হায়দরাবাদের উপকণ্ঠে অবস্থিত রামোজি ফিল্ম সিটি শুধু একটি পর্যটন কেন্দ্র নয়, এটি যেন সিনেমার এক জীবন্ত দুনিয়া।
ভারতের দক্ষিণাঞ্চলের তেলেঙ্গানা রাজ্যের রাজধানী হায়দরাবাদের উপকণ্ঠে অবস্থিত রামোজি ফিল্ম সিটি শুধু একটি পর্যটন কেন্দ্র নয়, এটি যেন সিনেমার এক জীবন্ত দুনিয়া। বিশ্বের সবচেয়ে বড় ফিল্ম সিটি হিসেবে গিনেস বুক অফ ওয়ার্ল্ড রেকর্ডসে নাম থাকা এই জায়গাটি এক কথায় ভারতের চলচ্চিত্র জগতের গর্ব। প্রকৃতি, কল্পনা, প্রযুক্তি আর সংস্কৃতির মিশেলে রামোজি ফিল্ম সিটি যেন এক জাদুর সাম্রাজ্য, যেখানে প্রতিটি কোণায় গল্পের জন্ম হয়, আর স্বপ্ন পায় জীবন্ত রূপ।
🌆 রামোজি ফিল্ম সিটির ইতিহাস
১৯৯৬ সালে বিশিষ্ট চলচ্চিত্র প্রযোজক ও উদ্যোক্তা রামোজি রাও-এর হাত ধরে গড়ে ওঠে এই বিশাল ফিল্ম সিটি। তাঁর উদ্দেশ্য ছিল এমন একটি স্থান তৈরি করা, যেখানে সিনেমা নির্মাণের সমস্ত প্রক্রিয়া—শুটিং, সম্পাদনা, সেট ডিজাইন, পোস্ট প্রোডাকশন—একই ছাদের নিচে সম্পন্ন করা যাবে। প্রায় ২০০০ একর জমি জুড়ে বিস্তৃত এই ফিল্ম সিটি আজ শুধু সিনেমা নয়, পর্যটকদের জন্যও এক অসাধারণ আকর্ষণ।
🎬 ফিল্ম সিটির অভ্যন্তর
রামোজি ফিল্ম সিটিতে প্রবেশ করলেই মনে হয়, যেন অন্য এক জগতে চলে এসেছি। এখানে বাস্তবের সঙ্গে মিলেমিশে থাকে কল্পনা ও রঙিন কাহিনিরা।
🎥 চলচ্চিত্র সেট ও স্টুডিও
এখানে রয়েছে বিশাল স্টুডিও, রাজপ্রাসাদ, ইউরোপীয় শহরের প্রতিলিপি, মন্দির, বিমানবন্দর, রেলস্টেশন, গ্রাম, শহর — যা যা সিনেমার গল্পে লাগে, সবই এখানে প্রস্তুত। ভারতের বহু জনপ্রিয় সিনেমা যেমন বাহুবলী, চেন্নাই এক্সপ্রেস, খুশি ইত্যাদির দৃশ্য এখানে ধারণ করা হয়েছে।
🌸 বাগান ও থিম জোন
ফিল্ম সিটির একেকটি গার্ডেন যেন একেকটি শিল্পকর্ম। মুঘল গার্ডেন, মার্বেল গার্ডেন, ফ্লোরাল কিংডম, এবং জাপানি গার্ডেন দর্শকদের মোহিত করে। চারিদিকে রঙিন ফুল, ছায়াময় গাছ আর জলপ্রপাতের শব্দে পরিবেশ হয়ে ওঠে মায়াবী।
🏰 থিম পার্ক ও রাইড
শিশু ও পরিবারের জন্য রয়েছে নানা রাইড — ফান টাইম থিম পার্ক, অ্যাডভেঞ্চার জোন, বাটারফ্লাই পার্ক, বার্ড পার্ক, ও স্টান্ট শো এরিনা। থ্রিলার সিনেমার মতো এখানে চলতে থাকে লাইভ স্টান্ট ও কার অ্যাকশন শো, যা দর্শকদের উত্তেজনায় ভরিয়ে তোলে।
🌇 সন্ধ্যার লাইট অ্যান্ড সাউন্ড শো
সন্ধ্যা নামলে রামোজি ফিল্ম সিটি যেন আলোয় ঝলমল করে ওঠে। বিশাল গেট, ফোয়ারা, রাস্তা ও ভবনগুলো আলোয় সেজে ওঠে, সঙ্গে বাজতে থাকে সিনেমার সুর। লাইট অ্যান্ড সাউন্ড শো-এর মাধ্যমে ফিল্ম সিটির ইতিহাস ও ভারতের সিনেমার গৌরবময় যাত্রা তুলে ধরা হয়।
🍴 খাবার ও বিশ্রামের জায়গা
রামোজি ফিল্ম সিটির ভেতরে রয়েছে নানা রেস্তোরাঁ ও কফি কর্নার। দক্ষিণ ভারতীয় দোসা থেকে উত্তর ভারতীয় বিরিয়ানি—সবই পাওয়া যায়। চাইলে পর্যটকরা এখানকার বিলাসবহুল হোটেল সিতারা বা মধ্যম মানের তারা কমফোর্টস-এ রাত্রিযাপন করতে পারেন।
🛍️ স্মারক সংগ্রহ ও শপিং
ফিল্ম সিটির ভিতরে রয়েছে “মেমরি লেন” নামের দোকান, যেখানে বিক্রি হয় চলচ্চিত্র-সংক্রান্ত সামগ্রী, হস্তশিল্প, মগ, টি-শার্ট, ও ছোট ছোট স্মারক যা আপনার ভ্রমণের স্মৃতি হিসেবে সংরক্ষণ করতে পারবেন।
🚌 কীভাবে পৌঁছাবেন
রামোজি ফিল্ম সিটি হায়দরাবাদ শহর থেকে প্রায় ৩০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। হায়দরাবাদ বিমানবন্দর বা রেলস্টেশন থেকে ট্যাক্সি, ক্যাব কিংবা বিশেষ ট্যুর বাসে সহজেই পৌঁছানো যায়। অনলাইনে টিকিট বুক করলে ভিড় এড়ানো যায় এবং ডিসকাউন্টও পাওয়া যায়।
📸 ভ্রমণকারীর অভিজ্ঞতা
যারা একবার এখানে এসেছেন, তাঁদের মতে রামোজি ফিল্ম সিটি এমন এক জায়গা যেখানে “বাস্তব ও কল্পনা একসাথে হাঁটে।” প্রতিটি কোণায় গল্পের গন্ধ, প্রতিটি দৃশ্যে সিনেমার ছোঁয়া। সকালে ঘোরা শুরু করলে সন্ধ্যা পর্যন্ত সময় কেটে যায় কখন যে তা টেরই পাওয়া যায় না।
🌟 শেষ কথা
রামোজি ফিল্ম সিটি শুধু ভারতের সিনেমা জগতের প্রতীক নয়, এটি ভারতীয় সংস্কৃতি ও সৃজনশীলতার এক জীবন্ত উদাহরণ। এখানে ঘুরতে এসে মনে হয় — আমরা যেন এক মুহূর্তের জন্য চলচ্চিত্রের অংশ হয়ে গেছি।
যদি আপনি সিনেমা ভালোবাসেন, ভ্রমণ ভালোবাসেন, আর রূপালি পর্দার জগতে একটু হাঁটতে চান — তাহলে রামোজি ফিল্ম সিটি হবে আপনার জন্য এক অবিস্মরণীয় গন্তব্য।
✈️ রামোজি ফিল্ম সিটি — যেখানে প্রতিটি মুহূর্ত এক একটি দৃশ্য, আর প্রতিটি ভ্রমণ এক একটি সিনেমা! 🎥✨

