এক বিস্ময়কর স্থাপত্য নিদর্শন হলো ভুলভুলাইয়া, যা লখনৌর অন্যতম জনপ্রিয় পর্যটন কেন্দ্র।
ভারতের উত্তর প্রদেশের রাজধানী লখনৌ, নবাবি ঐতিহ্য ও সাংস্কৃতিক ঐশ্বর্যের শহর হিসেবে পরিচিত। এখানকার প্রতিটি স্থাপত্য, প্রতিটি গলি যেন অতীতের গল্প বলে। এমনই এক বিস্ময়কর স্থাপত্য নিদর্শন হলো ভুলভুলাইয়া, যা লখনৌর অন্যতম জনপ্রিয় পর্যটন কেন্দ্র। এটি মূলত বড় ইমামবাড়ার অংশ, কিন্তু এর রহস্যময় পথঘাট আর অনন্য স্থাপত্য কৌশল একে আলাদা পরিচয় দিয়েছে।
🕌 ভুলভুলাইয়ার ইতিহাস
১৮ শতকের শেষ দিকে নবাব আসফ-উদ-দৌলা লখনৌতে যখন দুর্ভিক্ষে বিপন্ন প্রজাদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে চাইলেন, তখন তিনি এই বিশাল ইমামবাড়ার নির্মাণ শুরু করেন (১৭৮৪ খ্রিষ্টাব্দে)। এই ইমামবাড়ারই উপরের অংশে তৈরি হয়েছিল অদ্ভুত এক গোলকধাঁধা — “ভুলভুলাইয়া”।
স্থপতি ছিলেন কিফায়াতউল্লাহ, যিনি চমৎকারভাবে মোগল ও অওধ স্থাপত্যশৈলীর সংমিশ্রণ ঘটিয়েছিলেন। এই স্থাপত্যে ব্যবহৃত হয়েছে কোনো ধরনের লোহার গার্ডার বা বিম নয়; বরং সম্পূর্ণ ইট, চুন ও সুরকি দিয়ে এমনভাবে নির্মাণ করা হয়েছে যে আজও তা অটুট রয়েছে।
🧭 স্থাপত্য ও রহস্যময় নকশা
ভুলভুলাইয়া মূলত এক বিশাল গোলকধাঁধা, যেখানে প্রায় এক হাজারেরও বেশি সংকীর্ণ পথ ও ৪৮৯টি দরজা রয়েছে। কিছু দরজা অন্ধপথে শেষ হয়, কিছু আবার এমনভাবে ঘুরে যায় যে পথ চিনে না এলে সহজেই কেউ হারিয়ে যেতে পারে।
ছাদের উপর দিয়ে হাঁটলে একদমই বোঝা যায় না কোন পথটি আসল এবং কোনটি ফাঁদ। এখানকার স্থাপত্য এমনভাবে তৈরি যে একটি কোণে ফিসফিস করলে তা অন্য কোণে গিয়ে শোনা যায় — এটি ছিল নবাবের প্রহরী ব্যবস্থার একটি কৌশলগত দিক।
ভুলভুলাইয়ার প্রতিটি দেয়াল ও গম্বুজে সূক্ষ্ম কারুকার্য রয়েছে। সূর্যালোকের প্রতিফলনে এর করিডরগুলো এক অদ্ভুত আভা তৈরি করে, যা রহস্যময়তার আবেশ বাড়িয়ে দেয়।
🌆 ভ্রমণের অভিজ্ঞতা
ভুলভুলাইয়ায় প্রবেশ করতেই মনে হবে যেন আপনি ইতিহাসের এক জাদুকরী দুনিয়ায় প্রবেশ করেছেন। গাইড ছাড়া প্রবেশ করা বিপজ্জনক, কারণ পথ চিনে না থাকলে সহজেই কেউ হারিয়ে যেতে পারে। গাইডরা পর্যটকদের বিভিন্ন গোপন পথ, ফিসফিস কক্ষ এবং দৃশ্যমানতার কৌশল দেখিয়ে মুগ্ধ করে দেন।
ছাদের উপরে উঠে পুরো লখনৌ শহরকে এক নজরে দেখা যায়। বিশেষ করে সূর্যাস্তের সময়ের দৃশ্য— যখন সোনালি আলোয় শহর ভাসে, তখন ভুলভুলাইয়া এক স্বপ্নিল আবেশ ছড়ায়।
🕌 কাছাকাছি দর্শনীয় স্থানসমূহ
ভুলভুলাইয়া ঘুরে দেখে নেওয়া যেতে পারে—
- বড় ইমামবাড়া – নবাব আসফ-উদ-দৌলার কীর্তি, যেখানে মূল সমাধিক্ষেত্র।
- ছোট ইমামবাড়া – উজ্জ্বল ঝাড়বাতি ও ইসলামিক শিল্পকলা দেখার জন্য বিখ্যাত।
- রুমি দরওয়াজা – তুর্কি স্থাপত্যশৈলীতে নির্মিত ঐতিহাসিক প্রবেশদ্বার।
- ঘড়িঘর (Clock Tower) – ভারতের সর্বোচ্চ ঘড়িঘরগুলির একটি।
💡 কিছু ভ্রমণ পরামর্শ
- ভ্রমণের সেরা সময়: অক্টোবর থেকে মার্চ পর্যন্ত, যখন আবহাওয়া শীতল ও আরামদায়ক।
- প্রবেশ ফি: ভারতীয়দের জন্য প্রায় ₹২৫ এবং বিদেশি পর্যটকদের জন্য ₹৩০০ (পরিবর্তনশীল)।
- সময়সূচি: সকাল ৬টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত খোলা থাকে।
- গাইড নেওয়া জরুরি, নইলে ভুলভুলাইয়ার জটিল পথ ঘুরে বিভ্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা প্রবল।
🌸 শেষকথা
লখনৌর ভুলভুলাইয়া শুধু একটি স্থাপত্য নয়, এটি এক রহস্য, এক শিল্পকীর্তি এবং এক ঐতিহাসিক মহিমা। নবাবি আমলের সেই গৌরব, স্থাপত্যের সূক্ষ্মতা ও রহস্যের মিশেল একে ভারতের অন্যতম বিস্ময়কর স্থান করে তুলেছে।
যে কেউ ইতিহাস, স্থাপত্য বা রহস্য ভালোবাসেন — তাঁদের জন্য লখনৌর ভুলভুলাইয়া এক অবিস্মরণীয় গন্তব্য। এটি একবার দেখলে বোঝা যায়, কেন লখনৌকে বলা হয় “শহর-এ-আদাব ও ইশ্ক” — শালীনতা, সৌন্দর্য আর ইতিহাসের মেলবন্ধনের এক অমলিন উদাহরণ এই ভুলভুলাইয়া।

