ত্রিপুরা রাজ্যের রাজধানী আগরতলার বুকে দাঁড়িয়ে আছে এক অনন্য স্থাপত্যের সাক্ষী — উজয়ন্ত প্যালেস।

ত্রিপুরার উজয়ন্ত প্যালেস – ঐতিহ্য, শিল্প ও রাজকীয় গৌরবের এক স্বপ্নপুরী। ত্রিপুরা রাজ্যের রাজধানী আগরতলার বুকে দাঁড়িয়ে আছে এক অনন্য স্থাপত্যের সাক্ষী — উজয়ন্ত প্যালেস। এটি শুধু রাজপ্রাসাদ নয়, এটি এক ঐতিহাসিক রত্ন, যেখানে অতীতের রাজকীয় ঐশ্বর্য, স্থাপত্যকলার সৌন্দর্য এবং সংস্কৃতির ঐতিহ্য একসাথে মিশে গেছে। উজয়ন্ত প্যালেস যেন ত্রিপুরার মুকুটে ঝলমলে এক হীরকখণ্ড।


🏰 উজয়ন্ত প্যালেসের ইতিহাস

উজয়ন্ত প্যালেস নির্মাণ করেন ত্রিপুরার মহারাজা রাধাকিশোর মাণিক্য বাহাদুর। ১৯০১ সালে এর কাজ শুরু হয় এবং ১৯০৪ সালে প্রাসাদটির নির্মাণ সম্পূর্ণ হয়।
প্রাসাদের নামকরণ করা হয় মহারাজার পুত্র উজয় মাণিক্যের নামে।
ইংরেজ স্থপতি মার্টিন ও বার্নস এই প্রাসাদটি ডিজাইন করেন, এবং এর স্থাপত্যে ইউরোপীয় নিও-ক্লাসিকাল শৈলীর গভীর প্রভাব দেখা যায়।

প্রাচীন ত্রিপুরার রাজারা দীর্ঘকাল ধরে আগরতলাকে রাজধানী হিসেবে গড়ে তুলেছিলেন, আর উজয়ন্ত প্যালেস সেই গৌরবের সর্বোচ্চ নিদর্শন। আজ এটি রাজপরিবারের স্মৃতি বহন করে, তবে বর্তমানে এটি ত্রিপুরা রাজ্য জাদুঘর হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।


🌿 স্থাপত্যের জৌলুস

উজয়ন্ত প্যালেস তিন তলা বিশিষ্ট এক বিশাল প্রাসাদ।
এর গম্বুজ, মিনার, বিশাল প্রবেশদ্বার, ফুলেল নকশা, আর প্রশস্ত বারান্দা—সব মিলিয়ে এক অপূর্ব স্থাপত্যের নিদর্শন।

  • প্রাসাদের মধ্য গম্বুজটির উচ্চতা প্রায় ২৬ মিটার, যা দূর থেকেই নজর কাড়ে।
  • চারপাশে সুন্দর লেক ও বাগান, যেখানে পদ্মফুল, জলপদ্ম, আর নানা প্রজাতির বৃক্ষরাজি সৌন্দর্য বাড়িয়ে তোলে।
  • ভিতরের মার্বেল পাথরের মেঝে, বর্ণিল গ্লাস জানালা, ও রাজকীয় সভাকক্ষের অলঙ্করণ প্রাচীন রাজাদের ঐশ্বর্যের আভাস দেয়।

🖼️ উজয়ন্ত প্যালেস জাদুঘর

বর্তমানে উজয়ন্ত প্যালেসকে ত্রিপুরা রাজ্য জাদুঘর (Tripura State Museum) হিসেবে গড়ে তোলা হয়েছে।
এখানে সংরক্ষিত আছে:

  • রাজপরিবারের ব্যবহৃত অলঙ্কার, পোশাক ও আসবাবপত্র,
  • প্রাচীন ত্রিপুরা রাজ্যের শিলালিপি ও মুদ্রা,
  • বিভিন্ন উপজাতির জীবনধারা, সংস্কৃতি, নৃত্য ও বাদ্যযন্ত্রের নিদর্শন,
  • বৌদ্ধ ও হিন্দু শিল্পকর্মের অসাধারণ সংগ্রহ।

এই জাদুঘর শুধু ইতিহাস নয়, বরং ত্রিপুরার বহুমাত্রিক সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে তুলে ধরে।


🌸 প্রাসাদের প্রাঙ্গণ ও আশপাশের সৌন্দর্য

উজয়ন্ত প্যালেসের চারপাশে যতদূর চোখ যায়, ততদূর ছড়িয়ে আছে সবুজ ঘাসের প্রান্তর, মনোহর ফুলের বাগান এবং জলাশয়।
প্রাসাদের লেকের ধারে বসে সূর্যাস্ত দেখা মানেই রাজকীয় প্রশান্তির এক অপূর্ব অনুভূতি।
রাতে প্রাসাদটি আলোকসজ্জায় ঝলমল করে ওঠে—তখন মনে হয় যেন আগরতলার আকাশে এক প্রাসাদ-স্বপ্ন জেগে উঠেছে।


🛣️ কিভাবে যাবেন

  • অবস্থান: আগরতলার হৃদয়স্থলে, মহারাজা বীর বিক্রম এয়ারপোর্ট থেকে প্রায় ৩ কিমি দূরে।
  • যাতায়াত: রেল, সড়ক ও বিমানপথে আগরতলা সহজেই পৌঁছানো যায়।
    বিমানযোগে কলকাতা, গৌহাটি বা দিল্লি থেকে আগরতলা যাওয়া যায়।
  • শহরের কেন্দ্র থেকে অটো বা ট্যাক্সিতে প্রাসাদে সহজেই পৌঁছানো যায়।

🍴 কোথায় থাকবেন ও কী দেখবেন

আগরতলায় বিভিন্ন মানের হোটেল ও রিসর্ট রয়েছে—Tripura Tourism-এর অতিথিশালা ছাড়াও প্রাইভেট হোটেলগুলিতে থাকা যায়।
উজয়ন্ত প্যালেস ছাড়াও আগরতলা ভ্রমণে দেখতে পারেন—

  • নেহরু পার্ক,
  • হেরিটেজ পার্ক,
  • জগন্নাথ মন্দির,
  • মাতা ত্রিপুরেশ্বরী মন্দির (উদয়পুর)

🌞 ভ্রমণের সেরা সময়

অক্টোবর থেকে মার্চ — এ সময়ের আবহাওয়া সবচেয়ে মনোরম।
গ্রীষ্মে তাপমাত্রা কিছুটা বেশি হলেও সকালে ও বিকেলে ঘোরার উপযোগী।


💐 উপসংহার

উজয়ন্ত প্যালেস কেবল একটি রাজপ্রাসাদ নয়, এটি ত্রিপুরার গৌরবময় ইতিহাসের প্রতীক।
এখানে দাঁড়িয়ে আপনি দেখতে পাবেন রাজকীয় ঐশ্বর্যের সঙ্গে বাঙালি ও ত্রিপুরী সংস্কৃতির অপূর্ব সংমিশ্রণ।
সবুজে ঘেরা সেই সাদা প্রাসাদ যেন আজও বলে—
“অতীত কখনও মরে না, সে সৌন্দর্যের মধ্যে চিরজীবী।”


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *