বিহারের পাটনা সাহিব — শিখ ধর্মের পবিত্র তীর্থভূমি ।
ভারতের পূর্বাঞ্চলের ঐতিহ্যবাহী রাজ্য বিহারের রাজধানী পাটনা, ইতিহাস ও সংস্কৃতির এক উজ্জ্বল প্রতীক। এই শহরের অন্যতম আধ্যাত্মিক কেন্দ্র হলো তক্ষশ্রী হরমন্দির জি পাটনা সাহিব (Takht Sri Harmandir Ji Patna Sahib), যা বিশ্বজুড়ে শিখ ধর্মাবলম্বীদের কাছে এক পরম পবিত্র স্থান। এই পবিত্র গুরদ্বারাই পাটনা সাহিব নামে পরিচিত, যেখানে জন্মগ্রহণ করেছিলেন দশম শিখ গুরু — গুরু গোবিন্দ সিংজি মহারাজ।
🕊️ ইতিহাসের পটভূমি
১৭ শতকে, ১৬৬৬ সালের ২২ ডিসেম্বর এই শহরে জন্ম নেন শিখ ধর্মের দশম গুরু গুরু গোবিন্দ সিংজি। তিনি ছিলেন ধর্ম, সাহস, মানবতা ও ন্যায়ের প্রতীক। গুরুজির জন্মস্থলেই পরবর্তীকালে মহারাজা রঞ্জিত সিং-এর উদ্যোগে নির্মিত হয় এই অসাধারণ তক্ষশ্রী হরমন্দির জি।
পাটনা সাহিব শুধু গুরু গোবিন্দ সিংজির জন্মভূমিই নয়, এটি একাধারে শিখ ধর্মের পাঁচটি সর্বোচ্চ “তক্ষতের” (আধ্যাত্মিক সিংহাসন) অন্যতম। বাকি চারটি তক্ষত হলো — অমৃতসরের আকাল তখত, আনন্দপুর সাহিব, নান্দেদ সাহিব ও হযর সাহিব।
🕌 স্থাপত্য ও পরিবেশ
পাটনা সাহিব গুরদ্বারার স্থাপত্য শিখ শিল্প ও মুঘল স্থাপত্যের এক অনন্য মেলবন্ধন। শুভ্র মার্বেল পাথরের প্রাচীর, সোনালি গম্বুজ, সূক্ষ্ম খোদাই করা জানালা ও উঁচু মিনার এই গুরদ্বারাকে আরও মহিমান্বিত করেছে।
ভিতরে প্রবেশ করলেই শোনা যায় “ওয়াহেগুরু” নামের ধ্বনি, যা পুরো পরিবেশকে ভরে তোলে এক অদ্ভুত শান্তি ও পবিত্রতায়। ভক্তরা প্রার্থনা করেন, আর গুরবাণী কীর্তনের সুরে মন ভরে যায়।
গুরদ্বারার অভ্যন্তরে রয়েছে গুরু গোবিন্দ সিংজির ব্যবহৃত কিছু ঐতিহাসিক বস্তু — তাঁর তরবারি, ছোট বাল্যকালীন জুতা ও লেখা পুঁথি, যা ইতিহাসের এক অমূল্য ধন।
🙏 ধর্মীয় গুরুত্ব
পাটনা সাহিব কেবল এক ধর্মীয় স্থান নয়, এটি মানবতা ও ঐক্যের প্রতীক। গুরু গোবিন্দ সিংজির শিক্ষা — “মানবতার সেবা, সাহস, সত্য ও ন্যায়ের পথে অটল থাকা” — এখানকার প্রতিটি প্রার্থনার মধ্যে জীবন্ত।
প্রতিবছর ডিসেম্বর মাসে গুরুজির জন্মজয়ন্তী উপলক্ষে হাজার হাজার শিখ ভক্ত এখানে সমবেত হন। এই উৎসবের সময় গুরদ্বারা প্রাঙ্গণ আলোকিত হয়ে ওঠে, সাজানো হয় ফুল ও পতাকায়, আর আকাশময় ভেসে বেড়ায় “ওয়াহেগুরু জি কা খালসা, ওয়াহেগুরু জি কি ফতেহ” ধ্বনি।
🍛 লঙ্গর — সেবার এক অনন্য উদাহরণ
পাটনা সাহিবে গেলে যে জিনিসটি না দেখে ফেরা অসম্ভব, তা হলো লঙ্গর (Langar) — শিখ ধর্মের সেই বিখ্যাত বিনামূল্যের সামষ্টিক ভোজন ব্যবস্থা। এখানে জাতি, ধর্ম বা অর্থভেদ নেই; সবাই একসঙ্গে বসে খায়, সেবা করে, এবং মানবতার এক অদ্ভুত বন্ধনে যুক্ত হয়।
🛕 আশেপাশের দর্শনীয় স্থান
পাটনা সাহিবের আশেপাশেও দেখা যায় অনেক ঐতিহাসিক স্থান —
- গুরু কা বাগ গুরদ্বারা
- বাল লীলা গুরদ্বারা
- তক্ষত শ্রী হরমন্দির সাহিব মিউজিয়াম
- পাটনা মিউজিয়াম ও গোলঘর
এই স্থানগুলো ভ্রমণকে আরও সমৃদ্ধ করে তোলে।
🚉 যাত্রাপথ
পাটনা শহর ভারতের প্রায় সব বড় শহরের সঙ্গে রেল, সড়ক ও বিমানপথে যুক্ত। লোকনায়ক জয়প্রকাশ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে গুরদ্বারায় পৌঁছাতে মাত্র ১৫–২০ মিনিট লাগে। পাটনা জংশন রেলস্টেশন থেকেও ট্যাক্সি বা অটোয় সহজেই যাওয়া যায়।
🌅 উপসংহার
পাটনা সাহিব কেবল একটি ধর্মীয় কেন্দ্র নয়; এটি আধ্যাত্মিক শান্তি, মানবতা ও ঐক্যের এক জীবন্ত প্রতীক। এখানে এসে মনে হয়, মানব জীবনের মূল বার্তা হলো সেবা, সাহস ও শ্রদ্ধা।
শান্ত প্রার্থনার সুর, গুরবাণীর মিষ্টি ধ্বনি ও লঙ্গরের ঐক্যের বার্তা — সব মিলিয়ে পাটনা সাহিব এমন এক স্থান, যেখানে আত্মা সত্যিই পরিশুদ্ধ হয়।
✨
পাটনা সাহিব — ভক্তির স্পর্শে ইতিহাস, মানবতার আলোয় ধন্য এক পবিত্র ভূমি। 🌼

