরি ও খণ্ডগিরি গুহা—প্রাচীন ভারতীয় ইতিহাস, ধর্ম, ও স্থাপত্যকলার এক অনবদ্য নিদর্শন।
ওড়িশার উদয়গিরি-খণ্ডগিরি গুহা : ইতিহাস ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের অনন্য সংমিশ্রণ।
ওড়িশা রাজ্যের রাজধানী ভুবনেশ্বর থেকে মাত্র ছয় কিলোমিটার দূরে অবস্থিত উদয়গিরি ও খণ্ডগিরি গুহা—প্রাচীন ভারতীয় ইতিহাস, ধর্ম, ও স্থাপত্যকলার এক অনবদ্য নিদর্শন। এই গুহাগুলি শুধু পর্যটকদের নয়, ইতিহাসপ্রেমী, গবেষক, এবং ভ্রমণপিপাসু সকলের কাছেই এক আকর্ষণীয় স্থান। পাহাড় কেটে তৈরি এই গুহাগুলি একদিকে যেমন জৈন ধর্মের প্রাচীন ঐতিহ্যের সাক্ষী, তেমনি অন্যদিকে প্রকৃতির শান্ত সৌন্দর্যে মোড়া এক অনন্য ভ্রমণ গন্তব্য।
🏞️ ইতিহাসের প্রেক্ষাপট
উদয়গিরি ও খণ্ডগিরি গুহার নির্মাণকাল খ্রিস্টপূর্ব দ্বিতীয় শতাব্দী, যখন মগধের রাজা অশোকের পুত্র খারবেল কଳিঙ্গ রাজ্য শাসন করতেন। হাথীগুম্ফা শিলালিপি নামের এক বিখ্যাত শিলালেখে খারবেলের শাসনকাল, তাঁর বিজয়গাথা ও দান-ধ্যান-সংযমের কথা খোদাই করা আছে। এই শিলালিপি শুধু ভারতের প্রাচীন ইতিহাসেরই নয়, বরং সমগ্র দক্ষিণ এশিয়ার ইতিহাসের এক মূল্যবান দলিল।
এই গুহাগুলি মূলত জৈন সন্ন্যাসীদের ধ্যান, বাস ও তপস্যার জন্য নির্মিত হয়েছিল। গুহাগুলির দেওয়ালজুড়ে রয়েছে নানা প্রতীক, খোদাই করা প্রাণীচিত্র, এবং দেব-দেবীর উৎকৃষ্ট ভাস্কর্য—যা প্রমাণ করে সে যুগের শিল্প ও ধর্মের মিলনকে।
🏔️ উদয়গিরি : সূর্যোদয়ের পাহাড়
‘উদয়গিরি’ শব্দের অর্থই হলো ‘সূর্যোদয়ের পাহাড়’। এখানে মোট ১৮টি গুহা রয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বিখ্যাত হলো হাথীগুম্ফা (হাতি গুহা), যেখানে রাজা খারবেলের জীবনবৃত্তান্ত শিলালিপি আকারে উৎকীর্ণ।
আরও কয়েকটি বিখ্যাত গুহা হলো –
- রাণীগুম্ফা : দুই তলা বিশিষ্ট এই গুহাটি সবচেয়ে বড় ও স্থাপত্যদৃষ্টিতে সমৃদ্ধ। এর দেওয়ালে যুদ্ধ, শিকার, উৎসব এবং নৃত্যচিত্র খোদাই করা আছে।
- গণেশগুম্ফা : এখানে গনেশদেবতার মতো এক ভাস্কর্য দেখা যায়।
- বাগগুম্ফা ও পঞ্চগুম্ফা : ধ্যানমগ্ন সন্ন্যাসীদের প্রতীকী আশ্রয়স্থল হিসেবে এই গুহাগুলি পরিচিত।
উদয়গিরির গুহাগুলি সূর্যের আলোয় এমনভাবে স্থাপিত যে ভোরবেলা এখানে সূর্যোদয়ের দৃশ্য সত্যিই মনোমুগ্ধকর।
🌄 খণ্ডগিরি : নীরবতার নিবাস
উদয়গিরির ঠিক বিপরীতে অবস্থিত খণ্ডগিরি, যেখানে রয়েছে ১৫টি গুহা। তুলনায় কিছুটা ছোট হলেও এখানকার গুহাগুলি শান্ত, নির্জন ও ধ্যানের উপযোগী।
অনন্তগুম্ফা, তৎগুম্ফা, অম্বিকা গুম্ফা—প্রত্যেকটিরই নিজস্ব স্থাপত্যশৈলী রয়েছে। অম্বিকা গুম্ফায় দেবী অম্বিকার এক মনোরম ভাস্কর্য রয়েছে, যিনি জৈন ধর্মে শক্তির প্রতীক।
খণ্ডগিরির উপরে উঠলে নিচে দেখা যায় গোটা ভুবনেশ্বর শহর। দূরে দেখা যায় প্রাচীন মন্দিরগুলির চূড়া, আর চারপাশে সবুজে ঘেরা দৃশ্য যেন মনকে ভরে তোলে।
🌿 প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও বর্তমান আকর্ষণ
উদয়গিরি-খণ্ডগিরি শুধু ইতিহাস নয়, প্রকৃতির সৌন্দর্যের দিক থেকেও অপূর্ব। শীতল হাওয়া, সবুজ বনভূমি, আর পাথরের খোদাই করা গুহাগুলির মধ্যে ঘুরে বেড়াতে বেড়াতে এক ধরনের শান্তি অনুভব হয়।
এখনকার দিনে এই স্থানটি পুরাতত্ত্ব বিভাগ (ASI)-এর অধীনে সংরক্ষিত। প্রতিদিন দেশি-বিদেশি বহু পর্যটক এখানে ভিড় করেন। বিশেষত শীতকালে, যখন আকাশ পরিষ্কার থাকে, তখন এই স্থান ঘুরে দেখা সত্যিই আনন্দের।
🕉️ ধর্ম, সংস্কৃতি ও আধ্যাত্মিকতা
উদয়গিরি ও খণ্ডগিরি জৈন ধর্মের পবিত্র তীর্থস্থান হিসেবে বিবেচিত। প্রতি বছর মহাবীর জয়ন্তী উপলক্ষে এখানে হাজার হাজার ভক্ত সমবেত হন। পাহাড়ের চূড়ায় স্থাপিত জৈন মন্দির থেকে প্রার্থনার ধ্বনি প্রতিধ্বনিত হয়ে গোটা অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে।
🚗 কীভাবে পৌঁছানো যায়
ভুবনেশ্বর শহর থেকে ট্যাক্সি, অটো বা বাসে সহজেই উদয়গিরি-খণ্ডগিরি পৌঁছানো যায়।
- দূরত্ব: প্রায় ৬ কিমি।
- নিকটতম রেলস্টেশন: ভুবনেশ্বর জংশন।
- নিকটতম বিমানবন্দর: ভুবনেশ্বর বিমানবন্দর।
🌅 উপসংহার
উদয়গিরি ও খণ্ডগিরি গুহা কেবল পাথরে খোদাই করা ইতিহাস নয়, এটি ভারতীয় সভ্যতার এক গভীর প্রতিচ্ছবি। এখানে এসে মনে হয়, আমরা যেন সময়ের স্রোত বেয়ে ফিরে গেছি দুই হাজার বছর আগে—যখন রাজা খারবেল তাঁর ধর্মনিষ্ঠ রাজত্বের প্রতীক হিসেবে এই স্থাপত্যের সৃষ্টি করেছিলেন।
ইতিহাস, স্থাপত্য, ধর্ম, আর প্রকৃতির মেলবন্ধনে গঠিত এই গুহাগুলি নিঃসন্দেহে ওড়িশার গর্ব, এবং ভারতীয় ঐতিহ্যের এক অনন্য রত্ন।

