জীবন : ঊষসী মুখোপাধ্যায়।।।

ভালো আর মন্দ এই নিয়েই মানুষের জীবন। নদীর ঢেউয়ের মতোই তার ওঠা আর পড়া। নদীর ঢেউয়ের সাথে তুলনা করলে একটা সাদৃশ্য থেকেই যায়। নদী গিয়ে হাজির হয় সমুদ্রে। মানুষের জীবন শেষ হয় মৃত্যুতে। দুটি প্রবাহের মধ্যে কিন্তু পার্থক্য অনেক। নদীর অন্তে মহাজীবন আর মানুষের জীবনের অন্তে মুছে যাওয়া। যদি কেও মনে রাখে, সেও কিছুদিনের জন্য। আর সেই মনে রাখায় সবসময় শ্রদ্ধার স্মরণ থাকবে তা নয়। মানুষ চলে যাওয়ার পরেও যাঁরা থাকবেন- আত্মীয়-স্বজন, ঘনিষ্ঠজন তাঁরা বসবেন বিশ্লষণে। কারও ভাগ্যে নির্ভেজাল শ্রদ্ধার স্মরণ, প্রশংসা জুটবে বলে মনে হয় না। একদল মানুষ যাঁকে মাথায় তুলবেন আর একদল তাঁকে পায়ে ফেলবেন। পৃথিবীতে নিয়ন্ত্রণ করছে দুটি শক্তি। একটি প্রাকৃতিক আর একটি মানবিক। প্রাকৃতিক শক্তি কারও তোয়াক্কা করে না। জল , ঝড়, ভূমিকম্প, জলোচ্ছ্বাস কোনওটাই মানুষের মুখ চেয়ে হয় না। প্রকৃতির ইচ্ছা। তখন মনে হতে পারে মানুষ কার পৃথিবীতে বাস করছে! যেখানে তার মতামতের দাম নেই। এবার বলি মানবিক যে ব্যাপারটা, সেটাও অনেকগুলো শর্ত নির্ভর। যে মানুষ একটি গোষ্ঠীর কাছে প্রিয় বা শ্রদ্ধেয় আর একটি গোষ্ঠীর কাছে তাঁর স্থান মাটির ধূলোয়। এই রাজনীতির জগতে এটা প্রতিনিয়ত দেখা যায়।
এই পৃথিবীতে আসা মানেই তো একটি পরিবারে আসা। আর ‘পরিবার’ এক সাংঘাতিক ফাঁদ। এই পারিবারিক মানুষের ভাগ্যে চিরকাল প্রশংসা জুটবে এমন ভাবাটাই অন্যায়। কেউ বলবে ভালো, কেউ বলবে খারাপ, কেউ বলবে স্বার্থপর। এই পৃথিবীতে আসাটাই একটা বড়ো অপরাধ।
সত্যি! বেঁচে থাকাটা কি মাদারিকা খেল? অদৃশ্য এক দড়ি ধরে মন নেমে যাচ্ছে গ্রেট ক্যানিয়নে। অজানা এক জগৎ। ঘন অন্ধকার । অচেনা পরিবেশ ও প্রাণী। পাতাল কত নীচে, স্বর্গ কত ওপরে। এরই মাঝখানে লক্ষ কোটি মানুষের গুতোগুঁতি।
কী অনিশ্চিত এই জীবন। অদ্ভুত অকারণে এই বেঁচে থাকা। আমাদের জীবন থেকে তো অতীতেকে ফসকে দেওয়া যায় পাখির মতো, বর্তমানকে হাতের মুঠোয় ধরা যায়।
তবে সবকিছুকে আমার- আমার বলে আঁকড়ে ধরার চেষ্টা কোরো না। আলগা শব্দটির ইংরেজি হল ‘লুজ’ আর হারানো শব্দটির ইংরেজি হল ‘লস’। বেশ মজার দুটি শব্দ। জীবনটাকে লুজ করে রাখো তাহলে লসের পরিমাণটা অনেক কম হবে। গল্পটা লিখতে গিয়ে একটা গানের লাইন মনে পড়ল, তার প্রথম লাইনটা ছিল- “এইতো জীবন যাক না যেদিকে যেতে চায়”।
এই পৃথিবীটা যদি একটা বিরাট ঘর হয়, তাহলে আমরা সেখানে পরস্পরের আপনজন। একটি পরিবার। একটা প্রশ্ন মনের মধ্যে বারংবার জেগে উঠেছিল। কে পর, কে আপন? আমরা সবাই কেন আপন নই? আগুনের শিখার মতো উর্ধ্বে আরও উর্ধ্বে উঠে যাক না। স্পর্শ করুক ঈশ্বরের চেতনাকে। প্রভু, আপনি কি চিরকাল নীরবই থাকবেন? এদিকে যে প্রশ্নের পাহাড় জমছে, যুগ চলে যাচ্ছে যুগান্তরে, কত জল সমুদ্র ধারণ করছে। কত মেঘ, কত বৃষ্টি, কত ফসল, কত স্বপ্ন, কত চাওয়া, কত না পাওয়া। কত জীবন, কত মৃত্যু। হে নীরব দেবতা এখনও কি আপনার কথা বলার সময় আসেনি?
তাই হয়তো আজ বলা কথার চেয়ে না বলা কথার স্তরই বেশি।
আমার একটি ঝকঝকে জীবন চাই। ঝকঝকে কাঁসার বাসনের মতো, সুরে বাঁধা একটি পরিবার চাই। পথ প্রদর্শন করার একজন আদর্শ মানুষ চাই। আমার বয়সটা যখন বাড়ল, বাবা শেখাতেন কিভাবে নিজেকে সামলে রাখতে হয়। ওনি বলতেন যতবারই হোঁচট খাবে ততবারই নিজেকে বলবে “হাল ছেড়োনা মাঝি”। জীবন দিয়েই জীবন শিখি এ পথের পাওনা পথেই শেষ করি।

           (সমাপ্ত)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *