মূল্যবান মনুষ্য জীবন ও রাস পূর্ণিমা : স্বামী আত্মভোলানন্দ(পরিব্রাজক)।।

ওঁ নমঃ শ্রী ভগবতে প্রণবায়।

আমাদের মূল্যবান সুন্দর মনুষ্য জীবনে জগৎগুরু ভগবান শ্রীমৎ স্বামী প্রণবানন্দজি মহারাজ মানব হৃদয়ে একটি মহিমাময়, গৌরবউজ্জ্বল, দেবভাবময় উপস্থিতি। শ্রীশ্রী রাসপূর্ণিমা তিথি তার একটি সুন্দর স্মরণীয় দৃষ্টান্ত। যুগাচার্য্য ভগবান স্বামী প্রণবানন্দজি মহারাজ শ্রীশ্রী রাসপূর্ণিমা (কার্তিক পূর্ণিমা) তিথিতে ১৯২৪ খ্রি: সন্ধ্যায় সর্বপ্রথম গুরুমূর্তিতে আত্মপ্রকাশ করে প্রথম পূজারতি গ্রহণ করেন। শ্রীভগবান স্বয়ংই সদগুরুরূপে ধরধামে অবতীর্ণ হন। তিনি স্বয়ং ভগবান, মনুষ্যজন্ম গ্রহণ করে, দেহধারণ করেছিলেন, আমাদের মত পাপি-তাপিদের রক্ষা করে, উদ্ধার করার জন্য ধরধামে অবতীর্ণ হন। গৃহদেবতা নীলরুদ্রের আশির্বাদে শিব-অবতার রূপে শিবশিশুর, দেবশিশুর ধরাধামে আবির্ভাব। পরবর্তিকালে সাক্ষাৎ দেবাদিদেব মহাদেব রূপে আত্মপ্রকাশ হয়। তাই, রাসপূর্ণিমা তিথি মূল্যবান সুন্দর মনুষ্য জীবনে স্বামী প্রণবানন্দজির ভক্ত ও অনুরাগীবৃন্দ এর কাছে একটি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিন।

১৯২৪খ্রি: এর রাসপূর্ণিমার আগে শ্রীমৎ স্বামী বেদানন্দজী মহারাজ দিন-রাত্রিতে, চোখ বুজে বা মেলে, আকাশে মাটিতে সর্বত্র এক অদ্ভুত দর্শন প্রত্যক্ষ করছেন। শ্রীমৎ স্বামীজী দেখছেন, “এক বিরাট জ্যোতির্মন্ডল, তার মাঝে ফুটে উঠল ‘ওঁ’কার। তারই মধ্যে সিংহাসনে উপবিষ্ট আচায্যদেব শ্রীভগবান প্রণবানন্দজী । তাঁকে ঘিরে চারিদিকে দেবদেবীগণ স্তুতি-বন্দনারত।” বিশেষকরে পূর্ণিমার আগের রাতে ধ্যানাসনে এই দিব্যদর্শন শ্রীমৎ স্বামীজীর সমগ্র চেতনাকে আচ্ছন্ন করে রইল। পুণ্যময়ী রাসপূর্ণিমার দিন সকালে তিনি স্বামী আত্মানন্দজীকে এই ভাব জানালে তাঁরা দুজনে শ্রীশ্রী গুরুমহারাজ প্রণবানন্দজীকে পূজারতি করতে মনস্থ করলেন।

এই দিন বেলা ৪ টের সময় শ্রীশ্রীগুরুমহারাজকে তাঁরা (বেদানন্দ স্বামীজী ও আত্মানন্দ স্বামীজী) পূজার আসনে বসিয়ে পূজা শুরু করলেন প্রথমবারের মতো। আনন্দের প্রাচুর্য্যে ভাবরসাপ্লুত দুই সন্ন্যাসী শ্রীশ্রী গুরুমহারাজকে পূজা, আরতি, স্তব ও প্রণামমন্ত্র পাঠ ইত্যাদির পর শ্রীচরণে পুষ্পাঞ্জলি নিবেদন করে প্রণাম করলে তিনি অভয় হস্তে শিরঃস্পর্শ পূর্বক আশীর্বাদ দিলেন। শ্রীমৎ স্বামী বেদানন্দজী প্রার্থনা করলেন,”আজ থেকে আমার ও আমাদের ভার তুমি নাও, আর তোমার সেবার ভার দাও আমাকে ও আমাদেরকে। তোমার সাথে আমরা যেন অভিন্ন হয়ে থাকি – মাতৃবক্ষে শিশুর মত।” শ্রীশ্রীগুরুমহারাজ অঙ্গুলিনির্দেশে নৈবেদ্যগুলি দেখিয়ে বললেন, “ওগুলি দাও।” পাঁচরকম ফল, খিচুরি সব তিনি গ্রহণ করলেন। যখন মিষ্টান্ন গ্রহণ করছেন, তখন শ্রীমৎ বেদানন্দ স্বামীজি মনে মনে ভাবলেন, “সবই খেয়ে ফেলবে গুরু মহারাজ? আমাদের জন্য প্রসাদ থাকবেনা?” অন্তর্যামী ঠাকুর তিনি, সন্তানের মনের কথা তখন বুঝে বললেন, “আচ্ছা থাক।”

সুতরাং ভক্তগণ, আসুন আমরা এই শুভ রাসপূর্ণিমার পবিত্রলগ্নে শ্রীশ্রী গুরু মহারাজ জগৎগুরু ভগবান প্রণবানন্দজী মহারাজকে প্রাণ ভরে পূজা আরতি করি, তাঁর মহাভাবের মহাসাগরে ডুবে যাই। সদ্‌গুরু চরণে আত্মসমর্পণই শিষ্যের সাধনা। পরম করুণাময় শ্রী শ্রী ঠাকুরের শরণাগত হও। তিনি আমাদের ধর্ম, অর্থ, কাম, মোক্ষ চতুর্বর্গ ফল প্রদান করিবেন। আমাদের মূল্যবান মনুষ্য জীবনে গুরুদেব ভগবান প্রাণদেবতা নিজ নিজ পিতামাতার মত প্রত্যেকের হৃদয় সিংহাসনে চলমান শিবরূপে বিরাজ করেন। এই পবিত্র পূণ্য তিথিতে তার শ্রীপাদপদ্মে আমাদের অনন্তকোটি প্রণাম নিবেদন করি।

আর তত্ত্বগত দিক থেকে রাস পূর্ণিমা মূলতঃ শ্রীকৃষ্ণের ব্রজলীলার অনুকরণে বৈষ্ণবীয় ভাবধারায় অনুষ্ঠিত ধর্মীয় উৎসব। ভগবান কৃষ্ণের রসপূর্ণ অর্থাৎ তাত্ত্বিক রসের সমৃদ্ধ কথাবস্তুকে রাসযাত্রার মাধ্যমে জীবাত্মার থেকে পরমাত্মায়, দৈনন্দিন জীবনের সুখানুভূতিকে আধ্যাত্মিকতায় প্রেমাত্মক প্রকৃতিতে রূপ প্রদান করা। রাসলীলা বা রাস যাত্রা একটি ধর্মীয় বাৎসরিক উৎসব। ভারতের উত্তরপ্রদেশের মথুরা ও বৃন্দাবনে, পশ্চিমবঙ্গের নদীয়াতে শান্তিপুরে ও নবদ্বীপ সহ অন্যান্য জায়গায় রাসযাত্রার উৎসব বিশেষভাবে উদযাপিত হয়। এ প্রসঙ্গে উল্লেখযোগ্য, শান্তিপুরের মূল উৎসব হলো রাস, যা শান্তিপুরের ভাঙ্গারাস নামেই বেশি পরিচিত। ওড়িশা, আসাম ও মণিপুরে রাসযাত্রার উৎসব বিশেষভাবে উদযাপিত হয়। এই উৎসবের অংশ হিসেবে গোপিনীবৃন্দ সহযোগে রাধা-কৃষ্ণের আরাধনা এবং অঞ্চলভেদে কত্থক, ভরতনাট্যম, ওড়িশি, মণিপুরি প্রভৃতি ঘরানার শাস্ত্রীয় ও বিভিন্ন লোকায়ত নৃত্যসুষমায় রাসনৃত্য বিশেষ মর্যাদার অধিকারী।
এই বছরে, ২৯শে কার্তিক শুক্রবার ১৫ই নভেম্বর২০২৪, রাসপূর্ণিমা তিথি পড়ছে। পূর্ণিমার সময় – ১৪ নভেম্বর, বৃহস্পতিবার শেষ রাত ৫/১৩/৩১ মিনিট থেকে ১৫ নভেম্বর, শুক্রবার রাত ৩/২/৩৯ মিনিট পর্যন্ত থাকবে পূর্ণিমা। জগৎ গুরু ভগবান স্বামী প্রণবানন্দজী মহারাজের শুভ ও মঙ্গলময় আশির্বাদ সকলের শিরে বর্ষিত হোক… সবাই খুব ভালো থাকুন, এই প্রার্থনা করি…!
ওঁ গুরু কৃপাহি কেবলম….!
স্বামী আত্মভোলানন্দ(পরিব্রাজক)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *